কক্সবাজারের পেকুয়ায় এক বিধবা নারীর নামে বরাদ্দের সরকারি ঘর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বড় ভাইয়ের বসতভিটায় নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ তদন্তে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে নিজের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে।
আর শুধু ওই একটি ঘর নিয়েই নয়ছয় নয়, চেয়ারম্যান শহীদুলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের শেষ নেই। বিধবা, হতদরিদ্র ও ভূমিহীনদের বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ী, নিজের ব্যক্তিগত সহকারী ও প্রবাসীসহ সচ্ছল ব্যক্তিদের নামে বরাদ্দ দিয়েছেন সরকারি ঘর। এছাড়া নিজের অনুসারীদের সুবিধার্থে প্রভাব খাটিয়ে অন্যের জমি দখল করে ইউনিয়ন পরিষদের নামে সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এসবের প্রতিকার চেয়ে কক্সাবাজারের জেলা প্রশাসকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এলাকাবাসীর পক্ষে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ঘর আত্মসাতের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলামের বাবা নুরীরপাড়া গ্রামের প্রয়াত মফিজুল ইসলাম চৌধুরীর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন স্থানীয় প্রয়াত গোলাম সোবহান নামে এক দরিদ্র ব্যক্তি। সেই সূত্রে মফিজুল ইসলাম চৌধুরী তার জীবদ্দশায় গোলাম সোবহানের পরিবারকে উজানটিয়া মৌজার ২১৯নং খতিয়ানের ৩৪৫৭ দাগে ৮ শতাংশ জমি লিখিতভাবে দান করেন। গোলাম সোবহান মারা যাওয়ার পর ওই জমিতে তার বিধবা স্ত্রী বুতিজা বেগম বসবাস করতেন। ২০১৯ সালে চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় ৩৪৫৭ দাগের ওপর বিধবা বুতিজা বেগমের নামে গৃহহীনদের জন্য বরাদ্দের একটি সরকারি ঘর দেওয়া হয়। কিন্তু চেয়ারম্যান শহীদুল নিজের মালিকানাধীন একই খতিয়ানের ৩৪১৮নং দাগে ওই ঘরটি নির্মাণ করেন। ঘরটির মালিকানা থেকে বুতিজা বেগমকে অধিকার বঞ্চিত করে বর্তমানে চেয়ারম্যানের বড় ভাই সেলিম উদ্দিন ওই ঘরে বসবাস করছেন। ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শোকে ধুঁকে গত বছর বুতিজা বেগমের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।
একই বছর উজানটিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের গোদারপাড়া এলাকার জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী মাহফুজা বেগমকে সরকারি ঘর দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছ থেকে চেয়ারম্যান শহীদুল জোর করে ৫০ হাজার টাকা নেন বলে জানিয়েছেন মাহফুজা বেগম নিজেই। এছাড়া ৪নং ওয়ার্ডের মৃত রমজান আলীর ছেলে চিংড়ি ও লবণ ব্যবসায়ী বকুল আহমদ, লেদু মিয়ার ছেলে আমান উল্লাহ, বাহাদুর আলমের ছেলে হাবিবুর রহমান, ৭নং ওয়ার্ডে সিরাজুল ইসলামের ছেলে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী ও অন্তত ১৫ কানি জমির মালিক জাহাঙ্গীর আলম এবং ৮নং ওয়ার্ডের রূপালী বাজারের বাসিন্দা আলী আহমদের ছেলে প্রবাসী আমীর উদ্দীনের থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যান শহীদুলের বিরুদ্ধে।
পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুতিজা বেগমের ঘর আত্মসাতের ঘটনায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কক্সবাজার জেলার উপপরিচালক শ্রাবস্তী রায়, পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি গত ৭ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পরিদর্শন করে। এ ব্যাপারে জানতে উপপরিচালক শ্রাবস্তী রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এদিকে ইউপি নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচনের আগে না দেওয়ার জন্য অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে চেয়ারম্যান শহীদুল কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন বলে মন্তব্য করেছেন তার বড় ভাই মিছবাহ উদ্দীন চৌধুরী মিজু মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার (চেয়ারম্যান) অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে গু-া বাহিনীর হাতে কয়েক দফা হামলার শিকার হয়েছি। সর্বশেষ সব সম্পত্তি দখলে নিয়ে আমাকে পরিবারসহ এলাকাছাড়া করেছে। মৃত্যুর ভয়ে এখন নিজ এলাকায় ফিরতে পারি না।’
উজানটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফাজ্জল করিমসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে চেয়ারম্যানের অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তার চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে। তিনি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে গোটা ইউনিয়নকে অনিয়ম আর দুর্নীতির আস্তানায় পরিণত করেছেন।’
জানা গেছে, বেড়িবাঁধসংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে চিংড়ি ঘের নির্মাণ, স্বজনপ্রীতি ও নিজ অনুসারীদের সুবিধার্থে ইউনিয়ন পরিষদের নাম ব্যবহার করে অন্যের জমির ওপর অবৈধভাবে সড়ক নির্মাণ করার অভিযোগে চেয়ারম্যান শহীদুলের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে এলাকাবাসী।
তবে তার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ইউপি নির্বাচনের আগে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। বুতিজা বেগমের স্বামীকে আমার পিতা জমি দেওয়ার পর ৩৪১৮ দাগ থেকে আরও দুই শতক জমি দান করি। পরে সেই জমির ওপরই সরকারি ঘর করে দিয়েছি। বুতিজা বেগমের ছেলেরা আমার বড় ভাই সেলিমকে ওই ঘরটি ভাড়া দিয়েছেন। কারও কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছি এমন কোনো প্রমাণ নেই এবং ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের ঘর দেওয়ার বিষয়টি মিথ্যা।’
এছাড়া দলীয় আদর্শগত বিরোধের কারণে ভাই মিছবাহ উদ্দীন তার বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করছেন বলেও দাবি করেন চেয়ারম্যান শহীদুল।