প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে সাজসজ্জা পানশিরে চলছে সংঘর্ষ

 

 

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সরকার গঠনে তড়িঘড়ি করেনি তালেবান। দেশ থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর বিষয়টি নিয়ে এগোনোর কথাও জানিয়েছিল। সে অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার তালেবান নতুন সরকার ঘোষণার প্রস্তুতি এবং রাজধানী কাবুলের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ সাজানো শুরু করেছে বলে খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

তালেবান নেতা আহমাদুল্লাহ মুত্তাকি এক টুইটে জানিয়েছেন, সরকার ঘোষণার জন্য কাবুলের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদও বলেছিলেন, নতুন সরকার ঘোষণা শিগগিরই।

দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধে আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার আফগান নাগরিক নিহত হয়েছে। কাবুল দখলের প্রায় দুই সপ্তাহ পর চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে তালেবানের নতুন সরকার ঘোষণার দিকে বিশ্ব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। আজ শুক্রবার এ সরকার ঘোষণা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে গেছে। তাদের সহযোগী অনেকে এখনো দেশটি ছাড়ার চেষ্টা করছে। যদিও কাবুল বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রাহমান আল থানি জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ে কাবুল বিমানবন্দর চালু করতে তুরস্কের সঙ্গে তারা কারিগরি সহায়তা দেবে। গতকাল দোহায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাবের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। এ সময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে অগ্রাধিকার যত দ্রুত সম্ভব ব্রিটিশ নাগরিক ও আমাদের সহায়তাকারী আফগানদের তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়া। এজন্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে।’ তবে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে না। কথা নয়, কাজ দিয়েই তাদের মূল্যায়ন করা হবে।’

রয়টার্স বলছে, নতুন সরকারের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদার। তার অধীনে একজন প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন বলে তালেবানের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন।

আখুনজাদার তিনজন ডেপুটি আছেন। তাদের একজন মোল্লা ইয়াকুব। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে। মোল্লা ইয়াকুব বর্তমানে তালেবানের সামরিক শাখার দায়িত্বে আছেন। আফগান সরকারে তার বড় ভূমিকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে পারেন আরেক ডেপুটি সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে আছেন তিনি। এ ছাড়া তালেবানের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদারও সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন।

কাতারে তালেবানের রাজনৈতিক দপ্তরের উপ-প্রধান শের আব্বাস স্ট্যানেকজাই গত বুধবার বিবিসি পশতুকে শিগগির সরকার গঠনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘দুদিনের মধ্যেই তালেবান সরকার ঘোষণা হতে পারে। সরকারের নিম্নপর্যায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা কাজ করতে পারবেন। তবে মন্ত্রিসভা বা শীর্ষস্থানীয় পদে নারীরা না-ও থাকতে পারেন। পাশাপাশি গত দুই দশকে যারা সরকারে ছিলেন, তাদের এ সরকারে নেওয়া হবে না।’

গত ১৫ আগস্ট কাবুলের পতন হয়। আফগানিস্তানের ক্ষমতা তালেবানের হাতে যায়। এবার তারা আগেরবারের চেয়ে নিজেদের শাসননীতিতে নমনীয়তা আনার ইঙ্গিত দেয়। তবে তালেবান তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে কি না, তা নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদধারী জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি জানান, নিষিদ্ধ ইসলামিক স্টেটের (আইএস-কে) জঙ্গি দমনে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিকে সবচেয়ে বড় হামলা চালায় আইএস-কে। কাবুল বিমানবন্দর এলাকায় আত্মঘাতী হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনাসহ ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। তবে সন্ত্রাস দমনে কবে নাগাদ তালেবানের সঙ্গে কাজ হতে পারে, তা উল্লেখ করেননি মার্ক মিলি। তালেবানকে ‘নিষ্ঠুর’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এটা এখনো স্পষ্ট নয়, তালেবান পরিবর্তন হবে কি না।’

এদিকে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি সতর্ক করে বলেছেন, ‘তালেবানের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলে সেখানে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দেবে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে আফগানিস্তান নিয়ে ভাবা উচিত। কারণ, আফগানদের বিচ্ছিন্ন করা হবে বিপজ্জনক।’

বিবিসি বলছে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর কাতার এবং তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ও সহায়তাকারী হিসেবে এগিয়ে এসেছে। উভয় দেশই তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের সাম্প্রতিক ইতিহাস কাজে লাগাচ্ছে। তালেবানও তাদের ওপর ভরসা করছে। তবে তাদের এ চেষ্টায় মধ্যপ্রাচ্যে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা জেগে উঠতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা দিনা এফসানডিয়ারি বলেন, ‘কাতারের জন্য আফগানিস্তান ও তালেবান বড় জয়। তালেবানের সঙ্গে শুধু মধ্যস্থতা করেছে এমন নয়, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা পশ্চিমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানসংশ্লিষ্ট কয়েকটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে তুরস্ক। আফগান প্রতিবেশী পাকিস্তানেরও ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশটি। গত সপ্তাহে কাবুলে প্রায় তিন ঘণ্টা তালেবানের সঙ্গে বৈঠক করেন তুর্কি কর্মকর্তারা।

পানশিরে সংঘর্ষ অব্যাহত : আফগানিস্তানের পানশিরে তালেবানের সঙ্গে প্রতিরোধযোদ্ধাদের সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সেখানকার বেশ কয়েকটি এলাকা দখলে নেওয়ার দাবি করেছে তালেবান।

মুহাম্মদ জালাল নামের এক তালেবান নেতা টুইটে জানান, বুধবার রাত থেকে পানশিরে সংঘর্ষ চলছে। কয়েকডজন তল্লাশিচৌকি তারা দখলে নিয়েছেন। পানশিরে পাহাড়ের ওপর একটি তল্লাশিচৌকিতে আগুন জ্বলার ছবিও পোস্ট করেন তিনি।

গত ১৫ আগস্ট তালেবান রাজধানী কাবুলের মধ্য দিয়ে ৩৪ প্রদেশের ৩৩টি দখলে নেয়। তবে এখনো নিয়ন্ত্রণে বাইরে রয়েছে পানশির। পানশিরে তালেবানের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আফগানিস্তানের প্রয়াত মোজাহিদিন কমান্ডার শাহ আহমদ মাসউদের ছেলে আহমদ মাসউদ।

অবশ্য গত বুধবার তালেবান পানশির ঘিরে ফেলার দাবি করে। সেখানে থাকা প্রতিরোধযোদ্ধাদের সমঝোতায় আসতে আহ্বান জানানো হয়।

বিদ্রোহীদের অস্ত্রসমর্পণ করার নির্দেশনা দিয়ে তালেবান নেতা আমিক খান মোতাক্বি বলেন, ‘আফগানিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। ন্যাটো কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সহায়তা নিয়েও তালেবানকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে একটি সমঝোতায় আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।’