তালেবান মন্ত্রিসভায় না রাখায় আফগান নারীদের বিক্ষোভ

অবশেষে বর্ষীয়ানদের প্রাধান্য দিয়ে আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে তালেবান। ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদেরই ঠাঁই হয়েছে তালেবান সরকারে। অনুমিতভাবেই এ সরকারে নেই কোনো নারী সদস্য। অর্থনীতি বা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদেরও জায়গা হয়নি প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ হাসান আখুন্দের এই সরকারে। অবশ্য নতুন এ সরকারের ঘোষণার আগে থেকে তালেবান নেতারা স্পষ্ট করেছিলেন অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। তাদের আশা ছিল নতুন সরকার নিয়ে বিদেশে সমালোচনা হলেও দেশের ভেতরে কোনো প্রতিবাদ বিক্ষোভ হবে না। তবে তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে রাজধানী কাবুলসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমেছেন তারা। ন্যূনতম স্বাধীনতার পাশাপাশি সরকারের নারী প্রতিনিধি চান তারা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য, এই বিক্ষোভকারীদের বুকে বন্দুক তাক করেও থামানো যাচ্ছে না।

এদিকে এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ দমনে নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে তালেবান সরকার। কোনো ইস্যুতে বিক্ষোভের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে অনুমতি নেওয়ার আবেদন করতে বলেছে সরকার। এ ছাড়া বিক্ষোভ ঠেকাতে কাবুলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করেছে সরকার। গত বুধবার বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনও চালিয়েছে তালেবান। হেরাতে বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে একাধিক বিক্ষোভকারীকে। অবশ্য এই পরিস্থিতির মধ্যেই দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ হাসান আখুন্দ সাবেক আমলা-কূটনীতিকদের দেশে ফিরে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীদের স্বাধীনতার ইস্যুতেই দেশ-বিদেশে প্রথম ধাক্কা খাবে কট্টর ইসলামি গোষ্ঠীটি। জাতিসংঘসহ একাধিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে নারীদের অধিকার হরণের বিষয়ে নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মন্ত্রিসভায় না রাখায় আফগান নারীদের বিক্ষোভ

আফগানিস্তানে তালেবানের নতুন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছে, সেই মন্ত্রিসভায় কোনো নারী নেই। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন আফগান নারীরা। দেশটির রাজধানী কাবুল ও বাদাখশান প্রদেশে এই বিক্ষোভ হয়েছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, তারা এ সরকার মেনে নেবেন না। কারণ, এ সরকারের মন্ত্রিসভায় কোনো নারী প্রতিনিধি নেই। নারীরা বলছেন, যতক্ষণ তাদের অধিকারের কথা শোনা হবে না, ততক্ষণ আন্দোলন চলবে।

গত মঙ্গলবার এই নারীদের ওপর তাদের ওপর চরম অত্যাচার চালিয়েছে তালেবান। কাবুলের রাস্তায় তাদের প্রতিবাদ বন্ধ করতে গুলিও চালানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাড়িতে বসে থাকেননি নারীরা। গত বুধবার ফের তারা রাস্তায় নামেন। হাতে পোস্টার। যাতে লেখা, প্রাণ চলে গেলে চলে যাক, কিন্তু অধিকার আদায় করেই ছাড়ব। এদিনও নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর অত্যাচার চালায় তালেবান যোদ্ধারা।

বুধবারের আন্দোলন থামাতে প্রায় নয়-দশ গাড়ি তালেবান চলে আসে বলে জানিয়েছেন ওই নারীরা। তাদের বেত দিয়ে মারা হয়। ব্যাটারি লাগানো ব্যাটন দিয়ে মারা হয়। যে লাঠি দিয়ে মারলে ইলেকট্রিক শক লাগে। সঙ্গে অকথ্য গালাগাল করা হয় বলেও দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। এত কিছুর পরও আন্দোলনকারীরা পথ ছাড়েননি। আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। আগামী দিনেও তারা আন্দোলন জারি রাখবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

১৫ আগস্ট কাবুল দখল করার পর প্রথম সাংবাদিক বৈঠক করেছিল তালেবান। সেখানে তারা আগের চেয়ে নরম হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। নারী অধিকার রক্ষিত হবে বলেও জানানো হয়েছিল। আফগান নারীদের ঘরে বসে থাকতে হবে না, তারা শিক্ষার সুযোগ পাবে, কাজের সুযোগ পাবে, এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। যদিও বলা হয়েছিল, এর সবকিছুই হবে শরিয়তের নিয়ম মেনে। বাস্তবে এখনো পর্যন্ত নারী অধিকার নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তালেবান। মন্ত্রিসভায় নারী নেই। নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও তুলে দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের অকথ্য নির্যাতন

এদিকে স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পেটানো হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এতিলাতরোজরের খবরে বলা হয়েছে, এই বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়ায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে পেটানো হয়েছে এবং তাদের আটক করা হয়েছে। তবে সাংবাদিক পেটানোর ঘটনায় কোনো মন্তব্য করেনি তালেবান। তবে এর আগেই তারা সতর্ক করে বলেছিল, এমন বিক্ষোভ অবৈধ।

তালেবানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিক্ষোভ করতে হলে অনুমোদন নিতে হবে। এ ছাড়া বিক্ষোভে যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়, তা অপমানজনক। এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছিল তালেবান।

বিক্ষোভের ছাড়পত্রের জন্য ২৪ ঘণ্টা আগে আবেদনের নির্দেশ

আফগানিস্তানে কেউ বিক্ষোভ করতে চাইলে তার ছাত্রপত্র পেতে আবেদন করতে বলেছে তালেবান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার এনডিটিভি অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। বিক্ষোভের বিষয়ে তালেবানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে তারা বলেছে, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার সমস্যা এড়াতে কেউ বিক্ষোভ করতে চাইলে তার ছাড়পত্রের জন্য ২৪ ঘণ্টা আগে আবেদন করা উচিত। কাবুল দখলের পর তালেবান সরকার গঠনের আগেও একাধিক দিন দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হয়। এসব বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে তালেবান ছিল মারমুখী।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ মঙ্গলবার রাজপথে বিক্ষোভ করার বিষয়ে দেশটির জনসাধারণকে সতর্ক করে দেন। জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত সব সরকারি অফিস খুলছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রতিবাদ-সংক্রান্ত আইনের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কারও প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ করা উচিত নয়।

কাবুলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ

গত কয়েক দিনে তালেবানবিরোধী বিক্ষোভের কারণে কাবুলের অনেক জায়গায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে গোষ্ঠীটি। তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-সংক্রান্ত তথ্য প্রচার বন্ধ রাখতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা গেছে। তালেবান কাবুল দখলের পরই হেরাত শহরে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন আফগান নারীরা। সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী কাবুলেও। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলিও ছোড়ে সশস্ত্র তালেবান যোদ্ধারা। এমন অবস্থায় কাবুলের বেশ কিছু জায়গায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে তালেবান সরকার। আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেই কাবুলের একাধিক জায়গায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দেন তালেবান গোয়েন্দারা।

পুরনোদের ফেরাতে চান তালেবান প্রধানমন্ত্রী

তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন সাবেক সরকারের অনেক কর্মকর্তা। আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠনের পর তাদের আবার দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন সদ্য ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ। গত বুধবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সঙ্গে এক আলাপচারিতায় এমন আহ্বান জানান তিনি।

আল-জাজিরার সাক্ষাৎকারে মোল্লা হাসান আখুন্দ বলেন, তালেবান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দূতাবাস, কূটনীতিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থাকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করেছেন মোল্লা আখুন্দ। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় আসতে আফগানিস্তানকে প্রচুর অর্থ ও রক্ত ঝরাতে হয়েছে। আফগানদের রক্তপাত, হত্যাকাণ্ড ও অবমাননার দিন শেষ হয়েছে। বিনিময়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে আমাদের।’

এদিকে ২০ বছর ধরে চলা আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোকে যেসব আফগান সহায়তা করেছিলেন, তাদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা আগেই দিয়েছিল তালেবান। গতকালের আলাপচারিতায় সেই প্রতিশ্রুতির কথা আবার সামনে আনেন মোল্লাহ আখুন্দ। তিনি জানান, আগের কর্মকাণ্ডের জন্য কারও ক্ষতি করেনি তালেবান। কারও ওপর প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে, এমন প্রমাণ কেউ ভবিষ্যতে দিতে পারবে না।

মন্ত্রিসভা নিয়ে সমালোচনা

এদিকে আফগানিস্তানে নতুন সরকার ঘোষণার পর থেকে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন সরকারে স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের সমর্থন করেনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাতিসংঘ। অন্তর্বর্তীকালীন এ সরকার আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সবকিছুর মধ্যে তালেবানের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন ও উজবেকিস্তান।

প্রতিরোধ নেতারা দেশ ছেড়ে পালাননি

আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় পানশিরের নেতা আহমেদ মাসুদ ও সাবেক আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিরুল্লাহ সালেহ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। ক্ষমতাচ্যুত আফগান সরকারের এক রাষ্ট্রদূত এমনটাই জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। তালেবানের হাতে ক্ষমতাচ্যুত আশরাফ গনি সরকার কর্র্তৃক তাজিকিস্তানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত জহির আগবার গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, মাসুদ ও সালেহ আফগানিস্তানেই আছেন। তারা দেশ ছেড়ে পালাননি।

তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে এ সংবাদ সম্মেলন করেন জহির। তিনি বলেন, সালেহর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। সালেহসহ তালেবানবিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতারা নিরাপত্তার কারণে বর্তমানে স্বাভাবিক যোগাযোগের বাইরে আছেন।

জহির বলেন, আহমেদ মাসুদ ও আমিরুল্লাহ সালেহ পালিয়ে তাজিকিস্তানে আসেননি। আহমেদ মাসুদ পানশির ছেড়ে চলে গেছেন বলে যে খবর বেরিয়েছে, তা সত্য নয়। তিনি আফগানিস্তানের ভেতরে আছেন।