কাবুল এয়ারপোর্টে আত্মঘাতী বোমা-গোলাগুলি, নিহত ৬০

যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই এখন চায় আগস্টের মধ্যেই তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান থেকে তাদের নাগরিক ও মিত্রদের সরিয়ে নিতে। তালেবান আলটিমেটাম মেনে কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলছে তারই তোড়জোড়। আফগানিস্তান ছাড়ার অপেক্ষায় ভেতরে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, সেনাসদস্য। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশ কাবুল বিমানবন্দর সন্ত্রাসী হামলার উচ্চঝুঁকিতে আছে বলে সেখানে অবস্থান করা নাগরিকদের সতর্ক করার কয়েক ঘণ্টা পরেই হয় জোড়া বিস্ফোরণ। এসময় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এতে হতাহত হয় অসংখ্য মানুষ।

আফগান স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ সময় গতকাল রাত ১টা পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ নিহত হয়েছে অন্তত ৬০ জন। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১২ সেনাসদস্য আছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। আফগান স্বাস্থ্য বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, ওই ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন আহত হয়েছে, তাদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে।

বিবিসি বলছে, প্রথম হামলাটি হয় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায়, বিমানবন্দর এলাকার ব্যারন হোটেলের কাছেই। ওই হোটেলটিতে দেশ ছাড়তে ইচ্ছুক আফগানদের ভিসা সুবিধা দেওয়া ব্রিটিশ নাগরিকরা থাকতেন। এখানেই হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, একজন আত্মঘাতী হামলাকারী এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় হামলাটি হয় বিমানবন্দরের অ্যাবি গেটের সামনে। পেন্টাগনের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, বিস্ফোরণের পরপরই ওই এলাকায় তীব্র গোলাগুলিও হয়। কাবুলে ইতালির একটি ফ্লাইট লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে এদিন।

এদিকে গতকাল রাত অবধি হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। দেশটির হাই কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল রিকনসিলেশনের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে মন্তব্য করেছেন। আর যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ অনেকে দেশই বরাবরের মতো বলেছে, তাদের ধারণা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) খোরাসান শাখা এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। তালেবান কর্র্তৃপক্ষও জোড়া বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির কথা স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, তারা বিমানবন্দর এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে বোমা হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। তার দাবি, এমন এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেছে যেখানকার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী।

গতকালের এই হামলার নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্ব নেতারা। নরওয়েসহ একাধিক দেশ এখন তার নাগরিকেদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের ফেরানোর গতি আরও বাড়াতে পারে বলে বলছে বিবিসি। হামলার পরেই জরুরি বৈঠকের ডাক দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

বিবিসি জানাচ্ছে, সন্ত্রাসী হামলার হুমকির পর বিমানবন্দরের যে তিনটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে অ্যাবি গেট একটি ছিল। কাবুল বিমানবন্দর সন্ত্রাসী হামলার উচ্চঝুঁকিতে আছে উল্লেখ করে গতকাল সকালেই অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের সেখানে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিল। যারা বিমানবন্দরটির সামনে অবস্থান করছে তাদের অবিলম্বে ওই এলাকা ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পেন্টাগন জানিয়েছিল, ইসলামিক স্টেট (আইএস) কাবুল বিমানবন্দরের সামনে অপেক্ষারতদের ভিড়ে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে পারে।

এক তালেবান কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে কাবুলে বিমানবন্দরের অ্যাবি গেটের বাইরে ভিড়ের মধ্যে প্রথম বিস্ফোরণে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা তালেবান যোদ্ধারাও আহত হয়েছেন।

গতকাল হামলার পরে হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিস্ফোরণের খবর জানানো হয়েছে। ওই সময় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করছিলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।

হামলার বিষয়ে ব্রিটেনের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপমন্ত্রী জেমস হিপি বিবিসিকে বলেছেন, তালেবান, ইসলামিক স্টেট কিংবা আল-কায়েদা এদের যেকোনোটি এ আক্রমণ করে থাকতে পারে। অন্যদিকে পেন্টাগনের এক মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, তারা দুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের তথ্য পেয়েছেন।

চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান একপথে! : তালেবানরা কাবুল দখল করার পর প্রথমবারের মতো তাদের সঙ্গে কাবুলে প্রকাশ্য কূটনৈতিক বৈঠক করেছে চীন। এ ইস্যুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।

গত বুধবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদের খবরে বলা হয়, তালেবানের রাজনৈতিক অফিসের উপপ্রধান আবদুল সালাম হানাফির এবং চীনা রাষ্ট্রদূত ওয়াং ইউর মধ্যে বুধবার এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, ‘তালেবানদের সঙ্গে আমাদের এখন নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর যোগাযোগ রয়েছে এবং নানা বিষয়ে শলাপরামর্শও চলছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রধান ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য কাবুল আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ও চ্যানেল।’ তবে তিনি কাবুলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

তিনি বলেন, ‘নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং ভাগ্য নির্ধারণে আফগান জনগণের স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতি চীনের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। আফগানদের নেতৃত্বে আফগান রীতিনীতি বাস্তবায়নও সমর্থন করে চীন। আফগানিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সুপ্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্যও প্রস্তুত আছি আমরা। এছাড়া আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশটির পুনর্গঠনেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায় চীন।’

প্রসঙ্গত, গত ১৫ আগস্ট তালেবানরা কাবুল দখল করে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারত আফগানিস্তান থেকে তাদের কূটনৈতিক মিশন প্রত্যাহার করে এবং দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। কিন্তু পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়া কাবুলে তাদের দূতাবাস খোলা রাখে এবং তালেবানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।

আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে পুতিন একই ইস্যুতে কথা বলেন শি চিনপিংয়ের সঙ্গে।

ফোনালাপে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল আফগানিস্তান পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি তাৎপর্যপূর্ণ। আফগান জনগণের নিরাপত্তা এবং অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমঝোতাই সর্বোত্তম পথ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও আফগানিস্তানের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলেন। এ তথ্য জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। খবরে বলা হয়েছে, দুই নেতা আফগানিস্তানের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে মতবিনিময় করেছেন।

শি চিনপিং বলেছেন, চীন আফগানিস্তানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। দেশটির অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করবে না পেইচিং।