টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্প

শর্তের জালে আটকা ৪০ হাজার জনের ভাগ্য

শর্তের বেড়াজালে আটকে গেছে বনাঞ্চলের ৪০ হাজার জনের ভাগ্য। টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের আওতায় বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার কথা ছিল। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকায় নতুন বনায়নেরও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের অর্থায়নকারী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে ৩ বছরে প্রকল্পের এক-চতুর্থাংশ অর্থও ব্যয় করা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে একদিকে উজাড় হচ্ছে বন। ফলে পরিবেশের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

বন অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বনের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস ও তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই বন ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পটি গৃহীত হয়েছে। মূলত ৫৪টি কম্পোনেন্টের মাধ্যমে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর দেশের ৮টি বিভাগের ২৮টি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বিশ^ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে মোট ১ হাজার ৫০২ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। বর্তমানে সুবিধাভোগী নির্বাচনের জন্য এনজিও নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান আছে। এর ফলে সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প জীবিকায়ন সুবিধা কার্যক্রমের কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের কাজে গতি আসেনি। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের বেঁধে দেওয়া বেশ কিছু শর্তও রয়েছে। তারা জানান, প্রকল্প পাস হলেও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি প্রক্রিয়া সম্পাদনে প্রায় ১০ মাস দেরি হয়ে যায়। এরপর বিশ^ব্যাংক লোন ইফেক্টিভ ডেটের শর্ত আরোপ করাসহ ভারতের চেন্নাইয়ের আঞ্চলিক অফিস থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ, ক্লায়েন্ট কালেকশনের অনলাইন হিসাব খোলার শর্ত আরোপ করে। অন্যথায় তারা অর্থছাড় করছে না। এসব শর্ত মেনে প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত ব্যাংকের হিসাব খোলা ও চেক ইস্যু করতে অধিক সময় ব্যয় হয়।

ফলে প্রকল্পের মেয়াদকাল প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলেও অর্থছাড় হয়েছে খুবই কম। গত ৩ বছরের মোট বরাদ্দে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লিখিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি বিধায় অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পটির ধীরগতিতে বাস্তবায়নের আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকল্পের প্রারম্ভিক প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধিবিধান (প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, প্রকল্পের হিসাব পরিচালনায় অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন) পরিপালনে দেরি হয়। প্রকল্পের প্রথম বছর নার্সারি উত্তোলন না থাকায় দ্বিতীয় বছর ধীর বর্ধনশীল প্রজাতির মিশ্র বাগান সৃজন সম্ভব হয়নি। ফলে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ সালে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রকল্পের বনায়ন ও অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পের আওতায় সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং প্রকল্প এলাকায় বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয়বর্ধক কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করার কথা ছিল। বর্তমানে প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় বন বিভাগের ১৮টি প্রশাসনিক বন বিভাগে বনায়ন ও সংরক্ষিত এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন আছে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিবেশসহ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ^ব্যাংক সব সময় বাংলাদেশের পাশে ছিল। এখনো রয়েছে। শর্তের কারণে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘ্নের সৃষ্টি করলে আলাপ-আলোচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

ডিপিপি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে মোট প্রকল্প সংস্থান ১ হাজার ৫০২ কোটি ৭২ লাখ টাকার বিপরীতে ফেব্রুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৩৪ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা, যা মোট প্রকল্প বরাদ্দের ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ডিপিপিতে প্রকল্পের আওতায় ১৬২টি প্যাকেজ ক্রয়ের সংস্থান আছে। এর মধ্যে ৮৮টি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান সম্পন্ন হয়েছে এবং ২৫টি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে ৪৯টি প্যাকেজের কোনো দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। প্রকল্পের আওতায় মোট ৩৭টি প্যাকেজের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ১৬ মাস বিলম্বিত হয়েছে।

প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি সরেজমিন পরিদর্শন করে থাকে। এ প্রসঙ্গে আইএমইডির সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পটিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ, স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ এবং অপর্যাপ্ত জনবলসংকট দূরীভূতকরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিপিপি অনুযায়ী, সুবিধাভোগী নির্বাচন করে সহযোগিতামূলক বনায়ন কার্যক্রম শুরু করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।