বাজারে বেড়েই চলেছে চালের দাম। মোটা চাল কিনতে গেলেও তার দাম ৫০ টাকা কেজি। গত কয়েক বছরের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চাল। ফলে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অন্য ব্যয়ের তুলনায় চালের দাম বাড়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে বাড়ুক, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে বাড়ুক তাতে কার কী আসে যায়! বাতাসে হতাশা মেশানো প্রশ্ন ভেসে বেড়ায়, বাজার নিয়ন্ত্রণ করার আর জনগণের দুর্দশা দেখার কি কেউ নেই?
আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এ কথা শুনছে মানুষ বেশ কয়েক বছর ধরে। এক বছর বহু আড়ম্বর করে শ্রীলঙ্কায় ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানি করার কথাও হয়েছিল। কিন্তু আবার দেখা গেল চালের দাম বাড়ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে চালের দাম সবচেয়ে বেশি এবং বছরে ২০-২৫ লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাল আমদানি করার সময় আমদানি শুল্ক কমানো হয় কিন্তু চালের দাম কমে না। আর ভারত থেকে চাল আমদানি করা হয় ধান কাটার মৌসুমে। ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে চাল আমদানির হিড়িক পড়ে যায় যখন, তখন কৃষক ধান কেটে ঘরে তোলেন। কৃষক ধান বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটাতে চান, দেনা পরিশোধ করতে চান কিন্তু বাজারে দাম কমে যায় ধানের। সরকারের কৃষি বিভাগ অনেক হিসাব করে ধানের দাম নির্ধারণ করে কিন্তু কৃষক সে দামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। যেমন বোরো মৌসুমে সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্য ছিল ২৭ টাকা কেজি অর্থাৎ ধানের মণ ১০৮০ টাকা। আর চালের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সেদ্ধ চাল ৪০ টাকা এবং আতপ চাল ৩৯ টাকা কেজি। সাধারণ মানুষ যারা মোটা চালের ভাত খান তারা কি এই দামে চাল কিনতে পেরেছিলেন কখনো, কোথাও? আর কৃষক কি মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারেন?
মানুষ শুনছে দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। বোরো মৌসুমেও বাম্পার ফলন হয়েছিল। এখন আউশ ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, এবার আউশের ফলন ভালো হবে। যশোর ও টাঙ্গাইলের কৃষকদের মুখে হাসি। ধানের ফলন ভালো, কৃষি বিভাগ সহায়তা করেছে বীজ, সার ও পরামর্শ দিয়ে। চাষিরা বিআর-২৬, ব্রি- ২৮, ব্রি-৪৮, ব্রি-৮২, বিনাধান-১৯, হিরা, স্বর্ণ, শুভলতা, এগ্রো-১৪-সহ বিভিন্ন জাতের ধানের চাষ করেছেন। এরই মধ্যে যতটুকু এলাকায় ধান কাটা হয়েছে সব জায়গাতেই বলা হয়েছে ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। খরাসহিষ্ণু আউশ ধানে উৎপাদন খরচ কম, বোরো ধানের প্রায় অর্ধেক। আউশ বিক্রি শুরু হয়েছে। বাজারে মোটা ধানের দাম ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা এবং চিকন ধান ১০০০ টাকা থেকে ১০৫০ টাকা পর্যন্ত। এরই মধ্যে আমন ধান লাগানো হয়েছে এবং আউশ ধান কেটে অনেকেই আবার সেই জমিতে একটু দেরি করে আমন লাগাবেন। আমন, আউশ, বোরো মিলে ধানের মৌসুম তিনটা। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় বোরো মৌসুমে, তারপর আমন এবং সবচেয়ে কম হয় আউশ মৌসুমে। বাংলাদেশের মোট চাহিদার ১০-১২ শতাংশ পূরণ হয় আউশ ধান থেকে। ধান উৎপাদন হয় পৃথিবীর এমন অনেক দেশে বছরে তিনবার ধান চাষ হয় না। বাংলাদেশের আবহাওয়া সেদিক থেকে ধান চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। কিন্তু ধান-চালের বাজার, না চাষি, না ভোক্তা কারও জন্যই অনুকূল নয় বরং প্রতিকূল।
ধান ও চাল উৎপাদন নিয়ে হিসাব ও বাস্তবতার মিল থাকে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়। দেশে তিন মৌসুমে ধান উৎপাদন হয়েছে ৫ কোটি ২৬ লাখ টন ধান। আমেরিকান কৃষি বিভাগ সারা দুনিয়ার কৃষি ফসল উৎপাদনের হাঁড়ির খবর বের করতে সদা তৎপর। কারণ খাদ্য ব্যবসা এবং খাদ্যকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করার সুযোগ পেলে তারা ছাড়ে না। তারা হিসাব করে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের চাল উৎপাদন ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন। সেই হিসেবে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। প্রথম চীন, দ্বিতীয় ভারত, তৃতীয় বাংলাদেশ এবং চতুর্থ ইন্দোনেশিয়া। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস বা বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী চাল উৎপাদন আরও বেশি। ৩ কোটি ৬৬ লাখ টন। দেশে চালের চাহিদা কত? সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ। ধরে নেওয়া যাক জনসংখ্যা ১৭ কোটি। প্রতিদিন ৫০০ গ্রাম বা আধা কেজি চালের প্রয়োজন বললে অনেকে না না করে উঠবেন। কারণ বাচ্চারা ভাত কম খায়, নারীরা কম খায়, বৃদ্ধরাও কম খায়। তার পরও গড়ে আধা কেজি ধরলে বছরে চালের প্রয়োজন হয় ৩ কোটি ১০ লাখ টন। অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কারণ সব হিসাবেই তো চালের উৎপাদন বার্ষিক চাহিদার চেয়ে বেশি। তাহলে আমদানি করার প্রয়োজন কেন? একটা উত্তর পাওয়া গেছে। করোনাকালে মানুষ ঘরে থাকছেন তাই নাকি তাদের ভাত খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। এই উত্তরে অনেকে রেগে গেলেও করার কিছু নেই বরং চুপ করে থাকাই নিরাপদ। প্রতিবাদ করতে গেলে বিপদের আশঙ্কা আছে।
