ময়নাতদন্ত নির্ভুল ও গতিশীল হোক

২০১৭ সালে ঢাকার কাওলা এলাকায় রেললাইন থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছিল  রেলওয়ে পুলিশ। গত চার বছরেও মেলেনি সেই লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। জানা যায়নি লাশের পরিচয়। দেশ রূপান্তরে বুধবার প্রকাশিত ‘ময়নাতদন্তে আটকা ৩২৫৪ মমলা’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এমন আরও কয়েকটি ঘটনা জানা গেল।

সারা দেশে অনেক লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে এসব ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, বাদী ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা বিপাকে পড়ছেন। প্রকাশিত খবরে আরও জানা যায়, চলতি বছরের সাত মাসে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটনের (ডিএমপির) ৫০ থানার ৩ হাজার ২৫৪টি মামলার কার্যক্রম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অভাবে আটকে রয়েছে। জানুয়ারিতে ৪৬৬, ফেব্রুয়ারিতে ৪৭১, মার্চে ৫০৪, এপ্রিলে ৫২৮, মে মাসে ৪৭৫, জুনে ৪১৩ ও জুলাইয়ে ৩৯৭ লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে। ফলে এই বিপুল সংখ্যক মামলার বাদী ও আসামি উভয়ের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে আছে।

পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল (পিআরবি) অ্যাক্ট অনুযায়ী, যেকোনো ঘটনার সম্পৃক্ত লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। অথচ মাসের পর মাস পার হলেও প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে রাজধানীর থানা অনুয়ায়ী ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড) লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এছাড়া ঢাকার আশপাশের জেলা থেকেও এসব মর্গে লাশ পাঠানো হয়। লোকবল সংকটের পাশাপাশি লাশের চাপ থাকায় প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়। অনেক সময় নির্ভুল ময়নাতদন্তও করা সম্ভব হয় না। আবার ময়নাতদন্ত  প্রতিবেদন প্রভাবিত করে কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে মামলা-মোকদ্দমার বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালীদের পক্ষে নেওয়ার অপচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। ঢামেকে বছরে গড়ে ৩ হাজার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। অথচ একই সময় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১ হাজার এবং মিটফোর্ডে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। লাশ বেশি হওয়ার কারণে এখন ঢামেক মর্গে জট দেখা দিয়েছে। সংকট উত্তরণে আরও কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্তের সুযোগের পাশাপাশি বর্তমান ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর অনেক সময় মামলার ভাগ্য নির্ধারণ হয়। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এ প্রতিবেদন বিচারকাজে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বাদী-বিবাদীর ন্যায়বিচারও অনেকাংশে নির্ধারিত হয়। তবে প্রতিবেদন না পেলে মামলার তদন্তই থেমে থাকে। হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে দেরি হলেও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে সময়মতো প্রতিবেদন না পেলে অভিযোগপত্র দিতে দেরি হয়। এতে মামলাজট দেখা দেয়। অপমৃত্যুর ঘটনার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পেলে তদন্তই আটকে যায়। ময়নাতদন্তে অপমৃত্যু যদি হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হয়, মামলার তদন্তের মোড়ই ঘুরে যায়। ২০১৫ সালের ১ জুন ফরিদপুরে এক বিচারক সম্মেলনে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, পুলিশের তদন্তের ত্রুটির কারণে মূল আসামিরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ৯৯ দশমিক ৯৯ ভাগই ত্রুটিপূর্ণ। মেডিকেলের অনেক জটিল শব্দ বিচারকরা বোঝেন না। লেখাও অস্পষ্ট থাকে এবং অসম্পূর্ণ বাক্য লেখা হয়। এর ফলে মামলা পরিচালনায় সমস্যা হয়। প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য থেকে ময়নাতদন্তের সংকট এবং এ সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলায় জট লেগে থাকার বিষয়ে ধারণা পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। 

এমন অবস্থায় বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা ও মামলা নিষ্পত্তি করতে আরও কিছু সরকারি হাসপাতালকে ময়নাতদন্তের সুযোগ করে দিতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। একই সঙ্গে বর্তমান হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে। এতে ময়নাতদন্ত জটের পাশাপাশি অনৈতিক কারবারও দূর হবে। মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। ময়নাতদন্ত করেন চিকিৎসকরা। লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত উভয় ক্ষেত্রে পুলিশ ও চিকিৎসকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১২ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, তদন্তে ব্যর্থতার মূলে রয়েছে নিহত ব্যক্তির সুরতহাল প্রতিবেদন ঠিকমতো না করা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বুঝতে না পারা, লাশ শনাক্ত না হওয়া এবং বিজ্ঞানসম্মত বস্তুগত সাক্ষ্য সংগ্রহে অনাগ্রহ। উপরন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন লেখা হয় ইংরেজিতে, তাও আবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়। আমরা আশা করব, চিকিৎসক ও পুলিশ উভয়ে এ বিষয়ে আরও বেশি যত্নবান হবে। ময়নাতদন্তে ঘাপলা থাকলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা বাড়বে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।