আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন নীতিমালা

৯ বছরে চিহ্নিত হবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি

ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মেয়াদি ঋণ, লিজ বা বিনিয়োগ নিম্নমানে খেলাপি হলে তা সর্বোচ্চ ৩ বার পুনঃতফসিল করে পরিশোধ করতে মোট ৯ বছর সময় পাবেন গ্রাহক। দীর্ঘ এই সময়ে ঋণটি পুরোপুরিভাবে পরিশোধ করতে না পারলে ওই গ্রাহককে স্বভাবজাত বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

এছাড়া সন্দেহজনক ও মন্দমানে খেলাপি থাকা মেয়াদি ঋণ তিন দফায় পুনঃতফসিল করে পরিশোধ করতে গ্রাহক সময় পাবেন সাড়ে ৬ বছর। এই সময়েও ঋণটি পরিশোধ না হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। 

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ থেকে এনবিএফআইগুলোর ঋণ পুনঃতফসিল বিষয়ক এই নীতিমালা জারি করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো নির্দেশনায় এবারই প্রথম স্বভাবজাত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার পদ্ধতি বলে দেওয়া হলো। এর আগে ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে থেকে স্বভাবজাত খেলাপি চিহ্নিত করার জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা পাস হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় স্বভাবজাত খেলাপি চিহ্নিত করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছিলেন, দেশে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি থাকার পরও দামি গাড়িতে চড়েন। বিজনেস ক্লাসে চড়ে বিমানে বিদেশ ভ্রমণ করেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের এক সেমিনারে বলা হয়, বিশ্বের অনেক দেশে স্বভাবজাত খেলাপিদের বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে দেওয়া হয় না। এমনকি সরকারি ওয়েবসাইটে এ ধরনের স্বভাবজাত খেলাপিদের নাম দেওয়া থাকে। এতে ওই সব খেলাপিদের সঙ্গে অনেকে সামাজিক সম্পর্কও গড়ে তুলতে চান না। এসব কারণে সে দেশে খেলাপিরা ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করে দিতে তৎপর থাকেন।

এনবিএফআইগুলোর জন্য নীতিমালা জারির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই না করেই বারবার পুনঃতফসিল করছে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পরিশোধসূচি পুনর্নির্ধারণ এবং যথাযথভাবে পুনঃতফসিল প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় এসব প্রতিষ্ঠানের আদায়ের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এখন থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেবলমাত্র বিরূপমানে শ্রেণিকৃত (নিম্নমান, সন্দেহজনক ও ক্ষতিজনক) ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবে। ঋণ নিয়মিত করার প্রতি পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত হারে ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন নগদ জমা নিতে হবে।

নীতিমালায় বলা হয়, কোনো মেয়াদি ঋণ নিম্নমানে থাকা অবস্থায় প্রথম দফায় ৪৮ মাস, দ্বিতীয় দফায় ৩৬ মাস ও তৃতীয় দফায় ২৪ মাসের জন্য পুনঃতফসিল করা যাবে। আর সন্দেহজনক ও মন্দমানে শ্রেণিকৃত অবস্থায় ঋণটি পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে প্রথম দফায় ৩৬ মাস, দ্বিতীয় দফায় ২৪ মাস ও তৃতীয় দফায় ১৮ মাস সময় দেওয়া যাবে।

স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রথম দফায় পুনঃতফসিল করে পরিশোধ করতে সময় পাওয়া যাবে এক বছর। দ্বিতীয় দফায় সময় পাওয়া যাবে ৬ মাস এবং তৃতীয় দফায় সময় পাওয়া যাবে আরও ৬ মাস।

এভাবে তৃতীয় দফায় পুনঃতফসিল করার পরও কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে স্বভাবজাত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে।

ডাউন পেমেন্টের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়, প্রথম দফায় ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে মেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি উভয় ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ন্যূনতম ১৫ শতাংশ বা মোট বকেয়ার ১০ শতাংশের মধ্যে যেটা কম, সেই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

দ্বিতীয় দফায় মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ৩০ শতাংশ বা মোট বকেয়ার ২০ শতাংশের মধ্যে যেটা কম, তা দিতে হবে। আর তৃতীয় দফায় মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ৫০ শতাংশ বা মোট বকেয়ার ৩০ শতাংশের মধ্যে যেটা কম, তা পরিশোধ করতে হবে।

এ পদ্ধতিতে নিয়মিত করা ঋণ মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। পুনঃতফসিল করা ঋণের ৬টি মাসিক কিস্তি বা ২টি ত্রৈমাসিক কিস্তির সমান অনাদায়ী থাকলে তা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকরণ করতে হবে।

এ নীতিমালা অনুযায়ী পুনঃতফসিল করা ঋণ নিয়মিত করা হলেও তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) আলাদাভাবে উল্লেখ করা থাকবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত ঋণ পুনঃতফসিল বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকতে হবে। সেখানে এমন সব শর্ত দিতে হবে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নীতিমালার চেয়ে কোনোভাবে সহজ হবে না।

পুনঃতফসিলের আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কমিটি লিখিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে যৌক্তিকতা ও প্রভাব তুলে ধরবে। সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য তার নগদ প্রবাহ বিবরণী, নিরীক্ষিত স্থিতিপত্র, আয়-ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করতে হবে। একজন গ্রাহকের ডাউন পেমেন্টর অর্থ জমা হওয়ার এক মাসের মধ্যে পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কিস্তি হিসেবে জমা হওয়া অর্থ কোনোভাবেই ডাউন পেমেন্ট বাবদ জমা দেখানো যাবে না।

এতে আরও বলা হয় পুনঃতফসিল করা ঋণের যে পরিমাণ অর্থ আদায় হবে তার বিপরীতে সুদ শুধুমাত্র আয় খাতে নেওয়া যাবে।