আগামীকাল ট্রায়াল রান

ভায়াডাক্টে ৪ ঘণ্টা চলল মেট্রোরেল

স্বপ্নের মেট্রোরেলে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলবে আগামীকাল রবিবার। গতকাল শুক্রবার সেই পরীক্ষামূলক চলাচলের প্রস্তুতি হিসেবে ভায়াডাক্টের ওপর উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মিরপুর পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা চলল এক সেট ট্রেন।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক বলেন, ‘আগামী ২৯ আগস্ট সকাল ১০টায় ভায়াডাক্টের ওপর টেস্ট রান শুরু হবে। এর ওপর অনেক দিন ধরে কাজ চলছে। কোথাও কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, বাধা আছে কিনা এসব দেখার জন্যই ভায়াডাক্টে অল্প অল্প করে চালিয়ে দেখা হয়েছে।’

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ডিপো থেকে শুরু করে যেসব স্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ট্রেনটি আগামী রবিবার আবার পরিচালনা করা হবে। তবে ঠিক কোন পর্যন্ত ট্রেনটি পরিচালনা করা হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এখন মেট্রোরেলের লাইনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এসব পরীক্ষার ভিত্তিতে কতটুকু লাইনে ট্রেন পরিচালনা করা হবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে রবিবার সকালে।

এমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক বলেন, ‘আজকে (গতকাল) মেট্রোরেলের লোকজন হাফ কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে গেছে, সঙ্গে ট্রেনও গেছে। এভাবে তারা ভায়াডাক্টে দেখেছে। এতদিন ধরে যে জিনিসটার কাজ হচ্ছে তা সঠিক হচ্ছে কিনা বা সঠিক না হলে কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে কিনা, সেটা দেখার জন্যই আজকে ট্রেন চালিয়ে দেখা হয়েছে।’

প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের যে ৬৪ শতাংশ কাজ হয়েছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৮৫ শতাংশ। আর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের পূর্তকাজ হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল মেকানিক্যাল সিস্টেম ও রোলিং স্টক ও ডিপোর ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি প্রায় ৫৫ শতাংশ।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্যাকেজ-১-এর আওতায় ডিপো এলাকায় ভূমি উন্নয়ন কাজ শুরু হয় গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হওয়ায় সরকারের ৭০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

ডিপোর পূর্তকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ : প্রকল্পের ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার ‘ভায়াডাক্টের’ মধ্যে ১৪ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে। ডিপোর অভ্যন্তরে রেললাইন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে।  উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের সাড়ে ১০ কিলোমিটার ভায়াডাক্টের ওপর বসানো হয়েছে রেললাইন। জাপানের কাওয়াসাকি-মিৎসুবিশি কনসোর্টিয়ামকে ২৪ সেট ট্রেন নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০১৭ সালে। দুই পাশে দুটি ইঞ্জিন আর চারটি কোচের সমন্বয়ে ট্রেনের সেটগুলো তৈরি হচ্ছে জাপানে। এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে পাঁচ সেট ট্রেন, যার দুটি দেশে এসে পৌঁছেছে।

ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় গতি আনতে মেট্রোরেল করার চিন্তাভাবনা শুরু হয় গত শতকের শেষ দিক থেকেই। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই চিন্তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ নিয়ে সমীক্ষা শুরু হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার রাজধানীজুড়ে ‘বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট’ (বিআরটি) ও মেট্রোরেল নির্মাণ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম পর্যায়ে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার উড়ালপথে এ রেললাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ জন্য ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা জাপানের আন্তর্জাতিক সংস্থা জাইকা ও ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা স্থানীয়ভাবে জোগানের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নকশা জটিলতার কারণে প্রকল্পটি আটকে ছিল। নকশা সংশোধন শেষে ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এটির অনুমোদন দেয়। ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

নকশা অনুযায়ী মেট্রোরেল মাটি থেকে ১৩ মিটার উপরে স্থাপিত। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য থাকবে ১৬টি স্টেশন। এগুলো হচ্ছে উত্তরা উত্তর, উত্তরা মধ্য, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় ও মতিঝিল। তিন তলাবিশিষ্ট স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় থাকছে টিকিট কাউন্টার এবং অন্য সুবিধাদি। প্ল্যাটফর্ম থাকবে তৃতীয় তলায়। স্টেশনগুলোতে ওঠার জন্য সাধারণ সিঁড়ির পাশাপাশি থাকবে লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি। টিকিট দিয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের ব্যবস্থা হবে স্বয়ংক্রিয়। নিরাপত্তার জন্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা বেষ্টনী বা প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপন করা হবে।

প্রথমে এটি আগারগাঁও হয়ে বিজয় সরণি থেকে মতিঝিল যাওয়ার কথা ছিল। পরে নকশায় সংশোধন এনে খামারবাড়ি হয়ে মতিঝিল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানির নামে পরিচালিত এই প্রকল্পটি কাজের সুবিধার্থে ৬ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম দিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে পুরো প্রকল্প চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় সেই অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার। ২০২১ সালের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে সিপি-১ থেকে সিপি-৪ অর্থাৎ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালুর সিদ্ধান্ত হয়। এ অংশে স্টেশন সংখ্যা ৯টি। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অর্থাৎ সিপি-৫ ও সিপি-৬ অংশের কাজ ২০২৪ সালের মধ্যে শেষের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পুরো প্রকল্পটি চালু হলে মাত্র ৩৫ মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছানো যাবে। দিনে যাত্রী পরিবহন করতে পারবে ৫ লাখের কাছাকাছি।