প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য

গত ৩০ আগস্ট দৈনিক দেশ রূপান্তরে ‘রাজস্বের ভাগ মন্ত্রীর ভাগ্নের পকেটে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেইন সিস্টেমস। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান ‘বেঞ্চমার্ক পিআর’-এর যোগাযোগ ব্যবস্থাপক রেহনুমা তারান্নুম স্বাক্ষরিত প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, থেইন সিস্টেমস মন্ত্রীর ভাগ্নের কোম্পানি নয়। আর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত নামির আহমেদের থেইন সিস্টেমসে কোনো অংশীদারিত্ব বা মালিকানা নেই। কাজেই থেইন সিস্টেমস নামির আহমেদ বা মন্ত্রীর ভাগ্নের কোম্পানি নয়। মালিকানাসংক্রান্ত এই তথ্যটি সম্পূর্ণরূপে ভুল কিংবা অসত্য তথ্য।

বিএমইটি তাদের নিবন্ধন ফি থেকে থেইন সিস্টেমসকে কোনো রাজস্বের ভাগ দিচ্ছে না, বরং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিবন্ধন ফির নির্ধারিত পুরো ২০০ টাকাই বিএমইটিকে পরিশোধ করে দিচ্ছে জানিয়ে প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেওয়া অতিরিক্ত ১০০ টাকা থেকে সরকারের ভ্যাট ও এআইটিসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধের পর বাকি অংশ অ্যাপ্লিকেশনের উন্নয়ন, কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে খরচ করছে থেইন সিস্টেমস। চুক্তি অনুসারে, বিএমইটিকে প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর তাদের পাওনা পরিশোধ করার কথা। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সকল পাওনা থেইন সিস্টেমস ১৯ আগস্ট পরিশোধ করে দিয়েছে। বর্তমানে কোনো লেনদেন বাকি নেই। চুক্তি অনুসারে, বিএমইটির সাধারণ ফির পাশাপাশি থেইন সিস্টেমস একটি সার্ভিস ফি নিয়ে থাকে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ সরকারের ২০০ টাকার পাশাপাশি থেইন সিস্টেমস সার্ভিস চার্জ হিসেবে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা আদায় করতে পারবে। তবে বর্তমান মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রবাসী কর্মীদের সুবিধার্থে থেইন সিস্টেমস ১০০ টাকা সার্ভিস চার্জ আদায় করছে।

প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, ৩৭ কোটি একটি সম্পূর্ণ বানোয়াট সংখ্যা এবং এই পণ্যের (অ্যাপ) চুক্তিভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই চুক্তির মেয়াদ ৫ বছর, কিন্তু বিএমইটির নিবন্ধনের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট নয়। থেইন সিস্টেমসের দায়িত্ব হচ্ছে পণ্যটিকে বাজারজাত করা, কেন এই পণ্য ব্যবহার করা উচিত সে সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং এই চুক্তির মেয়াদকালে থেইন সিস্টেমসের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা নেই।

পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনে দেরি হওয়ার জন্য ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ দায়ী নয় উল্লেখ করে থেইন সিস্টেমস বলেছে, বিএমইটি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ দারুণ সফল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন জটিলতার বিষয়টিকে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের কারিগরি ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করাটি সঠিক নয়। বিষয়টি বিএমইটি ও পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষের সংযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে হচ্ছে, যেটি নিয়ে মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষ ত্রিপক্ষীয় সভায় আলোচনা করেছে।

প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, ‘প্রতিবেদনে থেইন সিস্টেমসকে একটি অখ্যাত আইটি কোম্পানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টিকে আমরা প্রতিবেদকের অজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করছি। থেইন সিস্টেমস বিগত ১৩ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাথে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।’

প্রতিবেদকের বক্তব্য : প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কাছে দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। প্রথমত থেইন সিস্টেমস ও বিএমইটির এ ধরনের চুক্তি পিপিআর ২০০৮, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯-এর ধারা ৭ এবং ট্রেজারি রুলসের রুল-৩ ও ৭ (১)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী সরকারের এই রাজস্ব মাঝপথ থেকে ভাগাভাগির আইনগত কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংযুক্ত তহবিলে সরাসরি এ অর্থ জমা হওয়ার কথা। কিন্তু রাজস্বের এ অর্থ জমা হচ্ছে একটি বেসরকারি ব্যাংকে। এ বিষয়ে চলতি বছরের ২৯ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭ এবং ট্রেজারি রুলসের রুল-৩ ও ৭ (১) অনুযায়ী সরকারের সব ধরনের রাজস্ব ও বিভিন্ন সেবা ফি সরাসরি সরকারের সংযুক্ত তহবিলে জমা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে  (টিএসএ) জমার বিধান রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন বিভাগ, মন্ত্রণালয়/অধিদপ্তর ও পরিদপ্তর অর্থ বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ ব্যতিরেকে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে রাজস্ব সেবা ফি বাবদ প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বা এর এজেন্ট সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ব্যতীত অন্য কোনো ব্যাংকে জমা রাখছে, যা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি পরিপন্থী।’

পরিপত্রে আরও বলা হয়, ‘আইন ও বিধির সঙ্গে মিল রেখে সরকারের রাজস্ব ও ফি জমা দেওয়ার বিদ্যমান পদ্ধতি সহজীকরণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ১৮ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ‘এ চালান’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। যেসব মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা সরকারি রাজস্ব বা অর্থ বেসরকারি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমার চুক্তি করেছে তা তাদের অনতিবিলম্বে চুক্তি বাতিল করে ‘এ চালান’ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে টিএসএ’র মাধ্যমে জমা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।’

দ্বিতীয়ত, থেইন সিস্টেমসের হেড অব অপারেশনস তানভির সিদ্দিকী ও মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে থেইন সিস্টেমস নামে প্রতিষ্ঠানটির মালিক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর ভাগ্নে নামির আহমেদ, যা একটি লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে চলছে। এছাড়া চলতি বছরের ৮ মে থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ মানুষ ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে মোট ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিবন্ধন ফি হিসেবে আসলেও সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে ৫ কোটি টাকা। বাকি ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়েছে নামির আহমেদের প্রতিষ্ঠান। এই হিসেবে চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি কমপক্ষে মোট সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা নেবে। এটি থেইন সিস্টেমসের কর্মকর্তা ও বিএমইটির দেওয়া হিসাবে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিবেদকের কোনো ধরনের মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

আর অ্যাপসের ফলে কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. সরোয়ার আলম গত ২৩ মে বিএমইটিতে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠির অনুলিপি দেশ রূপান্তরের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া পূর্বে নির্ধারিত ২০০ টাকা নিবন্ধন ফি বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করতে হলে এবং যে আইনে থেইন সিস্টেমসকে অ্যাপসের কাজ দেওয়া হয়েছে তা অনুমোদন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হওয়ার কথা। সে বিষয়েও প্রতিবাদলিপিতে কিছু বলা হয়নি। এছাড়া বিএমইটির জন্য আরও কয়েকটি অ্যাপস তৈরি করে তা থেইন সিস্টেমসের কব্জায় নেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে সেসব বিষয়ও প্রতিবাদলিপিতে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।