আগের অবস্থানের পথে বাংলাদেশ

পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের কাছে হারানো অবস্থান ফেরতের লড়াইয়ে ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিয়েতনাম ১ হাজার ৬৮৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৮৮০ কোটি ডলার। এ হিসাবে প্রায় ১৯৪ কোটি ডলার এগিয়ে বাংলাদেশ। করোনা পরিস্থিতির অবনতি না হলে বছর শেষে এ ব্যবধান দ্বিগুণ হবে এবং নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে আবারও দ্বিতীয় অবস্থানে ফিরে আসতে সমর্থ হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বছরের মাঝামাঝি নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। তবে সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য-উপাত্তে আমরা নিঃসন্দেহে ভিয়েতনাম থেকে এগিয়ে রয়েছি। পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান ফিরে পাওয়া আমাদের কাছেও এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) যেভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে ভিয়েতনামের গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল খাতের সমন্বয় থাকে। আর আমাদের হিসাবে শুধু গার্মেন্টস থাকে। শুধু গার্মেন্টস হিসাব করে প্রতিবেদন দিলেও আমরা অনেক এগিয়ে থাকব বলে আশা করছি। আমাদের কাছে এখন যে পরিমাণ ক্রয়াদেশ আসছে, তাতে বছর শেষে ভিয়েতনামের সঙ্গে ব্যবধানটা দ্বিগুণ হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছরের শুরুতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা তার সদস্ গুলোর বিগত বছরের বাণিজ্য পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। করোনা মহামারীর কারণে এবার সাত মাস পিছিয়ে গত ৩১ জুলাই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের কাছে দ্বিতীয় অবস্থান হারায় বাংলাদেশ। পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, করোনা মহামারীর প্রভাবে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ দুই থেকে তিনে নেমে গিয়েছিল।

করোনার ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ এখন নিম্নমুখী এবং প্রত্যেক দিনই পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে বেশ আগেই ব্যবসায়িক কার্যক্রমসহ শিল্প-কলকারখানা সচল হয়েছে। তা ছাড়া মহামারী শুরুর পর থেকেই গার্মেন্টস চালু রাখতে খাত সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এসবেরই প্রভাব পড়েছে পোশাক রপ্তানিতে। ভিয়েতনাম থেকে মুখ ফেরানো ক্রেতারা বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ বাড়িয়েছেন। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত ভিয়েতনাম। এখনো প্রত্যেক দিন শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ শহরে লকডাউন, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের সব ধরনের শিল্প-কলকারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। বড় দিনের বিশাল বাজার ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাধ্য হয়ে বিকল্প দেশে ক্রয়াদেশ বাড়িয়ে দেয়।

এ সুযোগ লুফে নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং ভিয়েতনামের ট্রেড প্রমোশন কাউন্সিলের (ভিয়েট্রেড) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ হাজার ৮৮০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আর এ সময়ে ভিয়েতনাম রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৬৮৬ কোটি ডলারের পোশাক।

বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ভিয়েতনামকে অনেক ব্যবধানে পেছনে ফেলতে পারবে বাংলাদেশ। যদিও দ্বিতীয় অবস্থানে ওঠার ঘোষণার জন্য অন্তত চার মাস অপেক্ষা করতে হবে। আগামী বছরের শুরুতে ডব্লিউটিও সদস্য সব দেশের বাণিজ্য পর্যালোচনার প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর করোনার কারণেই ভিয়েতনাম পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে যায়। উৎসভূমি হিসেবে চীন করোনা মহামারীতে নাস্তানাবুদ হলেও নিরাপদ থাকে প্রতিবেশী ভিয়েতনাম। ভাইরাসটি দেশটিতে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভিয়েতনামে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে প্রায় ১৫ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত এবং ৩৩৫ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে। অন্যদিকে এই করোনা পরিস্থিতিই এ বছর বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ দশমিক ৬৫ হারে ২ হাজার ৩২৫ নতুন রোগী শনাক্ত এবং ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত আগস্টের মাঝামাঝি থেকেই সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

অবশ্য কয়েক বছর ধরেই পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান হারানোর শঙ্কা ছিল বাংলাদেশের সামনে। আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাবে চীনের পোশাক খাতের অনেক বিনিয়োগ ভিয়েতনামে চলে যায়। ফলে সহজেই বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে আসে এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস রিভিউ’তে দেখা যায়, গত বছর ১৪২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে প্রথম অবস্থানে ছিল চীন। বিশ্ববাজারে দেশটির অংশীদারিত্ব ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসা ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৯ বিলিয়ন ডলার; বিশ্ববাজারে অংশীদারিত্ব ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর বাংলাদেশ ২৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে; বিশ্ববাজারে রপ্তানির অংশীদারিত্ব ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৮।

২০১০ সালে তৈরি পোশাকের বিশ্ব রপ্তানি বাজারে ৪ দশমিক ২ শতাংশ অংশীদারিত্ব অর্জন করে তুরস্ককে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে আসে বাংলাদেশ। তখন তুরস্ক তৃতীয় ও ভারত ছিল চতুর্থ অবস্থানে। এরপর থেকে একই অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। কিন্তু গত বছর হোঁচট খায়।