ট্রলারের ধাক্কায় নৌকাডুবি নারী-শিশুসহ ২১ মৃত্যু

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে নৌকাডুবিতে কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পত্তন ইউনিয়নের সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের পাশে ভাতের খোলা এলাকার লইস্কা বিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বালুবোঝাই একটি ট্রলারের সঙ্গে সংঘর্ষের পর শতাধিক যাত্রীবোঝাই ওই নৌকাটি উল্টে ডুবে যায় বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, নৌকাডুবির ঘটনায় গতকাল রাত ১টা পর্যন্ত ২১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত নয় নারী ও তিন শিশু রয়েছে। এছাড়া আহত অবস্থায় ১৫ জনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই দুর্ঘটনায় এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

নিহত কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। তারা হলেন, চম্পকনগরের গেরাগাওয়ের প্রয়াত মালু মিয়ার স্ত্রী মঞ্জু বেগম (৫৮), তার আত্মীয় আবদুল হাশিম মিয়ার স্ত্রী রওশন আরা (৬৫), তার মেয়ে ফরিদা বেগম (৩০), পত্তনের বড়পুকুর পাড় গ্রামের সোলায়মান মিয়ার স্ত্রী রুবিনা বেগম (৪০), পত্তনের আদমপুর গ্রামের পরিমল বিশ্বাসের স্ত্রী অঞ্জনা (৪২), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৈত্তলা এলাকার আবু সাঈদের স্ত্রী মোমেনা (৩৮), ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হাজী মোবারক মিয়ার মেয়ে তাসফিয়া মিম (১৩) এবং বিজয়নগরের মুকুন্দপুর গ্রামের জহিরুল ইসলামের  স্ত্রী শারমিন (১৮)।

জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তা, দুর্ঘটনাকবলিত নৌকার বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার শিকার নৌকাটি স্থানীয় বাসিন্দা সোনা মিয়া মাঝির। প্রতিদিনের মতো এটি চম্পকনগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছিল। শেষ খেয়ায় গতকাল বিকেলে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে নৌকাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। পথে সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের পাশে ভাতের খোলা এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবোঝাই ট্রলার যাত্রীবাহী নৌকাটিকে ধাক্কা দেয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে এলাকাবাসী  প্রাথমিক উদ্ধারকাজ শুরু করে। পরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। তবে গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত কোনো ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।

দুর্ঘটনার পরপরই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান এবং পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান ঘটনাস্থলে যান।

জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান গতকাল রাত পৌনে ৯টার দিকে জানান, তখন পর্যন্ত ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহতদের সদর হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থকে সার্বিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া আহতদের চিকিৎসা খরচ দেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, নৌকাডুবির ঘটনায় জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (সার্বিক) রুহুল আমিনের নেতৃত্বে গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনার কবলে পড়া নৌকাটি চমম্পকনগর ফতেহপুর গ্রামের সোনা মিয়া মাঝির। প্রতিদিন এ নৌকায় চমম্পকনগর থেকে যাত্রীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া যান। গতকাল বিকেলে শেষ খেয়ায় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে নৌকাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছিল। পথে বালুবাহী একটি ট্রলার ধাক্কা দিলে সোনা মিয়ার নৌকাটি ডুবে যায়। আমরা বালুবাহী ট্রলারটি আটক করেছি। তবে এর চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছে। এ বিষয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পুলিশ উদ্ধার তৎপরতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেও জানান আনিসুর রহমান।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খবর পাওয়ার পরপরই আমরা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করি। কিশোরগঞ্জ থেকে উদ্ধারকারী ডুবুরি দল রওনা দিয়েছে। তারা এলে উদ্ধারকাজ আরও বিস্তৃতভাবে করা যাবে।’

ডুবে যাওয়া নৌকাটির উদ্ধার হওয়া কয়েকজন যাত্রী জানান, গতকালের শেষ খেয়া ছিল বলে ইঞ্জিনচালিত স্টিলের নৌকাটিতে প্রায় ২০০ যাত্রী উঠে পড়ে। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

পত্তন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম জানান, তার আপন ছোট ভাই সার ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন।

দুর্ঘটনার শিকার নৌকার যাত্রী আলি আক্তার জানান, তাদের নৌকায় প্রায় ২০০ যাত্রী ছিল।

আরেক যাত্রী আঁখি বেগম বলেন, তিনি স্বামী নান্নু মিয়া, বড় ছেলে ও কোলে এক বছরের বাচ্চা নিয়ে নৌকায় ওঠেন। হঠাৎ ধাক্কায় তারা সবাই নৌকা থেকে পড়ে যান। কোলের শিশুসহ তিনি পাড়ে উঠে এলেও তার আট বছর বয়সী ছেলে হাফেজি মাদ্রাসার ছাত্র নিখোঁজ রয়েছে। তার স্বামী নান্নু মিয়া আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।