স্বতন্ত্র সংগ্রামী আহমদ রফিক

আজ ১২ সেপ্টেম্বর ভাষাসংগ্রামী, বরেণ্য লেখক-গবেষক, প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ-সর্বজনশ্রদ্ধেয় আহমদ রফিকের তিরানব্বইতম জন্মদিন। আমাদের জ্ঞানী-পন্ডিতের সংখ্যা নিতান্ত স্বল্প না হলেও সমাজে জ্ঞানী, বিবেকবান, নীতিনিষ্ঠ পন্ডিতজনের বড়ই অভাব। যারা মেরুদন্ড সোজা রেখে আজীবন চলেছেন, তেমন মানুষের তো আকাল চলছে দেশে। হাতেগোনা যে দু’চারজন আছেন তাদেরই একজন আহমদ রফিক। যিনি মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অটল থাকতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন। সময়জ্ঞানের ব্যত্যয়ে যিনি কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না। রফিক ভাই ঘড়ির কাঁটা ধরে যেমন নিজে চলেন, অন্যকেও তেমনি সময়জ্ঞানে সচেতন হতে বাধ্য করেন। এক্ষেত্রে তিনি বড়ই কঠোর।

সময়টা দেশভাগের অন্তিম সময়ের। দেশভাগ এবং বাংলাভাগ প্রায় চূড়ান্ত। বাংলাভাগে উত্তাল পূর্ববাংলার সব অঞ্চল-জনপদ। গ্রামের যুবকরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে মিছিল, সভা-সমাবেশ করে মুসলমানের পৃথক রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে। সে্লাগানে-সে্লাগানে মুখর ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আনন্দ-উল্লাস ধ্বনি চারদিকে। তখন যুবক আহমদ রফিককে দেশভাগ-পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। জনস্রোতের সেই ভাবনার বিপরীত ভাবনাই তাকে আতঙ্কিত করেছিল। সেই ভাবনার কেন্দ্রে ছিল মর্মান্তিক বাংলাভাগের অশুভ পরিণতির উপলব্ধি। দেশভাগে উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ এবং উৎপাটনের শঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন। পরিণতি আঁচ করতে পেয়ে শঙ্কিত। তিনি দেশভাগের উন্মাদনার কালেই দেশভাগ মেনে নিতে পারেননি। পরিণত বয়সে তিনি নানা মাত্রার গবেষণার ফাঁকে লিখেছেন অসামান্য গ্রন্থ ‘দেশবিভাগ : ফিরে দেখা’। তার চিন্তার অগ্রসরতা নানাভাবে নানা ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছে। সনাতনী ধ্যান-ধারণার বিপরীতে জনমুক্তির ভাবনা একইভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের মৌলিক আকাক্সক্ষাটি হচ্ছে শ্রেণি উত্তরণ, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দীক্ষা। রফিক ভাই ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুবই মেধাবী। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংগত কারণে পরিবারের আকাক্সক্ষায় ও ইচ্ছায় তাকে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হতে হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আহমদ রফিক জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ যুক্ততার কারণে একুশে ফেব্রুয়ারির পর ভাষা-আন্দোলনের নেতা ‘ভাষা-মতিন’কে বন্দি করা হয় এবং মেডিকেল কলেজের ছাত্র আহমদ রফিকের ওপর হুলিয়া জারি হলে বাধ্য হয়ে তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়। প্রায় দুই বছর ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশি নজর এড়িয়ে তিনি আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন। সেই সময়ে চরম আর্থিক অনটনে খেয়ে-না খেয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার বিষয়টির সমাধান হয়নি। ওদিকে পরিবারের মেধাবী ছেলেটি আর ডাক্তার হতে পারল না এমন শঙ্কায় পরিবারের মধ্যেও তীব্র হতাশা নেমে আসে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে হুলিয়া প্রত্যাহারের পর আবার তিনি মেডিকেল কলেজের ছাত্রত্ব ফিরে পান এবং ইচ্ছাশক্তির কঠিন দৃঢ়তায় এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার একরোখা একাগ্রতাই এতে প্রমাণিত হয়েছে। যেটি তিনি জীবনভর বহন করে এসেছেন। ডাক্তার হয়েও ডাক্তারি পেশায় তিনি যুক্ত হননি। করেননি সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের চাকরি এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিসও। ওষুধ শিল্পের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। পরে ক’জন মিলে নিজেরাই ওষুধ শিল্পের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কিন্তু সেখানেও অংশীদারদের সঙ্গে নীতিগত বিরোধে শূন্য হাতে সেখান থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

