সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে তুলোধুনো

চিকিৎসক, চিকিৎসাসেবা ও বেসরকারি হাসপাতালের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে তুলোধুনো করেছেন জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। চিকিৎসকরা কেন রাজনীতি করবেন, সেই প্রশ্নও উঠে আসে তাদের বক্তব্যে। চিকিৎসার বিল দিতে না পারায় বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগীকে আটকে রাখে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, দেশের নাগরিক হিসেবে রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে।

গতকাল বুধবার সংসদে Medical Colleges (Governing Bodies) (Repeal) Bill 2021  বাছাই কমিটিতে পাঠানো বিলটির ওপর সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে এসব সমালোচনা হয়।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘বিএনপি করে গিয়েছিল ড্যাব, আওয়ামী লীগ এসে করেছে স্বাচিপ। সে ক্ষেত্রে আমরা কী কারণে বসে থাকছি? এই আইনের মধ্যে যদি উনি আনতেন যে ডাক্তাররা এবং বৈজ্ঞানিকরা রাজনীতি করতে পারবেন না, তাহলে খুব খুশি হতাম। কিন্তু সেটা আনা হয়নি। ডাক্তাররা যদি এই দেশে রাজনীতি করে তাহলে আমরা কী করব? আমাদের কাজটা কী? ওনারা চলে আসুক রাজনীতি করতে। যারা ভালো ছাত্র তারা ডাক্তারি পড়ে, কিন্তু তারা যদি রাজনীতি করে তাহলে আমরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছি।’

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, ‘দেশের ৫০ বছর অতিক্রম করেছি আমরা। তারপরও বর্তমানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশা। আমরা এখন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারিনি। যারা সরকারি হাসপাতালে কর্মরত, তারাই আজকে বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, এগুলো মানসম্মত? আজকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে যারা শিক্ষা অর্জন করছে, তারা কয়জন বিসিএসে টিকছে? ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে যে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, এ ব্যাপারে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন? যেসব ছাত্র, অভিভাবকরা অনিয়ম করে সেখানে ভর্তি হয়েছে; যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে জ্ঞান অর্জন করবে, সে ব্যাপারে সরকার বলেছিল এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। কিন্তু এখন সিআইডি রিপোর্ট দিচ্ছে, এখানে লাগাতার ৭ বছর অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে।’

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দেশ যায় কোন দিকে, মানুষের সমস্যা যায় কোন দিকে; মানুষ কোন বিষয় নিয়ে সাফার করছে আর আমরা আলোচনা করছি কী? অদ্ভুত লাগে। করোনাকালে অর্থনৈতিকভাবে কত পরিবার পঙ্গু হয়ে গেছে সেই খবর কি আমাদের কাছে আছে? করোনাকালে হাতে গোনা কিছু রিপোর্ট আসছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, করোনায় সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে নিরুপায় হয়ে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে প্রাণে হয়তো বেঁচে গেছেন, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছেন। জমানো টাকা শেষ হওয়া থেকে শুরু করে বিরাট ঋণের জালে আটকা পড়েছেন বহু মানুষ। করোনার আগে যেখানে মধ্যবিত্ত ছিল ৭০ শতাংশ, সেখানে মধ্যবিত্ত নেমে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। দরিদ্র মানুষ যেখানে ছিল ২০ শতাংশ, সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ। করোনাকাল বলে হয়তো এ ব্যাপারে মিডিয়ার কিছুটা মনোযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি মেডিকেলে গিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার ইতিহাস নতুন কিছু নয়।’

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘করোনাকালে যে কটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে মানুষকে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ আসছে তার মধ্যে সব থেকে শীর্ষে আছে বলতে কষ্ট লাগে সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্যের হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ। এ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সরকার ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতে তার কর্মীদের হাতে এমনভাবে তুলে দিচ্ছে যে চট্টগ্রামে সিআরবি নামে যে জায়গাটি আছে, যেটিকে চট্টগ্রামের অক্সিজেন বলা হয়; সেটাও নাকি এখন বেসরকারি হাসপাতাল করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। রেলওয়ের জায়গা বলতে তো কিছু নেই, সবই রাষ্ট্রীয় জায়গা। এই রাষ্ট্রীয় জায়গা বেসরকারি খাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।’

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন বলেন, ‘চিকিৎসকরা রাজনীতি করছেন। আমরা রাজনীতি করি, রাজনীতিবিদের জায়গায় থাকব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইনশৃঙ্খলার জায়গায় থাকবে। ডাক্তাররা ডাক্তারদের জায়গায় থাকবে। সেই জায়গাগুলো রিপেয়ার করা দরকার। বেসরকারি হাসপাতালগুলো যেভাবে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে টাকা রোজগারের একটি পথ খুলে নিয়েছে, সেখানে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।’

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক বলেন, ‘অ্যাডমিন ক্যাডারের লোক, জজ বা পুলিশ ক্যাডারের লোক তারা তো চাকরি করে; প্রাইভেট কোনো বিষয়ে কনসালট্যান্সি তারা করতে পারবেন না। ডাক্তাররা বিসিএস অফিসার হয়ে ডিউটির পর যদি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে, সে ক্ষেত্রে তার যে মূল কাজ সেটা ঠিক থাকে না। এটা দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা। মন্ত্রীকে বলব, যদি উপকার করতে চান তাহলে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসটা আপনারা দয়া করে বন্ধ করার চেষ্টা করেন। জনগণের পয়সা দিয়ে তাদের বেতন দেবেন, তারা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন; এটা আমরা করতে পারি না। ভর্তির জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কয়েক লাখ টাকা নেয় আন অফিশিয়ালি, অন্যায়ভাবে এত টাকা নিচ্ছে।’

জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি মেডিকেল ও হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছেন। বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেই। টেকনোলজিস্টের ব্যাপক সংকট। ২০২০ সালের পরীক্ষার ফলাফল এখনো দেওয়া হয়নি। অনেক মেশিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক এয়ারপোর্টে পিসিআর ল্যাব দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পরও প্রবাসীদের ঘেরাও করতে হয়েছে!’

