দিনাজপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আইনুল হক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছেন। চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে গড়ে তুলেছেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। শুধু তাই নয়, একক সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল ও কর্নার নির্মাণে বরাদ্দের টাকায় করছেন বাথরুম। সম্প্রতি অধ্যক্ষের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ৩৩টি অভিযোগ উল্লেখ করে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে লিখিত আবেদন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মকর্তারা।
ইতিমধ্যে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তদন্তদল দিনাজপুর এসে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে অনেক অভিযোগের সতত্যা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্তদলের সদস্যরা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ আইনুল হক বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। প্রত্যেকটি খরচের ভাউচার রয়েছে। যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ চাইলে জমা দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু মুর্যাল ও কর্নার স্থাপনে কোনো বরাদ্দই হয়নি। আগের অধ্যক্ষের আবেদনে যে বরাদ্দ আসে, সবার সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে খরচ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘লালমনিরহাটে আমার স্ত্রী বেসরকারি পলিটেকনিক পরিচালনা করছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ানো হয়। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
দিনাজপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের জুলাইয়ে তাদের এখানে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন প্রকৌশলী আইনুল হক। তিনি নানা অনিয়মের কারণে আগেও তিনবার বরখাস্ত হয়েছেন। কিছুদিন পরই স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেন অধ্যক্ষ। কোষাধ্যক্ষকে অব্যাহতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমের ক্ষমতা নিজের দখলে নেন। তার যোগদানের আগে প্রতিষ্ঠানের সোনালী ব্যাংকের হিসাবে (নম্বর-১৮০৯৩৩৩৪০২১০৪৬) ৪ লাখ ৮১ হাজার ২৬০ টাকা স্থিতি ছিল। কোনো রকম বিল-ভাউচার ছাড়াই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ওই বছরের ২৫ ও ৩১ আগস্ট দুটি চেকের মাধ্যমে হিসাব থেকে ৩ লাখ টাকা তুলে নেন। প্রতিষ্ঠানের আয় অনুসারে বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকা স্থিতি থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৬ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে দিনাজপুর টিটিসি ২ থেকে ৬ মাস মেয়াদি বিভিন্ন কোর্সে ৪৫৬ প্রশিক্ষণার্থীর ভর্তি ফি বাবদ ৮ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৬ টাকা, চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসএসসি (ভোকেশনাল) শিক্ষাক্রমে নবম ও দশম শ্রেণির ৩১৭ শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি বাবদ ৩ লাখ ২৯ হাজার ৪২০ টাকা, ২০২০ সেশনে নবম শ্রেণির ও ২০২১ সেশনে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ বাবদ ২ লাখ ৯০ হাজার ৭৫০ টাকা আদায় করে। আদায় করা অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমার নিয়ম থাকলেও অধ্যক্ষ তা করেননি। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেছেন।
আগের অধ্যক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও ভবনে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপনসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের প্রস্তাব দেন। এতে বরাদ্দ ধরা হয় ১০ লাখ টাকা। এসব প্রকল্পের অধীনে অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন হয় বর্তমান অধ্যক্ষ আইনুল হকের সময়। প্রকল্পের আওতায় টয়লেট, ইউনিরাল ও ম্যাসন ওয়ার্কশপ সংস্কারের জন্য ৫ লাখ ৯১ হাজার ৮৬১ টাকার কাজ পায় তুরাগ এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের উপেক্ষা করে কয়েকজনের যোগসাজশে নিজেই কাজ বাস্তবায়ন করছেন অধ্যক্ষ। চলতি বছরের ২ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল ও কর্নারের অর্থে বাথরুম করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ প্যাকেজের কাজে আগে কেনা ম্যাসন ও প্লাম্বিং কোর্সের প্রশিক্ষণের কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। আর ইলেকট্রিক্যাল সাব-স্টেশন ও বিবিধ কাজের প্যাকেজের বিল উত্তোলন করা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩৭৩ টাকা। এই প্যাকেজেরও ৮৫ শতাংশ কাজ ম্যাসন কোর্সের প্রশিক্ষণার্থী ও প্রশিক্ষণের কাঁচামাল দিয়ে করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুটি প্যাকেজ থেকে অন্তত ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা অধ্যক্ষ আত্মসাৎ করেছেন।
এ ছাড়া গত বছরের ডিসেম্বরে অধ্যক্ষ সেইপ প্রকল্পে ম্যাসন ও প্লাম্বিং কোর্সের প্রশিক্ষণের কাঁচামাল কেনা বাবদ ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকার ভাউচার করেছেন রংপুরের কম্পিউটার প্রটোকল নামে একটি দোকানের নামে। কম্পিউটার সামগ্রীর এই দোকান থেকে ইট, বালু, রড, বাঁশ, সিমেন্টের মতো নির্মাণসামগ্রী কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষ চলতি বছরের ১১ এপ্রিল ৩০ বস্তা সিমেন্ট কেনা বাবদ ১৭ হাজার ৫৫০ টাকা আত্মসাৎ করেন। গত ২৯ মে ডাটাবেজ খাত থেকে জবপ্লেসমেন্ট কর্মকর্তাকে ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের দায়িত্ব দেখিয়ে ৪৪ হাজার ৯৫৫ টাকার বিল করেন এবং একই খাত থেকে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বেয়ারার চেকের মাধ্যমে ৩২ হাজার ৪০০ টাকা নিজের পকেটে ভরেন। ওই প্রকল্পের ড্রাইভিং কোর্স বাবদ ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা তুলে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন তিনি।
রংপুরের কম্পিউটার প্রটোকলের মালিক এসএম মোনায়েম ইসলাম জানান, তাদের দোকান থেকে কোনো ধরনের নির্মাণসামগ্রী বিক্রি করা হয় না। তবে কেউ চাহিদা দিলে সরবরাহ করা হয়। দিনাজপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মালামাল সরবরাহের কথা বললেও কী কী দিয়েছেন তা জানাতে পারেননি তিনি।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর ১৭ নম্বর ধারা অনুসারে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা তার স্ত্রী-সন্তান সরকারের অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা করতে পারবেন না। কিন্তু অধ্যক্ষ আইনুল হকের মালিকানাধীন নর্থ বেঙ্গল ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইআইএসটি) (কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোড নং-১৫০৯৬) নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লালমনিরহাট সদর ও আদিতমারী উপজেলায় দুটি ক্যাম্পাস রয়েছে। সেখানে তার স্ত্রী আবেদা সুলতানা পরিচালক এবং আইনুল হক নিজে আছেন উপদেষ্টা হিসেবে।
এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ বিনা বেতনে পড়ানোর দাবি করলেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের থেকে ভর্তি ফি ছাড়াও নিয়মিত বেতন নেওয়া হয়। এমনকি প্রতি সেমিস্টারে বই নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ৫০০ টাকা করে দিতে হয়।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক দিনাজুপর টিটিসির একাধিক শিক্ষক জানান, তাদের অভিযোগের পর গত ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট ব্যুরোর কয়েকজন কর্মকর্তা দিনাজপুর এসে অধ্যক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করেন। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন। তারা বলেছেন, বিস্তারিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।