ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকা ডুবি: থানায় মামলা, গ্রেপ্তার ৫, তদন্ত কমিটি গঠন

ভাতেরখলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে বিজয়নগরমুখী নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা সড়কের পাশের একটি জায়গার নাম। বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের জনমানবহীন এলাকা। এ এলাকায় লইস্কা বিল ও সড়কের পাশের খালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ামুখী যাত্রীবাহী নৌকা ডুবির ঘটনায় ২২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, উদ্ধার অভিযানে বিরতি দিয়ে খেতে গেছেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা, পাশেই স্পিডবোটে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র ডুবুরিরা। ডুবে যাওয়া নৌকাটির ওপর দাঁড়িয়ে কয়েকটি কিশোর। আশে-পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি নৌকা দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাশের সড়কে শত শত উৎসুক জনতা। পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন পুলিশ।

নৌকা ডুবির ঘটনায় শনিবার বিকাল পর্যন্ত ২২ জন মানুষের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর অধিকাংশই নারী-শিশু। সর্বশেষ নৌকা ডুবির ১৬ ঘণ্টা পর এদিন সকাল ১০ টায় নাশরা (৩) নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরিদল। নাশরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার উত্তর পৈরতলা গ্রামের হারিছ মিয়ার সন্তান।

এর আগে শুক্রবার রাত ১০ টার পর কিশোরগঞ্জ থেকে ৭ সদস্যের ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদল ও শনিবার ভোরে নারায়ণগঞ্জ থেকে ৪ সদস্যের বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরিদল ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি মাসুম, হাবিব ও সাইদুর এ প্রতিবেদককে জানান, যে খালে নৌকা ডুবি হয়েছে তার গভীরতা মাত্র ১২ ফুটের মতো। আমরা আশপাশের এলাকা, নৌকার ভেতর ও খালের তলদেশে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছি। শিশু নাশরা ছাড়া আর কোনো লাশের খোঁজ পাইনি। আমাদের ধারণা সেখানে আর কোনো লাশ নেই।

জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বলেন, আর কোনো লাশ থাকার সম্ভাবনা নেই বলেই জানিয়েছে ডুবুরিরা। শনিবার বিকাল পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ রয়েছে বলে স্বজনরা অভিযোগও করেনি। তবুও আমরা অপেক্ষা করছি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আকতারুজ্জামান জানান, আমরা শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে দেখেছি আর কোনো লাশের অস্তিত্ব নেই। নৌকা ডুবির ঘটনায় আর কোনো নিখোঁজেরও তথ্য নেই। কেউ যদি নিখোঁজের দাবি করেন তবে আমরা আবারও উদ্ধার অভিযান করব।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিনকে প্রধান করে নৌকা ডুবির ঘটনায় জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল মোজাম্মেল হক রেজা,ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূঞা।

শনিবার দুপুরে তদন্ত কমিটির সদস্যরা নৌকা ডুবির ঘটনাস্থল, চম্পকনগর ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলেন।

নিহতদের পরিচয়

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের লইস্কা বিলে নৌকা ডুবির ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করেছে জেলা প্রশাসন। নিহতরা হলেন- চম্পকনগর ইউনিয়নের সোনাবরশী পাড়ার আবদুল বারীর স্ত্রী ইসরাত জাহান, হুদাইপাড়ার কামাল মিয়ার মেয়ে মাহিদা আক্তার (৫), নূরপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে মিনার বেগম (৫০), গেরাগাও গ্রামের জজ মিয়ার মেয়ে মুন্নী (৬) তার স্ত্রী ফরিদা বেগম (৪০), মালু মিয়ার স্ত্রী মঞ্জু বেগম (৬০), আবদুল হাসিমের স্ত্রী কমলা বেগম (৬৫), একই ইনিয়নের ফতেপুর গ্রামের জহিরুল হক ভূইয়ার ছেলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্র আরিফ বিল্লাহ বাবু (২০),পত্তন ইউনিয়নের মনিরপুর গ্রামের আব্দুর বারী চেয়ারম্যানের ছেলে সার ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম (৫৮), বড়পুকুর পাড় গ্রামের সোলায়মানের স্ত্রী রুবিনা বেগম (৪০), আদমপুর গ্রামের পরিমল বিশ্বাসের স্ত্রী অঞ্জনা বিশ্বাস (৩৫) ও তার মেয়ে তিতিবা (৩), জেলা শহরের দাতিয়ারা এলাকার মোবারক মিয়ার মেয়ে তাসফিয়া মিম (১২), উত্তর পৈরতলা এলাকার ফারুক মিয়া স্ত্রী কাজলী বেগম (২৫), হারিস মিয়ার মেয়ে নাফসা আকতার (৩), শহরের দক্ষিণ পৈরতলার আবু সায়েদের স্ত্রী সরকারি কর্মচারী মোমেনা বেগম (৫৫), সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের ঝাড়ু মিয়ার মেয়ে শারমিন (১৮), নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়নের গাছতলা গ্রামের জামাল মিয়ার ছেলে আজীম (৭), সাদেকপুর ইউনিয়নের সাদেকপুর গ্রামের মুরাদ হোসেনের ছেলে তানভীর (৮), চিলোকুট গ্রামের আব্দুল্লার মেয়ে তাকওয়া (৮)  ময়মনসিংহ জেলার গোপালপুরের শাওন মিয়ার ছেলে সাজিদ (৩), গৌরিপুরের খোকন মিয়ার স্ত্রী ঝরনা বেগম (৫৫)।

থানায় মামলা, গ্রেফতার-৫

শনিবার সকালে বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর গ্রামের গেরাগাও এলাকার মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে সেলিম মিয়া বাদী হয়ে নৌকাডুবির ঘটনায় বিজয়নগর থানায় একটি মামলা করেছেন। ট্রলারডুবির ঘটনায় তার মা রৌশনারা,বোন ফরিদা সহ পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছেন।

মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পুলিশ সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের শোলাবাড়ি এলাকার আলী আফজালের ছেলে নৌকার মাঝি জমির মিয়া (৩৩), নৌকার সহকারী একই এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে মো. রাসেল (২২), কাশেম মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া (২২), বালুবাহী ট্রলারের মালিক মৃত আশরাফ আলীর ছেলে মো. সোলায়মান (৬৪) ও চম্পকনগর নৌকা ঘাটের পরিচালক বিজয়নগরের কালারটেকের মিস্টু মিয়াকে (৬৭) গ্রেপ্তার করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো.আনিসুর রহমান মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দুটি বাল্কহেডসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এজাহারে নাম থাকায় এ মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।