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা দেশের প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ হবে। সেটা পর্যায়ক্রমে হবে। সেই অনুযায়ী ৩৮টি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আস্তে আস্তে সব জেলায় হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডাক্তারদের অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। স্বাচিপ, বিএমএ রয়েছে। রাজনীতি তো সবাই করতে পারেন। প্রকৌশলী, আইনজীবীরা রাজনীতি করতে পারেন। সেই অনুযায়ী চিকিৎসকরা তাদের অ্যাসোসিয়েশন করলে, তাতে কোনো দোষ বা অন্যায় দেখি না। তারা তো সেবা দিচ্ছেন।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনায় সেবা দিয়েছে। সেখানকার চিকিৎসা ফি নির্ধারণে আমরা বৈঠক করছি। আশা করি এটার সমাধান হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে। আর বিমানবন্দর জায়গা দেবে। আমরা শুধু কারিগরি সহযোগিতা দেব। শুনেছি, দুই-এক দিনের মধ্যে বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হবে।’

সব সমালোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে নেন বলে দাবি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি সমালোচনা পছন্দ করি। কারণ এটা আমাকে শক্তিশালী করে। এই সমালোচনা অবশ্যই সঠিক হতে হবে।’ 

সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দিতে উঠে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সদস্যদের ধন্যবাদ। ওনারা বেশ এনার্জি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন। চালিয়ে যান, আমিও চালিয়ে যাব আপনাদের সঙ্গে। কাজেই কোনো অসুবিধা হবে না। আপনারা দোষত্রুটি খুঁজে পাবেনই। সমুদ্রের মধ্যে দুই বালতি ময়লা ফেললে সমুদ্র নষ্ট হয়ে যাবে না, পানি নষ্ট হয়ে যাবে না।’

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যের উদ্দেশে জাহিদ মালেক বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে আমরা কী করেছি স্বাস্থ্য খাতে আর আপনারা কী করেছেন, এ বিষয়টি একটু তুলে ধরতে চাই জনগণের সামনে।’ বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি আপনারা কী বলতে পারেন। তাই আজকে প্রস্তুত হয়ে এসেছি। সারা দিন লাগবে। কমিউনিটি ক্লিনিক ১৪ হাজার ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে ৩০ রকমের ওষুধ ফ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। আপনারা এসে ওটাকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এটা হলো স্বাস্থ্যসেবায় আপনাদের ব্যবস্থা।’

স্বাস্থ্যসেবায় উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার কথা তুলে ধরে বিএনপির সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সময় দুর্নীতির কারণে মানুষ মারা গেছে, গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশে আমরা তো উন্নয়ন করে পুরস্কার পেয়েছি। আর আপনারা পুরস্কার পেয়েছেন ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে। আমরা আর কিছু বলতে চাই না। আপনাদের বিষয়ে বলতে গেলে আমার সময় শেষ হয়ে যাবে। আজকে সংসদ জমছে ভালো। আপনারা কথা বলবেন, আমরাও উত্তর দেব।’

পরে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বিএনপির সময় কী কোনো হাসপাতালে ৩৮ লাখ টাকা দিয়ে পর্দা কেনা হয়েছিল? গত ১০ বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো ব্যবস্থা আছে?’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ১৩ বছর আপনারা ক্ষমতায় আছেন। দেশের গণতন্ত্রের সূচক কোথায় আছে? প্রতিদিন গণমাধ্যমে এমন কোনো বিভাগ নেই যেখানে দুর্নীতির খবর প্রকাশ হচ্ছে না। এগুলো পড়েন। গত ১২ বছরে ১০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে এই বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক দোষারোপ না করে আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। গণতন্ত্রের যে সংকট চলছে, গণতন্ত্রের যে সংকট দাঁড়িয়ে গেছে; এই সংকট থেকে আমরা কীভাবে বেরিয়ে আসব, মানুষের ভোটাধিকার আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব, এসব নিয়ে আমরা আলোচনা করি।’

পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির হারুন সাহেব বলেছেন ৩৮ লাখ টাকা দিয়ে পর্দা কেনা হয়েছে। কিন্তু এটা কোথায় হয়েছে, আমার জানা নেই। এটা কেনা হয়নি। ভুল তথ্য দিলে জনগণ ভুল বুঝে, এটা সঠিক না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০ হাজার ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে যন্ত্রপাতি রয়েছে। এটা ব্যবহার হলে একটা সময় পরে তা নষ্ট হয়ে যায়। একটা সময় এটা ঠিক করতে হয়। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। তা আমরা করে যাচ্ছি।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনারা টিকার কথা বলেছেন তিন হাজার টাকা। আপনাকে তো আগে জানতে হবে, তারপর বলতে হবে। অর্ধেক নয়, আপনাকে পুরো বিষয় নিয়েই বলতে হবে। যখন টিকা দেওয়া হয়, তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে দেওয়া হয়। এটার সঙ্গে জনবল, সংরক্ষণাগার জড়িত রয়েছে। এখানে শুধু টিকার দাম ৩ হাজার টাকা না।’