সম্পূর্ণ ভিন্নতর পেশায় থেকেও তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি, গবেষণা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শিতা থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন থাকেননি। ‘নাগরিক’ নামের মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘকাল। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং নানামুখী গবেষণামূলক রচনা লিখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার গবেষণা গ্রন্থগুলো কেবল দেশে নয়, ভারতেও সমান জনপ্রিয়। ভারত থেকে সম্মাননাসহ ট্যাগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি দিয়েছে। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে রবীন্দ্রজীবনীর একটি খন্ড তিনি লিখেছেন। ক’বছর আগে সেটি প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলা একাডেমির ক্রমাগত অনুরোধে পরবর্তী খ- রচনার চেষ্টা করছেন। কিশোর বয়সেই তার চিন্তা-মনন ও দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল চেতনা গড়ে উঠেছিল। সমাজের ধনবৈষম্য, শ্রেণিবিভক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনাচার এসব দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন বটে, তবে হতাশাগ্রস্ত হননি। যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। পার্টির সদস্য পদও লাভ করেন। কিন্তু অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ওপর ক্রুশ্চেভের সংশোধনবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের মাত্রাতিরিক্ত খবরদারি-হস্তক্ষেপ তিনি মেনে নিতে পারেননি। আমাদের প্রেক্ষাপটকে এড়িয়ে আন্দোলনে-সংগ্রামে সোভিয়েত নির্দেশ পালনে কমিউনিস্ট পার্টির স্বাতন্ত্র্য ক্রমাগত ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কায় তিনি পার্টি ত্যাগে বাধ্য হন। রফিক ভাই পরে আর কোনো মার্কসবাদী দলভুক্ত না হয়েও আজীবন মার্কসবাদী চর্চার মধ্যেই জীবন কাটিয়ে এসেছেন। রফিক ভাই ডাক্তার বলে নয়, সুদূর কৈশোর থেকেই অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতায় জীবনযাপন করে এসেছেন। তার কর্মস্পৃহা কখনো থেমে থাকেনি। বিশ্বব্যাপী অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্যাপিত হয়েছে। আমাদের দেশেও সব বামপন্থি দলসমূহের সমন্বয়ে জাতীয়ভাবে উদ্যাপিত হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটিতে আহমদ রফিক এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যুগ্মভাবে আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রফিক ভাই রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নিজের উপার্জিত সব অর্থের বিনিময়ে গড়ে তুলেছিলেন অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান।

রফিক ভাই অত্যন্ত সহজ-সরল একজন মানুষ। সারাটি জীবন নির্লোভ-নির্মোহ জীবন কাটিয়ে এসেছেন। প্রায় দুই যুগ আগে স্ত্রী মারা গেছেন। নিঃসন্তান রফিক ভাইকে আগলে রেখেছেন দু’জন নারী-পুরুষ। তারাই তাকে দেখভাল করেন। স্ত্রীর জীবদ্দশা থেকেই তারা দু’জন তাদের পরিবারে যুক্ত হয়ে আছেন। ওই দু’জনকে নিয়েই রফিক ভাই নিউ ইস্কাটনের ভাড়া বাসায় একটি সমতার পরিবারে বসবাস করছেন। চলতি বছর ঘরের মেঝেতে পড়ে গিয়ে পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। অস্ত্রোপচার করে কৃত্রিম হাড় সংযোজন করে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর এখন অনেকটা সুস্থ আছেন তিনি। এতে ঋণ ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় নিঃশেষ হলেও কারও কাছে হাত পাতেননি। সংস্কৃতিমন্ত্রী বিষয়টি জেনে সহায়তা করবেন বললেও বাস্তবে কিছুই করেননি। রফিক ভাইয়ের ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস’ বইটি আমাকে উৎসর্গ করে চিরকৃতজ্ঞতার ঋণে আবদ্ধ করেছেন। আমাদের সবার অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রিয় রফিক ভাইকে তার তিরানব্বইতম জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অভিনন্দন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত