রাজধানীতে ৭০ ভাগের বেশি শিক্ষার্থী আসছে না ক্লাসে

শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর পর গত দুদিনে শতভাগ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা না গেলেও প্রাণ ফিরেছে স্কুল-কলেজগুলোতে। রাজধানীর স্কুল-কলেজগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সচেতনতা দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ অভিভাবক এক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। কর্র্তৃপক্ষের অনুরোধ উপেক্ষা করে তারা স্কুল-কলেজের গেটে ভিড় করছেন। অথচ এই অভিভাবকদের কেউ কেউ সন্তানদের করোনা সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি আবারও বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে গাফিলতি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, সকালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাতি শাখার ছুটির পর শিক্ষার্থীরা একে একে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু স্কুলের মূল ফটকের সামনেই অভিভাবকদের জটলা আর গাদাগাদি। অভিভাবকদের একটা অংশের এই গাদাগাদি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অন্য অভিভাবকরা। তারা বলছেন, স্কুলে পাঠাতে ও স্কুলের ভেতরে যে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে, স্কুলের বাইরে বেরুলেই তার উল্টোচিত্র দেখা যাচ্ছে।

দেড় বছর পর সারা দেশের স্কুল-কলেজ খুলেছে গত রবিবার। কিন্তু করোনা সংক্রমণ বিবেচনায় পুরো শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। আপাতত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে এক দিন দুটি করে ক্লাস রাখা হয়েছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রতি বেঞ্চে একজন করে শিক্ষার্থী বসানো হচ্ছে। স্কুল-কলেজে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দফায় দফায় নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এসবের মধ্যে রয়েছে, মাস্ক পরা ছাড়া কাউকে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়া, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ব্যানার টাঙানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অভিভাবকদের ভিড় না করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দেখা যায়, মোটামুটি সব ব্যবস্থাই প্রতিপালন করছে কর্র্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ ব্যাপারে সচেতনতা বেশ। দীর্ঘদিন পর ক্লাসে ফিরতে পেরে তারা উচ্ছ্বসিত। শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেলে ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কোনোভাবেই চান না তাদের অসচেতনতার জন্য আবার স্কুল বন্ধ হোক। 

গোড়ানের বাসিন্দা সেলিম খানের দুই সন্তান আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে। সন্তানদের বাসায় নিয়ে যেতে তিনি স্কুলের মূল ফটকের জটলা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেন, ‘স্কুল ছুটির পর শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে বের হচ্ছে। কিন্তু গেটের সামনে অভিভাবকরা গাদাগাদি করে আছেন। অভিভাবকরা যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানেন, তাহলে বিপদ হতে পারে। অভিভাবকদের এ বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া উচিত।’

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্র্তৃপক্ষ বলছে, স্কুল শুরুর প্রথম দিনে গড় উপস্থিতি ছিল ৭৫ শতাংশ। গতকাল শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল ৭৪ শতাংশ। স্কুলে ঢোকার সময় তাপমাত্রা মাপা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা এবং দূরত্ব রেখে আসনে বসানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। গতকাল তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও দশম শ্রেণির ক্লাস হয়েছে।

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘স্কুলে এসে কোনো বাচ্চার শরীরে তাপমাত্রা বেশি বা অসুস্থ হয়েছে এমনটি গত দুদিনে পাওয়া যায়নি। অসুস্থ থাকলে অভিভাবকরাই ফোন দিয়ে স্কুল কর্র্তৃপক্ষকে জানাচ্ছে। স্কুল শুরুর আগে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে। তবে স্কুল ছুটির পর মূল ফটকের সামনে অভিভাবকদের জটলা থাকছে। রশি টেনে শিক্ষার্থীদের বের করা হচ্ছে। বিএনসিসি সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও স্কুলের কর্মীরা এসব দায়িত্ব পালন করছেন।’

এদিকে গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দীপু মনি সরকারের নির্দেশনা না মানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছেন। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যদি কেউ তথ্য দেয় তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলব এবং দেখব কেন সেটি করছেন। সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দেশনা কার্যকর হবে। শুধু কভিড নয়, তার সঙ্গে এখন ডেঙ্গুর মৌসুম। সে কথা চিন্তা করে এ ব্যবস্থা করেছি। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি আহ্বান, সরকারি নির্দেশনা পালন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখবেন।’

এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর গতকাল নতুন করে নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করার জন্য একটি গাইডলাইন, নির্দেশিকা এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেম (এসওপি) জারি করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা অনুযায়ী সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে কভিড-১৯, ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানসহ মাঠপর্যায়ের মনিটরিং কাজে সম্পৃক্ত সব কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। মনিটরিং চেকলিস্টের তথ্য নির্ভুলভাবে গুগল ডকসের মাধ্যমে প্রতিদিন বিকেল ৫টার মধ্যে অধিদপ্তরে পাঠানোর কথাও বলা হয়।