চালের ঘাটতি দূর করতে, মজুদ বাড়াতে এরই মধ্যে ৪২৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭ লাখ ২ হাজার টন চাল আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর আমদানি শুল্ক ৬২.৫ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে শুল্ক আরও কমবে এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আশঙ্কা আছে যে শুল্ক যতই কমুক বাজারে চালের দাম কমার ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়বে খুব সামান্য বরং চাল আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা নিশ্চিত হবে। কারণ চাল এমন একটি পণ্য যার দাম বাড়লেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল পরিবারগুলোকে কিনতেই হবে। দেশে প্রতিদিন কমবেশি ৮০ হাজার টন চাল প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার টন চাল বাজারে বেচাকেনা হয়। কেজিতে ৫ টাকা দাম বাড়লে ক্রেতাদের পকেট থেকে দিনে ২৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা। এ এক নিশ্চিত মুনাফার জগৎ। দেশে কিছু বড় চালের ব্যবসায়ী আছেন। বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে কিন্তু তারা তা স্বীকার করেন না।
আড়তদারদের ওপর দোষ চাপান, আড়তদার বলেন দোষ চালকল মালিকদের আর চালকল মালিকরা বলেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ধান কিনে বাজার গরম করে রেখেছেন। দোষ আসলে কারও নয়। কেউ দায় নিচ্ছেন না, শেষ পর্যন্ত দায়টা ওই ভাত খাওয়া সাধারণ মানুষের।
টিসিবি হিসাব করে দেখিয়েছে গত এক বছরে চালের দাম বেড়েছে মোটা চালের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ আর চিকন চালের ক্ষেত্রে ১৪.২৯ শতাংশ। ২০১৭ সালের পর চালের দাম বাড়ায় এটাই সর্বোচ্চ হার। এক মাসের ব্যবধানেই দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ। মোটা চাল পাইজাম, স্বর্ণা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০- ৫২ টাকা কেজি, বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা দরে। আর চিকন চাল যেমন নাজিরশাইল ৬৬-৭০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হচ্ছে। যদিও মিনিকেট নামে কোনো ধানের অস্তিত্ব কৃষি বিভাগ, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং ধান গবেষণা কেন্দ্র স্বীকার করে না, তার পরও বাজারে মিনিকেট চালের ছড়াছড়ি। একটু চিকন এই চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা কেজি দামে। বাজারে চালের এত দাম বাড়ায় কর্তাব্যক্তিরা বিস্মিত। তাদের অনেকেই বলছেন, চালের এই মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো মেনে নিতে বাধ্য। ধান উৎপাদকরা দাম না পেলেও মিলমালিক, আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা মিলে এমন এক চক্র, যা ভাঙা সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সম্ভব নয়। চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ কী এবং দায় কে নেবে তা নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কিন্তু বাজারে চালের দাম কমছে না বরং বাড়ছেই।
ঢাকা মহানগরে কিছু কিছু স্থানে মানুষকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে দূর থেকেই বলে দেওয়া যায় যে সেখানে টিসিবি ৩০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করছে। পাঁচ কেজি চাল কিনলে একজন ক্রেতার সাশ্রয় হয় ১০০ টাকা। এই টাকা বাঁচানোর জন্য রোদ, বৃষ্টি, গরম উপেক্ষা করে টিসিবির ট্রাকের সামনে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। এমন অনেককে লাইনে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে যারা আগে কখনো লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কেনেননি। নারীরা দাঁড়াচ্ছেন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার খবর আসে মাঝেমধ্যে। পাঠক খবর পড়ে দুঃখ পান কিন্তু দুঃখের কারণ তো দূর হয় না। বাজারের অদৃশ্য হাতের কথা পুঁজিবাদী অর্থনীতি বা বাজার অর্থনীতিতে খুব প্রচলিত। এই হাতটাকে দেখা না গেলেও তার আঘাত বেশ ভালোভাবেই অনুভব করেন ভোক্তারা। ভোক্তা এবং ভুক্তভোগী শব্দ দুটো আলাদা হলেও তাদের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ তা চালসহ যেকোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে গেলে বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। কৃষির অনেক উন্নয়ন হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে বহু গুণ, মানুষ এখন আর না খেয়ে থাকে না এত জনগণ শুনছে এবং দেখছে। কিন্তু চাল উৎপাদন, আমদানি, বাজারে দাম নিয়ে যে চালবাজি চলছে তা দেখার দায়িত্ব যাদের তারা কি তা দেখছেন?
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com