পুলিশের ক্রাইম কনফারেন্স

কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতি হলে তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত

আসন্ন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে কোনো ধরনের দুর্নীতি, তদবির বা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে তদবির করলে যোগ্য প্রার্থীরাও অযোগ্য হয়ে যাবেন। এমনকি কনস্টেবল নিয়োগে কোনো পুলিশ সদস্য বা কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার তথ্য পেলে তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত করা ও ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া মাদকের বিস্তার রোধ এবং নারী ও মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।

গতকাল সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরের চতুর্থ তলায় হল অব ইন্টেগ্রিটিতে ক্রাইম কনফারেন্সের ছিল দ্বিতীয় দিন। বৈঠকটি গতকাল শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় বৃদ্ধি করে আজ শেষ হবে। আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অপরাধ পর্যালোচনা সভা শেষ হবে। বৈঠকে সব অতিরিক্ত আইজিপি, রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার, সব জেলার পুলিশ সুপার, বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নারী পাচার প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল ও থানায় মামলার জট কমানো, পুলিশ সদস্যদের বিভাগীয় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থ ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, নতুন নিয়মে স্বচ্ছতার সঙ্গে কনস্টেবল নিয়োগ, পুলিশের পদবিন্যাস ও পদ সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্রাইম কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনে পুলিশের দাপ্তরিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বেশি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের পুলিশের কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা, থানায় মামলার জট কমানো, থানাগুলোতে সেবার মান বৃদ্ধি, ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান জানান, গতকাল অপারেশনস উইংয়ের কার্যক্রম, বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট, ডেভেলপমেন্ট উইংয়ের কার্যক্রম, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মুলতবি বিভাগীয় মামলা, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, নতুন নিয়মে কনস্টেবল নিয়োগ, পুলিশের পদবিন্যাস ও পদ সৃষ্টি, গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্রাইম কনফারেন্সের প্রথম দিনে ডিআইজি এওয়াইএম বেলালুর রহমান বিভিন্ন জেলা ও রেঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, মানব পাচার মামলা, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে এসব অপরাধ বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অপরাধ বৃদ্ধির কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনার পাশাপাশি আগামীতে যাতে এসব অপরাধ বৃদ্ধি না পায় সেই বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। একইভাবে বেলালুর রহমান দেশের বিভিন্ন জেলা ও রেঞ্জে মাদক মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এ সময় মাদকের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসপিদের নির্দেশনা দিয়ে বলেন, মাদক মামলায় কারও সম্পৃক্ততা এলে কোনো ধরনের তদবির শোনা যাবে না। মাদকের সঙ্গে যারই সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়াও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সভায় উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানান, পাসপোর্টের ভেরিফিকেশনে পুলিশের বিশেষ শাখা কাজ করে। অনেক সময় নানা কারণে ভেরিফিকেশন দেরি হয়। পাসপোর্টের ভেরিফিকেশনে যাতে অযথা সময়ক্ষেপণ না হয় বিষয়টি মনিটরিং করার জন্য জেলার ডিএসবির প্রধানদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। ক্রাইম কনফারেন্সে পুলিশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছ্রসাধনের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় বলা হয়, করোনা সংক্রমণসহ নানা কারণে পুলিশের ট্রেনিংসহ বিভিন্ন বাজেট কমাতে হচ্ছে। ট্রেনিংসহ বিভিন্ন খাতে প্রাপ্ত সরকারি বরাদ্দ ব্যয়ে যথাসম্ভব কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, সভায় পুলিশের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজের বিষয়ে তুলে ধরা হয়। এ সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও সংস্কারে মানসম্মত কাজ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। স্থাপনা নির্মাণে উন্নত নির্মাণসামগ্রী এবং ভালো ব্যবহার, মানসম্মত ও রুচিশীল আসবাবপত্র কেনার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। জেলার এসপি ও নিজ নিজ ইউনিটের প্রধানদের বিষয়টি মনিটরিং করার কথা বলা হয়েছে।

সভায় বলা হয়, গত ১০ সেপ্টেম্বর কনস্টেবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। উন্নত পুলিশ বাহিনীর স্বার্থে ও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে উন্নত দেশের উন্নত পুলিশ এ ধারণাকে মাথায় রেখে প্রার্থী বাছাই করতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তদবির না শোনা, কোনো ধরনের অনিয়ম দুর্নীতির আশ্রয় না নিতে বলা হয়েছে। কনস্টেবল নিয়োগে নন-ক্যাডার কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাকে তৎক্ষণাৎ বরখাস্তসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্যাডার কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।