পুলিশের ডাকাতির বিচার হোক

দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং জনজীবনে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান করা পুলিশের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলাসহ নানা বিশেষ পরিস্থিতিতে  সহায়ক শক্তি হিসেবে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সর্বশেষ দেশব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীতেও জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে মহামারী মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। এই সময়ে দেশের মানুষ সত্যিকার অর্থেই পুলিশ বাহিনীকে মানুষের বন্ধু হিসেবেই পাশে পেয়েছে। কিন্তু সমাজে পুলিশের বিষয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি কতটা দূর হয়েছে কিংবা আস্থা কতটা বেড়েছে সে প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। এখনো নেহাত বিপদে না পড়লে সাধারণ মানুষ থানা-পুলিশের মুখাপেক্ষী হতে চায় না। এই মনোভাব যেমন দীর্ঘ সময়ের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়েছে, তেমনি ধারাবাহিক ইতিবাচকতা ছাড়া সেটা পাল্টাবেও না। কিন্তু সারা দেশে নানা পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায়ই নানারকম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ডাকাতি-ছিনতাইয়ের অভিযোগ। সংবাদ মাধ্যমে প্রায়ই এমন সংবাদ শিরোনাম দেখা যাচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নিঃসন্দেহে সামগ্রিকভাবে পুলিশ বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘মোটা অঙ্ক ছাড়া কাজ করেন না এসআই আকসাদুদ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের ডাকাতিসহ নানা অপরাধের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, সিআইডি থেকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার হওয়া এই এসআই চাকরিজীবনে নানা অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। অভিযুক্ত আকসাদুদ জামানের একজন সোর্সের সঙ্গে কথা বলার তিনটি অডিও বৃহস্পতিবার ফাঁস হয়। কীভাবে হুন্ডি ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের টাকা লুট করবেন সেই পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস হয় ওইসব ভয়েস রেকর্ডের মাধ্যমে। এ সংক্রান্ত তিনটি অডিও রেকর্ড দেশ রূপান্তরের কাছে এসেছে। একটি অডিওতে শোনা যায় তার এক সোর্সকে সিআইডির এই এসআই বলছেন, ‘আমি সাব-ইন্সপেক্টর আকসাদুদ। মোটা অঙ্কের অর্থ ছাড়া কাজ করি না। বড় বড় মালের কাজ ধরবেন। তাহলেই আমারে জানাবেন। বুঝেছেন কী বলছি। বাংলা টাকা না ধরে রিয়াল বা ডলার হলে সবচেয়ে ভালো। সাবধানে কাজ করতে হবে।’ অন্য অডিওগুলোতেও তার আলাপে এটা স্পষ্ট যে, তিনি কতটা বেপরোয়াভাবে ডাকাতি-ছিনতাইসহ এসব অপরাধ করতেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর আরও তথ্য উদঘাটন করা হয়েছে। চাকরিজীবনে তিনি একাধিক টাকা লুটের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার আকসাদুদ জামানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার সূত্র ধরে সিআইডির এই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর তার ডাকাতি ছাড়াও আরও অনেক অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে অভিযুক্ত সিআইডি কর্মকর্তার স্ত্রীর অভিযোগটি বিশেষভাবে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। আকসাদুদের স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামীসহ আসামিদের ছাড়িয়ে নিতে তারা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারকে প্রায় দেড় কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা নিয়েও ডিবি পুলিশ কাউকে ছাড়েনি। উল্টো বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে সিআইডির ওই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই অভিযোগ নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ডিবির এক কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিফোনে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকার লেনদেন করার ভয়েস রেকর্ডটি নিয়ে আলাদাভাবে তদন্ত করছে ডিএমপি। অডিওটি আসল না নকল তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

লক্ষ্য করা জরুরি, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ডাকাতি-ছিনতাই-অপহরণ ও লুটের অভিযোগ এই প্রথম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এ ধরনের বেশকিছু ঘটনা সামনে এসেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনায় পুলিশের দুই এএসআইর সম্পৃক্ততা পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগ। ওই দুই এএসআইর নেতৃত্বে ডাকাতি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়ের ঘটনায় ব্যবহার করা হতো সরকারি অস্ত্র, গাড়ি ও হ্যান্ডকাফ। আর গত আগস্টের শুরুতে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় ফেনী গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়াসহ ৬ পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে  তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) একটি বক্তব্য উৎসাহব্যঞ্জক। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যদের কেউ কোনো অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা করা হচ্ছে। ফৌজদারি অপরাধের বিচারে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি পুলিশ সদস্যদের এই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি। নইলে সামগ্রিকভাবে পুলিশের ভাবমূর্তিই সংকটে পড়বে।