পরীমণির ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে

কাশিমপুর কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে কয়েকশ লোকের ভিড়। একটি সাদা গাড়ি বেরিয়ে আসছে। ফটকের কাছাকাছি আসতেই সবাই গাড়িটি ঘিরে দাঁড়াল। গাড়ির সানরুফ খুলে একজন বেরিয়ে এলেন। মাথায় ফ্যাশনেবল সাদা ওড়না বাঁধা। চোখে রোদচশমা। থুতনির নিচে মাস্ক। মুখে হাসি। সহসাই চেনা গেলপরীমণি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নায়িকা। গত ৪ আগস্ট থেকে যিনি প্রথমে র‌্যাবের হাতে আটক ও পরে দফায় দফায় সিআইডি পুলিশের রিমান্ড পেরিয়ে কারা অন্তরালে ২৭টি দিনরাত্রি কাটিয়ে জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। পরীমণিকে দেখে উপস্থিত ভক্ত, অনুরাগীরা সেলফি তুললেন, হাত মেলালেন। জবাবে পরীমণি মুখে কিছু বললেন না। হাত নাড়িয়ে জবাব দিলেন। আর তখনই দেখা গেল হাতের তালুতে মেহেদি দিয়ে ইংরেজিতে লেখা : ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’ (লাভ শব্দের বদলে ভালোবাসার চিহ্নসূচক তিনটি হৃদয় আঁকা)। এর নিচে হাতের মধ্যম আঙুল প্রদর্শনের একটি ‘বিশেষ চিহ্ন’। এই ঘটনা গত ৩১ আগস্টের।

এবার আমরা একটু পেছনে ফিরে তাকাই। ৪ আগস্ট, বিকেল। বনানীর একটি বাড়ির নিচে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দেশের এলিট ফোর্স হিসেবে পরিচিত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) শতাধিক সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। একটি বাড়ি ঘিরে তারা দাঁড়িয়েছেন। বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। ঠিক এই মুহূর্তেই ওই বাড়ির ছয়তলার বাসিন্দা নায়িকা পরীমণি ফেইসবুক লাইভে এলেন। তিনি বললেন, তার বাড়ি ঘিরে রাখা হয়েছে। তিনি ভয় পাচ্ছেন। সবার কাছে সাহায্য চাইলেন তিনি। মুহূর্তেই সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। লাখো মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার লাইভে দেখতে লাগল : একজন নায়িকা সাহায্য চাইছেন, কান্না করছেন আতঙ্কিত হয়ে। লাইভে দেখা গেল এক পর্যায়ে পরীমণি তার বাসার দরজা খুলে দিচ্ছেন। ঘরে প্রবেশ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এরপর পরীমণির ফেইসবুক লাইভ বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনার প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের’ ভিত্তিতে পরীমণির বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে তার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদের খালি বোতল, মদসহ বোতল এবং নতুন ধরনের মাদক ‘আইস’ জব্দ করা হয়েছে। বাসা থেকে আটকের পরে পরীমণিকে নিয়ে যাওয়া হয় র‌্যাবের সদর দপ্তরে। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের অফিস, আদালত, কারাগার এবং ৩টি ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদের রিমান্ড শেষে আবার কারাগার। অবশেষে কাশিমপুর কারাগার থেকে শর্ত সাপেক্ষে জামিনে মুক্তি। পরীমণির মামলার ক্ষেত্রে রিমান্ডের অপব্যবহার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, পরীমণির মামলায় তৃতীয় দফা রিমান্ডের প্রয়োজন ছিল না। আদালতের ভাষায়, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবেদন করলেন আর বিচারক (ম্যাজিস্ট্রেট) রিমান্ড মঞ্জুর করলেন, এটা তো সভ্য সমাজে হতে পারে না।’ পরীমণির দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডের যৌক্তিকতা নিয়ে নিম্ন আদালতের দুই বিচারকের কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছে হাইকোর্ট। আগামী ১০ দিনের মধ্যে দুই বিচারককে এই ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পরীমণিকে যে প্রক্রিয়ায় শতাধিক র‌্যাব সদস্যের উপস্থিতিতে আটক করা হয়েছে তা দেখে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যুদ্ধংদেহী অবস্থান দেখে এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক যে, পরীমণি দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড কোনো সন্ত্রাসী, অপরাধী। অতীতে দেশে আমরা বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময়ে এমনটা দেখেছিজঙ্গিদের আস্তানা সন্দেহে কোনো বাড়ি ঘিরে এমন তৎপরতা দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেসব দুঃসাহসিক অভিযানে জনমনে স্বস্তি মিলত। কিন্তু পরীমণি তো বাংলাদেশের সিনেমার একজন তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা। যদি ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ থেকেই থাকে, তবে আটক প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করা যেত। পরীমণি একজন নায়িকা, কোনো রাজনীতিবিদও নন। যেমনটা দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আটক করতে গিয়ে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করতে হয় পরিস্থিতি সামাল দিতে।

কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার হাতে লেখা বার্তাটি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। হাতে মেহেদির রঙে আঁকা ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’ বার্তায় তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? গণমাধ্যমে পরীমণি জানিয়েছেন ‘ডেফিনেটলি এটা তো একটা বার্তাই ছিল।’ কী বার্তা ছিল? কী বলতে চেয়েছেন পরীমণি? কাকে বা কাদের লক্ষ্য করে এটা বলেছেন পরীমণি? জবাবে পরীমণি বলেছেন, ‘এখন এটা দেখে যে মনে করবে, যার মনে হবে, আমাকে বলছে মনে হয়, ওর জন্যেই বলছি আমি।’ অভিধান বলছে ‘বিচ’ শব্দের একাধিক বাংলা অর্থ হতে পারেযেমন মাদি কুকুর, দুশ্চরিত্রা। অভিধান যাই বলুক না কেন শব্দের অর্থ স্থান-কাল ভেদে বদলে যাওয়া নতুন ঘটনা নয়। তবে এক্ষেত্রে পরীমণির এই ‘বিচ’ বার্তা তবে কার বা কাদের দিকে নির্দেশ করছে? এখানে মনে করা দরকার এর আগে ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন দাবি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন পরীমণি। গত ১৩  জুন নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে একটি খোলাচিঠি লিখেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠিতে তিনি নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার ঘটনার বিচার দাবি করেছেন। এরপর ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ, অমিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সাভার থানায় মামলা করেন পরীমণি। বাকি চার আসামি অজ্ঞাতনামা। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৮ জুন রাতে ঢাকার অদূরে বিরুলিয়ার ঢাকা বোট ক্লাবে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা ও হত্যার চেষ্টা চালান। ওই মামলায় নাসির ও তুহিনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই মামলায় নাসির ও অমির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। অবশ্য পরে তারা জামিন পেয়েছেন ৩০ জুন।

পরীমণির এই ঘটনা আমাদের সামনে তবে কী বার্তা দিয়ে গেল? প্রথমত, পরীমণিকে যে প্রক্রিয়ায় আটক করা হয়েছে, তা যথাযথ আইন ও প্রক্রিয়া মেনে হয়নি। তাকে যে বারবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল, সেটিও বাড়াবাড়ি এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা আইনি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, নারীর প্রতি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার জঘন্য ও ঘৃণ্য আচরণের প্রকাশ দেখা গেছে এই ঘটনায়। কেবল পুরুষই নয়, সহস্র বছরের সামাজিক কাঠামো ও অভ্যাসে অনেক নারীর মগজেও পুরুষতন্ত্র যে বেশ শক্তপোক্তভাবেই বাসা বেঁধেছে তারও প্রমাণ মিলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানা প্রতিক্রিয়ায়।  তৃতীয়ত, কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে হাতের তালুতে লেখা ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’ বার্তা দিয়ে নিঃসন্দেহে এই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও ক্ষমতাতন্ত্রের গালে চড় মারা সাহসী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইরত এক প্রতিবাদী নারীর প্রতিমূর্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেন পরীমণি।

পরীমণি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন অভিনেত্রী। সুন্দরী ও লাস্যময়ী। সম্প্রতি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সিদ্ধান্তে যাওয়া খুব কঠিন কিছু তো নয়! তিনি প্রথমে সমাজের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুললেন। সেই ঘটনার বিচার না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলাচিঠি লিখলেন। পরে অভিযুক্তরা আটক হলো। আবার জামিন নিয়ে বেরিয়েও এলো। এরপরই পরীমণিকে আটক করা হলো। তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেওয়া হলো। তাকে বারবার নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হলো। অবশেষে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে তার জামিন হলো। পুরো ঘটনাটি দেশে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজে ক্ষমতাসীনদের দৌরাত্ম্য এবং আইনের কঠিন মারপ্যাঁচে সাধারণ নাগরিকদের ত্রাহি অবস্থা ছাড়া আর কোনো বার্তা দিল কি আমাদের?

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক