সম্মেলনের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের মধ্যকার বিশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানোর নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় সভাপতি। তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের গণমাধ্যমে বুঝে শুনে কথা বলার পরামর্শ দেন। সংগঠনের বাইরে এমপিদের ‘এমপি লীগ’ না করে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন দলীয় সভাপতি। দলীয় শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করার নির্দেশও দেন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে নির্বাচনী ইশতেহার আপডেট করতে উপকমিটিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানান।
দীর্ঘ এক বছর ৫ ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সূচনা বক্তব্যের পর সাতজন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক তাদের দলীয় রিপোর্ট পেশ করেন। চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশের বাইরে থাকায় তিনি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। সাংগঠনিক সম্পাদকরা তাদের বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সমস্যা তুলে ধরেন। প্রায় সবার রিপোর্টেই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে এমপিদের বিরোধ, কমিটিতে এমপিদের পারিবারিক আধিপত্য বিস্তার, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজনদের পদ-পদবি দেওয়ার প্রচেষ্টা, ত্যাগী নেতাদের দূরে রাখা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নানা সমস্যার বিষয় তুলে ধরেছেন।
সাংগঠনিক সম্পাদকদের বক্তব্যের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে বিভাগীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকরা কথা বলেছেন। চারজন যুগ্ম সাধারণের মধ্যে মাহবুব-উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত ছিলেন। আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ভারত থেকে গতকাল দেশে ফিরেছেন, তাই বৈঠকে উপস্থিত হননি।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিগত কিছু নির্বাচনে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে যারা লিখিতভাবে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে নাটোর ও পাবনা জেলার সাংগঠনিক স্থবিরতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সভাপতি-সেক্রেটারি যদি একসঙ্গে কাজ করতে না পারে, তাহলে এর বিকল্প চিন্তা করতে হবে। বিকল্প হলো সম্মেলন। পরে নাটোর ও পাবনা জেলার সম্মেলন যথাক্রমে ৬ ও ৭ নভেম্বর ঠিক করা হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী এমপিদের বিষয়ে বলেন, নানা কারণে অনেক বিষয় চিন্তাভাবনা করে জয় নিশ্চিতের জন্য অনেককেই এমপি মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাই বলে এই নয় যে, এমপি হয়েই তারা সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমস্যা তৈরি করবেন। সংগঠনের মধ্যে এমপি লীগ তৈরি করা এবং ত্যাগী নেতাদের দূরে রাখার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। কোনো বাড়াবাড়ি করা যাবে না। সংগঠন সংগঠনের মতো চলবে।
বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘মেইনলি ৮টি বিভাগের ৮ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের বক্তব্য তিনি (নেত্রী) শুনেছেন কার্যনির্বাহী সভায়। চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক দেশে নেই, সেখানে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম তার বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিভাগের রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের অন্য নেতারা ৮ বিভাগের ওপর নিজেরা লিখিত রিপোর্ট করেছেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তাদের এলাকার ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যন্ত রাজনৈতিক চিত্র কী তা জানিয়ে রিপোর্ট উত্থাপন করেছেন নেত্রীর সামনে।’
তিনি বলেন, ‘যেখানে যেখানে সাংগঠনিক সমস্যা আছে এবং যেগুলো সমাধান করা দরকার, সেগুলোর ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি। কিছু কিছু ছোটখাটো কলহ-বিবাদ আছে, সেগুলোও মীমাংসা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘পাবনায় গত পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে অনেকেই বিদ্রোহ করেছেন, পৌর এবং সদর এলাকার নেতারা। তারা ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন; প্রায় ২০ জন নেতা। তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আবার উনি (শেখ হাসিনা) এটাও বলেছেন, যারা দলের ডিসিপ্লিনের বাইরে কাজ করেছেন, বিভিন্ন জায়গায় তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের ব্যাপারে ছাড় দেওয়া যাবে না।’
‘বৈঠকে সরকারের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র চলছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে’ জানিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘যতই নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে ততই অপপ্রচারের মাত্রা বাড়ছে। অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে। এসব অপপ্রচারের জবাব দিতে হবে। চক্রান্তমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।’
ওবায়দুল কাদের জানান, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের প্রতি। তারা সারা দেশে ঘুরে ঘুরে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ জন্য তিনি খুশি হয়েছেন। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
নোয়াখালীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখানে কোনো কথা হয়নি। সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন আলাপ-আলোচনা করে একটা কাঠামো তৈরি করেছে নোয়াখালীর কমিটি নিয়ে। এ ব্যাপারে নেত্রীও অবহিত আছেন। স্বপন এখন দেশের বাইরে আছে। ফিরে এলে প্রকাশ করা হবে।’
মির্জা আবদুল কাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে আপনি অব্যাহতি চেয়েছেনসাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। দীর্ঘ ১২ বছর দল ক্ষমতায় থাকায় কিছুটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। সকল দুর্বলতা কাটিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তিনি বলেন, সংগঠন শক্তিশালী হলে, দেশ উন্নত হলে ষড়যন্ত্রও বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
ওবায়দুল কাদের বৈঠক সম্পর্কে বলেন, স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সেমিনার করে আগামী নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজে হাত দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোন কোন বিষয় ইশতেহারে আনা যায়, এ নিয়ে উপ-কমিটিগুলোকে কাজ করতে হবে। বিদ্রোহী ইস্যুতে তিনি বলেন, ক্ষমা চেয়ে চিঠি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাবনা পৌরসভা নির্বাচনের বিদ্রোহীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন দলীয়প্রধান।
বৈঠকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন অপপ্রচার নিয়ে কথা হয়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অপপ্রচার বেশি হচ্ছে। অপপ্রচার মোকাবিলা করতে হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা করোনার মধ্যে জনগণের পাশে থেকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
ওবায়দুল কাদের বলেন, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় সাড়ে তিনটা পর্যন্ত লম্বা বৈঠক হয়েছে। এতে ফোকাসটা ছিল সাংগঠনিক এবং পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়। নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন বিভাগকে সেমিনারের মাধ্যমে যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষাএগুলোর সেমিনারের মাধ্যমে আমাদের পরবর্তী যে নির্বাচনী ইশতেহার হবে, সেই ইশতেহারে যে বিষয়গুলো থাকবে সেগুলো আপডেট করার জন্য উপকমিটিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপকমিটির কয়েকজন সদস্য সচিবের বক্তব্যও শুনেছেন দলের সভাপতি।