শিক্ষার্থীরা নিরাপদে শ্রেণিকক্ষে ফিরুক

দীর্ঘ ১৭ মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। দেশে করোনাভাইরাস মহামারীর পর গত বছরের মার্চের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এই সময়ে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন ও মোবাইলে পাঠদানের উদ্যোগ চালু থাকলেও তা খুব বেশি কার্যকর হয়নি। শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি এ পাঠদান প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রাযুক্তিক কারণে এ প্রক্রিয়ায় যুক্তই হতে পারেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও করোনার এই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবকিছু পরিবর্তিত নতুন নিয়মে ঠিকই চলেছে। কেবল বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। 

দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা পাওয়া গেল এমন সময়ে যখন উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাতে দেশের ১৫টি জেলা বন্যাকবলিত। বন্যায় এই ১৫ জেলায় অনেক স্কুল-কলেজে ঢুকে পড়েছে পানি। সেগুলো এখনো পাঠদানের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়নি। এসব স্কুল-কলেজে কীভাবে পাঠদান চালু করা যাবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারীর দীর্ঘ ছোবলের পরে এই বন্যা পরিস্থিতি দেশের বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। এমতাবস্থায় বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা না-খোলা সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠদানের উপযোগী করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এজন্য ১৯ দফা গাইডলাইনও দেওয়া হয়েছে। আপাতত শ্রেণিকক্ষ উন্মুক্ত হলেও পুরো কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। চলতি বছরের এইচএসসি ও এইচএসসি সমমান পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল বছরের শুরুতে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। করোনা সংক্রমণ বিবেচনায় নিয়ে এখন সবার আগে এসএসসি-এইচএসসি ও পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সপ্তাহে এক দিন করা হয়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি এসএসসি এবং ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে ফেরানো হচ্ছে। বন্যায় ডুবে যাওয়া বিদ্যালয় ছাড়া অন্যগুলো সরকারের নিয়ম মেনে খোলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের পাকা ভবনে বেসিন স্থাপন করে তোয়ালে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টিস্যু পেপার ও সাবানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের দূরত্ব বজায় রেখে বসানোর যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান বন্যায় আক্রান্ত সেগুলোতে বন্যার পানি নেমে গেলে জীবাণুমুক্ত করে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে পানিবাহিত কোনো রোগ আবার ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকেও নজর দিতে হবে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষের পাঠ কার্যক্রমের বাইরে থাকায় নতুন করে পাঠে ফিরতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই সময় লাগতে পারে। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি বা খেলাধুলা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ভালো অবস্থানে থাকতে পারে। শুরুতে কম ক্লাসের ব্যবস্থা রেখে পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধীরে ধীরে ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। দীর্ঘ ১৭ মাস যেহেতু শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ছিল না, তাই শুরুর দিকে দৈনিক চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ক্লাস নেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। তারপর ধীরে ধীরে ক্লাসের সময়সূচি স্বাভাবিক করা যেতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন করে খোলার কারণে কোথাও যদি সংক্রমণ বাড়ার কোনো আশঙ্কা তৈরি হয় সেখানে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। যদি স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ কারণে বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকতে হবে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ম্যানিজিং কমিটি, শিক্ষা কর্মকর্তা এবং অভিভাবকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কোনোভাবেই  শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টিকে অবহেলা করা যাবে না। দীর্ঘদিন পর শ্রেণিকক্ষে ফেরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নিশ্চিত পাঠদান করে শিক্ষার বিগত দিনের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত।