আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দরের কাছে রকেট হামলা চালানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতা জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বিস্ফোরণ ঘটল। দেশটির এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
জানা গেছে, বিমানবন্দরের উত্তর-পশ্চিম দিকের আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে গতকাল বিকেলে ওই হামলা চালানো হয়েছে। সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, সরাসরি এ রকেট হামলা বিমানবন্দরে আঘাত করেনি। হামলায় এক শিশু নিহত হয়েছে বলে আফগান পুলিশের প্রধান রশিদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে আলজাজিরা।
আলজাজিরাকে দুই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তারা একটি বাড়িতে রকেট আঘাত করতে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিওতে একটি বাড়ির ওপরে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ ওই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি।
ওই হামলার ঘটনার পর তালেবানের এক মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে জানান, কাবুল বিমানবন্দরে হামলার উদ্দেশ্যে এক আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী গাড়িতে করে এগোনোর চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র ওই গাড়িতে ড্রোন হামলা চালায়। এর বেশি বিস্তারিত জানাননি তালেবান মুখপাত্র। তবে গতকাল কাবুলে রকেট হমলার পর ‘আইএস-কে’ এর সম্ভাব্য এক বোমা হামলাকারীকে ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের ক্যাপ্টেন বিল আরবান। তাকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, ‘আইএস-কে’ এর সংশ্লিষ্ট অন্তত একজনকে বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ওই গাড়ীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিস্ফোরক ধ্বংস হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা ও ওই রকেট হামলার ঘটনা একই কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে খবর প্রকাশ করেছে আন্তজাতিক গণমাধ্যম।
এর আগে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের হামিদ কারজাই বিমানবন্দরে আরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ডাররা তাকে জানিয়েছেন, ২৯ আগস্টই ওই হামলা হতে পারে। সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হুমকি থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য সতর্ক করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
নিরাপত্তা হুমকির কারণে ওই এলাকায় ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি অবস্থান করছেন তাদের অবিলম্বে ওই এলাকা ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
কাবুলে এখনো উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুক্তরাজ্যের সৈন্য, কূটনৈতিক এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে শেষ ফ্লাইটটি কাবুল ছেড়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাবুল বিমানবন্দরের আবে ফটকে জোড়া বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) খোরাসান প্রদেশ শাখা আইএস-কে’র ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও দেড় শতাধিক মানুষ। ইসলামিক স্টেট গ্রুপের স্থানীয় একটি শাখা ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রদেশ (আইএস-কে) ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর উদ্দেশ্যে ড্রোন হামলা যুক্তরাষ্ট্রের : এদিকে আত্মঘাতীর ওই হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে গত শুক্রবার আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ‘আইএস-কে’ শীর্ষস্থানীয় দুজন নেতাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই দুজন ব্যক্তি পরিকল্পনাকারী ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী বলে বর্ণনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কাবুল বিমানবন্দরে হামলার সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
শনিবার একটি বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, এই (ড্রোন) হামলাই শেষ নয়। জঘন্য ওই হামলার সঙ্গে যে ব্যক্তিই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের খোঁজ আমরা চালিয়ে যাব এবং উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে।
আফগানিস্তানের সবচেয়ে চরমপন্থি ও সহিংস জঙ্গি গোষ্ঠী হচ্ছে আইএস-কে। আফগানিস্তানের বেশিরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী তালেবানের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা করে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছে তালেবান।
রয়টার্স জানিয়েছে, ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছে তালেবান। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা। কাবুল বিমানবন্দর থেকে দ্রুতগতিতে সৈন্যদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে সেখানে ৫ হাজার ৮০০ সেনা থাকলেও এখন রয়েছে ৪ হাজার। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত প্রত্যাহার শুরু হওয়ায় সামনের কয়েক দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বিমানবন্দরের আশপাশে আরও কয়েক স্তরের তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে তালেবান। বেশিরভাগ আফগানকে তারা এসব চেকপোস্ট পার হতে দিচ্ছে না। দুই সপ্তাহ আগে বিমানে করে উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আফগান ও বিদেশি নাগরিক মিলিয়ে কাবুল থেকে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তালেবানের অনুমতি ছাড়া আফগানিস্তানে কোনো অভিযান নয় : আফগানিস্তানের মাটিতে যেকোনো ধরনের অভিযান চালানোর আগে তালেবানের সঙ্গে আলাপ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ। কান্দাহারে আইএসের অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় এমন আহ্বান জানান তিনি।
গত শনিবার রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল আইএসের অবস্থানে ড্রোন হামলা চালানোর আগে তালেবানকে সতর্ক করা। কিন্তু তারা যেভাবে হামলা চালিয়েছে সেটি আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন। ওই হামলায় দুজন নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন শিশু বলে জানান তালেবান মুখপাত্র।
জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা চলে যাওয়ার পর তালেবান শিগগিরই কাবুল বিমানবন্দরের পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। অচিরেই সরকার ও মন্ত্রিসভা ঘোষণা করা হবে।
এদিকে আফগানিস্তানে আইএস-কে লক্ষ্য করে আরও হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি কাবুল বিমানবন্দরে আইএসের আত্মঘাতী বোমা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনা নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার ওই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই কান্দাহারে হামলা চালানো হয়।
গত ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় কাবুল বিমানবন্দরের আবে ফটকে জোড়া বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) খোরাসান প্রদেশ শাখা আইএসকে’র ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও দেড় শতাধিক।