বরিশালের গৌরনদীর দুটি গ্রামের চারটি হতদরিদ্র পরিবারের গৃহবধূদের নামে ‘আয়কর’ পরিশোধের নোটিস পাঠিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের কর্মকর্তারা। যদিও আয়কর আইন অনুযায়ী এসব হতদরিদ্র নারীর কেউই আয়করের যোগ্য আয় করেন না বা আয়কর যোগ্য সম্পদের মালিকও তারা নন। যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায় তাদের এভাবে আয়করের নোটিস পাঠানোয় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আয়কর কর্মকর্তাদের পাঠানো নোটিসে তিন নারীকে আয়কর পরিশোধ না করার জন্য কেন জরিমানা করা হবে না, তার কারণ দর্শানোর জন্য সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আরেক নারীকে আবার জরিমানা করে তা পরিশোধের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নোটিস পাওয়া পরিবারের সদস্যরা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এদিকে হতদরিদ্র পরিবারের নারীদের নোটিস পাঠানোর কারণ হিসেবে কর কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে অন্য কেউ হয়তো ই-টিআইএন গ্রহণ করেছেন। তাই নিয়ম অনুযায়ী তাদের আয়করের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
আয়কর পরিশোধের নোটিস পাওয়া গৃহবধূরা হলেন মাহিলাড়া ইউনিয়নের শরিফাবাদ গ্রামের ভ্যানচালক কবির ইসলাম বেপারির স্ত্রী গৃহিণী কল্পনা বেগম, মাহেন্দ্রচালক ফারুক হোসেনের স্ত্রী সেলিনা বেগম, দিনমজুর মহসিন বেপারির স্ত্রী সুবর্ণা মোহসিন ও বিল্বগ্রাম এলাকার দিনমজুর চাঁন মিয়া সরদারের স্ত্রী গৃহিণী মনোয়ারা বেগম। তাদের মধ্যে কল্পনা বেগম, সেলিনা বেগম ও সুবর্ণা মোহসিন একই পরিবারের আপন তিন ভাইয়ের স্ত্রী। নোটিসে তাদের গ্রাম মাহিলাড়া উল্লেখ করা হলেও তারা তিনজনই শরিফাবাদ গ্রামের বাসিন্দা।
নোটিস পাওয়া চারজনের মধ্যে কল্পনা বেগম ও সুবর্ণা মোহসিনের নামে গত ২৮ জুলাই, সেলিনা বেগমের নামে ২২ আগস্ট এবং মনোয়ারা বেগমের নামে ২৪ আগস্ট বরিশাল উপকর কমিশনার কার্যালয়ের বৈতনিক শাখা থেকে উপকর কমিশনার স্বাক্ষরিত নোটিসগুলো ইস্যু করা হয়েছে। নোটিসে কল্পনা ও সুবর্ণাকে আয়কর পরিশোধ না করার জন্য কেন জরিমানা করা হবে না, সে ব্যাপারে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মনোয়ারাকে কেন জরিমানা করা হবে না, সে ব্যাপারে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর সেলিনাকে জরিমানা করে তা ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আয়কর পরিশোধের নোটিস পেয়ে হতবাক গৃহিণী সুবর্ণা ও তার পরিবারের সদস্যরা। তিনি জানান, তার স্বামী পেশায় দিনমজুর। তাদের পরিবারে প্রতিবন্ধী দুই সন্তান রয়েছে। শুধু বসতভিটে ছাড়া তাদের আর কোনো সম্পত্তি নেই। এরপরও আয়কর পরিশোধ করার জন্য বরিশাল উপকর কমিশনারের কার্যালয় থেকে তার নামে রাষ্ট্রীয় খামে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।
নোটিস পাওয়া আরেক গৃহিণী কল্পনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্বামী পেশায় ভ্যানচালক। এমন কোনো সম্পদ আমাদের নেই যে আমাদের নামে আয়কর পরিশোধের জন্য সরকারি চিঠি ইস্যু করতে হবে।’ প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন বিল্বগ্রাম এলাকার দিনমজুর চাঁন মিয়ার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম।
আরেক ভুক্তভোগী গৃহিণী সেলিনা বলেন, ‘আমার স্বামী একজন মাহেন্দ্রচালক। অথচ আমার নামে আয়কর পরিশোধের জন্য নোটিস করা হয়েছে। এমনকি আমি আয়কর পরিশোধ না করায় আমাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে মর্মে নোটিস জারি করা হয়।’
এ প্রসঙ্গে মাহিলাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে আয়কর পরিশোধের জন্য নোটিসপ্রাপ্ত চারজন গৃহিণী হতদরিদ্র। যার মধ্যে সুবর্ণা এবং সেলিনার স্বামীর নামে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির রেশন কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অপর দুই গৃহিণীর স্বামী দিনমজুর। তাদেরও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিয়ে চলতে হয়। হতদরিদ্র পরিবার চারটিকে আয়করের আওতামুক্ত করার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বরিশাল কর অঞ্চলের উপকর কমিশনার, সদর দপ্তর (প্রশাসন) মো. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি কেউ জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে ই-টিআইএন গ্রহণ করেন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তাকে আয়করের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এ ক্ষেত্রে ওই চারজনের (হতদরিদ্র চার নারী) আইডি কার্ড ব্যবহার করে কেউ হয়তো আয়করের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন। ফলে তাদের কর রিটার্ন দাখিলের জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছে। আর নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে ন্যূনতম জরিমানা পাঁচ হাজার টাকা।’
ভুক্তভোগী চার নারী বা তাদের মধ্যে যেকোনো একজন কর কার্যালয়ে কাগজপত্র নিয়ে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান এই কর কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আয়কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবার চারটিকে আয়করমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’