ঠিকাদার নির্ধারণ হয়নি খনি বন্ধের আশঙ্কা

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া পাথরখনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বেলারুশের জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) চুক্তি শেষ হচ্ছে আগামী ২ সেপ্টেম্বর। নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত পেট্রোবাংলা জিটিসির সঙ্গে মেগা প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ বাড়বে নাকি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

খনির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা বলছেন, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হবে না। আবার জিটিসিকে ফের দায়িত্ব দিতে হলেও যেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় তা এত স্বল্পসময়ে সম্ভব নয়। ফলে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির মতো দেশের একমাত্র পাথরখনির কার্যক্রম বন্ধের আশঙ্কা করছেন তারা। ঠিকাদার নিয়োগের জটিলতায় গত ১০ আগস্ট বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চীনা সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়াম চলে গেছে।

মধ্যপাড়া পাথরখনি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা, মাতারবাড়ী, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ। কারণ এখান থেকেই প্রকল্পগুলোর পাথরের জোগান দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া এলাকায় ১২৮ মিটার গভীর কঠিন শিলা আবিষ্কার করে। উত্তর কোরিয়ার মেসার্স কোরিয়া সাউথ কো-অপারেশন করপোরেশনের সঙ্গে পাথরখনি উন্নয়নে ১৯৯৪ সালের মার্চে মূল চুক্তি হয়। কয়েক দফা ব্যয় বৃদ্ধির পর ২০০৭ সালের ২৫ মে পাথরখনির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উত্তোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের বোঝা নিয়ে খনিটি বন্ধের উপক্রম হয়।

তবে ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর খনি সচল রাখতে বেলারুশের জিটিসি ও মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) মধ্যে ৬ বছরের আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়। ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এখানে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। নানা বাধা পেরিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রথম লাভের মুখ দেখে খনি কর্র্তৃপক্ষ। ওই অর্থবছরে প্রায় ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা লাভ হয়। এরপর থেকে মুনাফা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থান ধরে রাখতে ঠিকাদারের মেয়াদ নবায়ন নাকি নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খনির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মধ্যপাড়া পাথরখনি টানা তৃতীয়বার লাভের মুখ দেখেছে। এর সুফল হিসেবে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে লভ্যাংশ ভাতা (প্রফিট বোনাস) দেওয়া হয়। টানা তিন মেয়াদে বেলারুশ কোম্পানিটি প্রায় ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করায় সরকার তাদের মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে জিটিসির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আগেই দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না। ইতিমধ্যে সাতবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও অদৃশ্য কারণে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়নি।’

এমন প্রেক্ষাপটে পাথরখনি বন্ধ হলে সাত শতাধিক খনিশ্রমিকসহ এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত ১০ আগস্ট থেকে ১ হাজার ৪৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন।

পেট্রোবাংলা ও এমজিএমসিএলের সঙ্গে যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট মধ্যপাড়া পাথরখনি নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খনির এক প্রকৌশলী বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চলে যাওয়ায় বন্ধ বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি। হাজারো বেকার শ্রমিক পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন। তারা প্রতিদিনই কয়লাখনিতে আন্দোলন করছেন। একই পরিণতির দিকে যাচ্ছে মধ্যপাড়া পাথরখনি। দ্রুত কর্র্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত না নিলে সরকারের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পও মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যপাড়া পাথর খনির আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঠিকাদারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না এলে নিশ্চিতভাবেই খনির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, বিদেশিরা কখনো বেআইনিভাবে কাজ করবে না।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শতাধিক বিদেশি খনি বিশেষজ্ঞ, অর্ধশত দেশি প্রকৌশলী ও ৭৫০ শ্রমিক এ খনিতে কাজ করছেন। তারা সবাই অনিশ্চয়তা ভুগছেন।’

ঠিকাদার নিয়োগের জটিলতা বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী আবু দাউদ মুহম্মদ ফরিদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না।’ তবে তিনি বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেলওয়ের পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতুর রেলসংযোগ নির্মাণসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করছে। আরও অনেকে এখানকার পাথর ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে।’