দেশে করোনার গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ আগামী ৭ সেপ্টেম্বর শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে। চলবে এক সপ্তাহ। তবে এ সময় বাড়তেও পারে। প্রথম ডোজের মতো দ্বিতীয় ডোজও দেওয়া হবে গণটিকার আদলেই। প্রতিটি ইউনিয়ন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আগের কেন্দ্রগুলোতেই দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবে মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রথম ডোজ টিকা নেওয়া প্রত্যেককে দ্বিতীয় ডোজের জন্য আগেভাগেই খুদে বার্তা পাঠানো হবে। সে অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখ ও আগের কেন্দ্রে (প্রথম ডোজ যে কেন্দ্রে নিয়েছিলেন) গিয়েই প্রত্যেককে টিকা নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে প্রথম ডোজের কেন্দ্রগুলো নির্দিষ্ট দিনের জন্য চালু করা হবে এবং টিকাদান শেষে আবার বন্ধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় ডোজও ছয় দিন চলবে। এ সময়ের মধ্যেই প্রথম ডোজ নেওয়া প্রত্যেককে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় টিকাও মজুদ রয়েছে সরকারের কাছে।
এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে গণটিকাদান কার্যক্রমের দ্বিতীয় ডোজ শুরু হচ্ছে। দ্বিতীয় ডোজ শুরুর আগে আরও টিকা আসবে। গণটিকাদান কার্যক্রমের দ্বিতীয় ডোজ দিতে কোনো সমস্যা হবে না।
পরে গতকাল রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ শুরু হওয়ার কথা। যে যেখানে যেভাবে প্রথম ডোজ দিয়েছেন, তিনি ওই একইভাবে দ্বিতীয় ডোজ দেবেন। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ওই কেন্দ্রগুলো আবার চালু হবে। টিকা দেওয়া শেষ হলে ওই কেন্দ্র আবার বন্ধ হয়ে যাবে। পরে স্থায়ী কেন্দ্র যেগুলো আছে, সেগুলোয় আগের মতোই টিকাদান কর্মসূচি চলবে।
দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে যেভাবে টানা ছয় দিন প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছিল, সেভাবে দ্বিতীয় ডোজও দেওয়া হবে। প্রথম ডোজ দেওয়ার সময় অনেক লোকজন কেন্দ্রে এসেছে, অনেক চাপ ছিল। এ জন্য এবার আমরা পরিকল্পনা করেছি, যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের কাছে দ্বিতীয় ডোজের খুদে বার্তা পাঠানো হবে। যে দিন যে কয়েকজন প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন, দ্বিতীয় ডোজও সেভাবে একই সময়সূচি অনুযায়ী দেওয়া হবে। ফলে দেখা যাবে যে নির্দিষ্ট দিন নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষই টিকা নিতে আসবে। কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত মানুষের ভিড় হবে না। প্রথমবারের মতো এবারও ছয় দিনেই সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হবে।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রথম ডোজের কেন্দ্রগুলো দ্বিতীয় ডোজের জন্য পুনরায় চালু করা হবে। যে যে কেন্দ্রে টিকা নিয়েছেন, তাকে ওই কেন্দ্রেই টিকা নিতে হবে এবং খুদে বার্তায় কেন্দ্র ও তারিখ উল্লেখ থাকবে। ওই ছয় দিনে যারা টিকা নিয়েছেন, তারা সবাই দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবেন। কারণ তাদের দ্বিতীয় ডোজ মজুদ রেখেই টিকাদান কর্মসূচি করা হয়েছে।’
অবশ্য একসঙ্গে অনেক মানুষকে টিকাদান কর্মসূচিকে ‘গণটিকাদান’ বলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া বলেন, ‘এটা গণটিকা না। কতগুলো উদ্দেশ্য নিয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি করা হয়েছিল। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে অনেক মানুষকে টিকা দেওয়া ও টিকা দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা। মূল উদ্দেশ্য ছিল টিকা নেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা। সে জন্যই এই কর্মসূচির বেশির ভাগ টিকা দেওয়া হয়েছে গ্রাম পর্যায়ে। কারণ শহরাঞ্চলের মানুষ নিজের স্বপ্রণোদিত হয়ে টিকা নিলেও গ্রামের মানুষের টিকার প্রতি অনাগ্রহ ছিল। তাদের টিকাকেন্দ্রে আনা যায়নি। এ কারণে আমরা এক দিনে অনেক মানুষকে টিকা দিয়েছি। এটা করতে পেরেছি বলেই এখন টিকার জন্য নিবন্ধনও বেড়েছে ও টিকার প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মেছে। এখন সবাই টিকা নিতে চায়। পাশাপাশি আমরা যে অনেক মানুষকে এক দিনে টিকা দিতে পারি, সে সক্ষমতাও প্রমাণ হয়েছে। টিকার পরিমাণ যদি অনেক বেড়ে যায়, আবার আমরা এভাবে টিকা দিতে পারব।’
গণটিকার ছয় দিনে টিকা নেন ৪৮ লাখ : এই ছয় দিনে মোট টিকা নিয়েছেন ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ২২৭ জন। এর মধ্যে সিনোফার্মের টিকা নিয়েছেন ৩৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫২ জন ও মডার্নার টিকা নিয়েছেন ১২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭৫ জন।
এ পর্যন্ত দেশে সিনোফার্মের টিকা এসেছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৭০ হাজার। গতকাল পর্যন্ত এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৮২ ডোজ; অর্থাৎ গতকাল পর্যন্ত সিনোফার্মের মজুদ ছিল ৩৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৮ ডোজ।
অন্যদিকে মডার্নার টিকা এসেছে ৫৫ লাখ ৭০ হাজার ২০০ ডোজ। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত দুই ডোজ মিলে মোট দেওয়া হয়েছে ২৯ লাখ ৬৮ হাজার ১১৩ ডোজ। ফলে বর্তমানে এই টিকা মজুদ আছে ২৫ লাখ ৪৯ হাজার ৮৭ ডোজ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই মাসে ও আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আরও সিনোফার্ম ও মডার্নার টিকা আসার কথা রয়েছে।
যেভাবে চলে গণটিকা : কর্মসূচি শুরু হয় ৭ আগস্ট শনিবার। শেষ হয় ১২ আগস্ট। এই ছয় দিনে ৩২ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে শেষ পর্যন্ত এর চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এ সময় ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্রের পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েও টিকা নেন। যারা আগে থেকেই টিকার নিবন্ধন করতে পারেননি, কেন্দ্রে তাদের জন্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা ছিল।
এর আগে এই ছয় দিনের গণটিকাদান কর্মসূচিতে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার ঘোষণা দিলেও পরে তা ৩২ লাখে কমিয়ে আনে সরকার। পাশাপাশি ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাদ দেওয়া হয়। এ সময় সারা দেশে ৪ হাজার ৬০০টি ইউনিয়ন, ১ হাজার ৫৪টি পৌরসভা, সিটি করপোশেন এলাকার ৪৩৩টি ওয়ার্ডে এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চলে। ১৫ হাজারের বেশি টিকাদান কেন্দ্রে ৩২ হাজার ৭০৬ জন টিকাদানকারী এবং ৪৮ হাজার ৪৫৯ জন স্বেচ্ছাসেবী এই কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন।
দেশের সব ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিচালিত গণটিকাদান কর্মসূচিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক জনগোষ্ঠী, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।