ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকাডুবি

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২ গ্রেপ্তার ৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার লইস্কা বিলে নৌকাডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল থেকে নতুন করে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জন হয়।

এদিকে নৌকাডুবির ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এ মামলায় ইতিমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে।

গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন সরাইল উপজেলার পানিশ^র ইউনিয়নের শোলাবাড়ির পশ্চিম কটাইল্যাপাড়ার জমির মিয়া, মো. রাসেল, খোকন মিয়া ও মো. সোলায়মান এবং বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের মিষ্টু মিয়া। মামলার অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার আনন্দবাজারে যাওয়ার পথে বালুবোঝাই ট্রলারের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে একটি যাত্রীবাহী নৌকা ডুবে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে ২১ জনের লাশ উদ্ধার করে এলাকাবাসী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও ডুবুরিরা। এরপর গতকাল সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি দল দ্বিতীয় দফায় উদ্ধারকাজ শুরু করে। তারা এক শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করে উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করেন। তবে গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করেনি জেলা প্রশাসন।

নৌকাডুবির ১৬ ঘণ্টা পর গতকাল সকাল ১০টার দিকে নাশরা (৩) নামে ওই শিশুর লাশ উদ্ধার করে বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি দল। নাশরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার উত্তর পৈরতলা গ্রামের হারিছ মিয়ার সন্তান।

গতকাল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরিরা পানির তলদেশে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে তাদের মতো করে উদ্ধার অভিযানে ক্ষান্ত দেন। এর আগে গত শুক্রবার রাত ১০টার পর কিশোরগঞ্জ থেকে ৭ সদস্যের ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং গতকাল ভোরে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিআইডব্লিউটিএর ৪ সদস্যের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি মাসুম, হাবিব ও সাইদুর জানান, যে খালে নৌকাডুবি হয়েছে তার গভীরতা মাত্র ১২ ফিটের মতো। তারা আশপাশ এলাকা, ডুবে যাওয়া নৌকার ভেতর ও খালের তলদেশে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছেন। এ সময় শিশু নাশরা ছাড়া আর কোনো লাশের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেননি। তাদের ধারণা, সেখানে আর কোনো লাশ নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বলেন, ‘আর কোনো লাশ থাকার সম্ভাবনা নেই বলেই জানিয়েছে ডুবুরিরা। কেউ নিখোঁজ রয়েছে বলে স্বজনরাও অভিযোগ করেনি। তবুও আমরা অপেক্ষা করছি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আকতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে দেখেছি আর কোনো লাশের অস্তিত্ব নেই। নৌকাডুবির ঘটনায় আর কোনো নিখোঁজেরও খবর নেই। কেউ যদি নিখোঁজের দাবি করেন, তবে আমরা আবারও উদ্ধার অভিযান চালাব।’

এদিকে গতকাল সকাল থেকে নৌকাডুবির ঘটনায় তদন্তকাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিট্রেট মো. রুহুল আমিন এবং সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোজাম্মেল হক রেজা ও ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূঞা নৌদুর্ঘটনাস্থল চম্পকনগর নৌকা ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলেন।

মামলার পর গ্রেপ্তার পাঁচ : নৌকাডুবির ঘটনায় গতকাল সকালে বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর গ্রামের গেরাগাঁও এলাকার মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে সেলিম মিয়া বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় মামলা করেছেন। নৌকাডুবিতে তার মা রৌশনারা, বোন ফরিদাসহ পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পুলিশ সরাইল উপজেলার পানিশ^র ইউনিয়নের শোলাবাড়ি এলাকার আলী আফজালের ছেলে নৌকার মাঝি জমির মিয়া (৩৩), নৌকার সহকারী একই এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে মো. রাসেল (২২), কাশেম মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া (২২), বালুবাহী ট্রলারের মালিক মৃত আশরাফ আলীর ছেলে মো. সোলায়মান (৬৪) ও চম্পকনগর নৌকাঘাটের পরিচালক বিজয়নগরের কালারটেকের মিষ্টু মিয়াকে (৬৭) গ্রেপ্তার করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘দুটি বাল্কহেডসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এজাহারে নাম থাকায় এ মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ : যাত্রীবোঝাই নৌকাডুবির পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা থেকে জেলা শহরে আসা সব ধরনের নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে এ নিষেধাজ্ঞা সাময়িক বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বিজয়নগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাবেয়া আফসার বলেন, ‘নৌকাডুবির ঘটনার পর বিজয়নগর থেকে সাময়িক সময়ের জন্য সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে নৌযান চালুর বিষয়ে পরে জানানো হবে।’

অতিরিক্ত যাত্রীর কারণেই ডুবে যায় নৌকা : অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণেই বালুবাহী ট্রলারের ঘষা সহ্য করতে পারেনি যাত্রীবাহী নৌকাটি। ফলে অল্প গভীর খালেই ডুবে যায় চম্পকনগর থেকে ছেড়ে আসা সোনা মিয়া মাঝির নৌকা। ডুবে যাওয়া নৌকার বেঁচে যাওয়া যাত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কলেজপাড়ার বাসিন্দা নাজমীন বলেন, ‘নৌকাটি ছিল শেষ সময়ের। তারা শুরু থেকেই বেশি বেশি যাত্রী ওঠাতে থাকে। নিচের জায়গা ভরে ওপরেও অতিরিক্ত যাত্রী হওয়ায় আমরা বারবার নিষেধ করলেও তারা পাত্তা দেয়নি। অতিরিক্ত যাত্রী থাকার কারণেই বালুবাহী নৌকাটি আমাদের নৌকা ঘেঁষে যাওয়ার সময় এটি কাত হয়ে ডুবে যায়।’

বিআইডব্লিউটিএর আশুগঞ্জ-ভৈরব নদীবন্দরের পরিবহন পরিদর্শক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পাশাপাশি দুটি নৌকার ঘর্ষণ হলে অতিরিক্ত যাত্রীর কারণেই যাত্রীবাহী নৌকাটি ডুবে গেছে বলেই আমাদের মনে হচ্ছে।’