নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন, মাদক কারবারিদের তৎপরতা ও হেফাজতে ইসলামের কর্মকা- নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। কঠোর নজরদারির মধ্যেও জঙ্গিরা তৎপর রয়েছে। মাদক কারবারিরা নতুন নতুন কৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয়। হেফাজতে ইসলামও আন্দোলন করার পাঁয়তারা করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজত সারা দেশে তান্ডব চালায়। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে। এখনো তাদের তৎপরতা আছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। তা ছাড়া পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে পুলিশ। এসব বিষয় সামনে রেখে দীর্ঘ ১০ মাস পর বসছে নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভা। বৈঠকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তায় সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার হুমকিসহ ৬টি এজেন্ডা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথাও বলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে অনুষ্ঠিত হবে বৈঠকটি। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, মাদক ও জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে একের পর এক বৈঠক করছে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। জেএমবি, জেএমজেবি, হিযবুত তাহরীরসহ আরও কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ হলেও তাদের তৎপরতা আছে এখনো। আত্মগোপনে থাকা নব্য জেএমবির সদস্যরা বিভিন্ন সেল পর্যন্ত খুলেছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন জঙ্গি ধরা পড়ার পর চাঞ্চল্যকর তথ্যও উদঘাটন করা হয়েছে। বিদেশি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলা করার পরিকল্পনা আছে জঙ্গিদের। নব্য জেএমবির অন্যতম নেতা ফোরকান ধরা পড়ার পর প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা গা ঢাকা দিলেও অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে অন্যরা। তারা পাহাড়ে গিয়ে পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। জঙ্গিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবার ও সেবন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থাকছে। যুব সমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মাদক কারবারিতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের নির্দেশে পুলিশ-র্যাবসহ সব কটি গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারি ও গডফাদারদের তালিকা তৈরি করেছে। ওই সব তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে যুক্ত থাকা হাইপ্রোফাইল লোকদের নাম আছে। তালিকার পর তালিকা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ২০১৩ সালের ৫ মে তাণ্ডবের পর ঢাকাসহ ৭টি জেলায় ৮৩টি মামলা হয় হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে। ওই সব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলাম আচমকা বিরোধিতা করে বসে। ২৫ ও ২৬ মার্চ সংগঠনটি বিক্ষোভ মিছিলের নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের কয়েকটি স্থানে ব্যাপক তা-ব চালায়। হেফাজতের একাধিক শীর্ষ নেতার ব্যাংক হিসাবও তলব করা হয়েছে। মামুনুলসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছুদিন আগে হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী মারা গেছেন। তারপরও হেফাজতের নেতাকর্মীরা তৎপর আছে বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় দেশের একাধিক সমস্যাকে চিহ্নিত করে আলোচনা করা হবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় কমিটির সভায় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি আজ আলোচনা সূচিতে রাখা হয়েছে। চিঠিতে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তায় সন্ত্রাস ও জঙ্গি অপতৎপরতার হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যা, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তা জোরদার, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মকান্ড ও মাদকের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে করণীয়সংক্রান্ত বিষয়গুলো। সভায় আসা সবাইকে ৪৮ ঘণ্টা আগে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে করোনা টেস্ট করানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গি ও মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। পুলিশ-র্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জঙ্গি ও মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা কাজ করছি। সরকার আগে থেকেই মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।’
২৯ সদস্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্বরাষ্ট্র, তথ্য, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক, পররাষ্ট্র, পরিকল্পনা, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সেনা-নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান, পররাষ্ট্র, জননিরাপত্তা, সুরক্ষা সেবা, প্রতিরক্ষা, অর্থ এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব। কমিটির সদস্য হিসেবে আরও রয়েছেন আইজিপি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক। তবে আজকের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে উপস্থিত থাকতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আলোচনায় জঙ্গিবাদ, হেফাজত, মাদক, রোহিঙ্গা ও পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার বিষয়টি রয়েছে তালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে; বিশেষ করে দেশে আইস এলএসডির মতো ভয়ংকর মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। নতুন এই মাদকসহ সব ধরনের নেশাজাতীয় জিনিসের ওপর আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা আসতে পারে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। মাদক পাচারের রুট চিহ্নিত করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। কারণ এ পর্যন্ত আটক হওয়া এ ধরনের মাদক পাচারের রুট হিসেবে মিয়ানমারের কথা উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানে কয়েকজন যুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টার বিষয়টি সামনে এলে আবারও জঙ্গিবাদের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ কারণে জাতীয় নিরাপত্তায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হুমকি হয়ে উঠছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে সভায়। এ বিষয়ে পুলিশপ্রধান ও বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রধানদের মতামত জানার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা থাকবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পাশাপাশি পদ্মা সেতুর পিলারে একের পর এক ফেরির ধাক্কার বিষয়টিও থাকবে আলোচনায়। এ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া সব ধরনের মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা থাকবে সভায়। সেখানে অগ্রাধিকার পাবে মেট্রোরেল। এ ছাড়া পদ্মা সেতুর আশপাশ থেকে এ পর্যন্ত ১৬ ভারতীয় আটকের বিষয়ও রাখা হবে। তারা কোনো রাষ্ট্রের গুপ্তচর কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হতে পারে। যদিও তাদের আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি হেফাজতের সাম্প্রতিক কর্মকা- সম্পর্কে সবার মতামতের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে এই দলের কারাবন্দি নেতাকর্মী ও তাদের নামে দায়ের হওয়া মামলায় পরবর্তী করণীয় নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তদন্তাধীন মামলাগুলোর দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশে ও বিদেশে বসে একটি চক্র সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধরকরা আগে থেকেই ওয়াকিবহাল। এখন এসব বন্ধ করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে নির্দেশনা দেওয়া হবে ওই সভায়। ভাসানচরে যাওয়ার পরও রোহিঙ্গাদের সমস্যা বিষয়ও থাকবে আলোচনায়। তারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের জন্য কতটুকু হুমকি হয়ে উঠছে, সে বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর অগ্রগতি বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের মতামত নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।