মাদকাসক্তি আধুনিক কালের এক কঠিন সামাজিক সংকট। চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাদকাসক্তি এমন একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত যা একই সঙ্গে মানসিক ও দৈহিক অসুখ। মনোচিকিৎসকরা বলেন, একটা মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হলে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মাদকাসক্তের চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়, পরিবার থেকে সমাজের নানা পর্যায়ে বিদ্যমান যেসব সংকট থেকে ব্যক্তি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে সেসব দূর করার বিষয়েও সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক নানা ভয়ংকর মাদকের বিস্তার ও মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যের যে চিত্র সামনে আসছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্যই। এই পরিস্থিতিতে, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল যেমন সুদূর পরাহত বলে মনে হয়, তেমনি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের অপ্রতুলতায় একটা বড় প্রশ্ন হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
আশার কথা হলো, সরকার এখন দেশের বিপুল সংখ্যক মাদকাসক্তের চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি সেবা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি দেশে বেসরকারি পর্যায়ে আরও বেশি মাদকাসক্তি পরামর্শ, নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে। শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘গুরুত্ব পাচ্ছে নারী নিরাপত্তা সহজ হচ্ছে লাইসেন্সের শর্ত’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশে বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বেসরকারি পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম বাধা লাইসেন্সপ্রাপ্তি ও নবায়নের কঠোর শর্ত শিথিল করাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াবলির খবর প্রকাশ করা হয়। নতুন বিধিমালায় যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসিক ও অনাবাসিক উভয় এলাকাতেই মাদকাসক্তি পরামর্শ, নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ, প্রতি ১০ শয্যার পরিবর্তে প্রতি ৩০ শয্যার জন্য একজন চিকিৎসক, মনোচিকিৎসক, কাউন্সেলর ও দুজন নার্স রাখার বিধান রাখা হচ্ছে। একইসঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও তিন মাস পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করার শর্তে একই কেন্দ্রে নারী ও পুরুষের চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান বিধিমালাটি ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে প্রণীত। এখন নতুন বিধিমালা প্রণয়নের খসড়া চূড়ান্ত করে গত সপ্তাহে তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে গিয়েছে। নতুন এই বিধিমালায় নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক আবাসন ব্যবস্থা, খাওয়ার ব্যবস্থা ও ক্লাসরুম রাখা এবং একই ফ্লোরে নারী ও পুরুষ মাদকাসক্ত রোগী না রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের জন্য সার্বক্ষণিক নারী কর্মচারী, নারী চিকিৎসক ও নারী কাউন্সেলর রাখারও বিধান করা হয়েছে। এছাড়া মাদকাসক্ত নারীদের নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির আগে প্রেগন্যান্সি টেস্টের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিধিমালায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এই নারী মাদকাসক্তদের নিরাপত্তা বিধানে গুরুত্ব দেওয়া অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু বর্তমানে সব শর্ত পূরণের পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম পরিবর্তন করে নতুন বিধিমালায় সেটা বাড়িয়ে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে লাইসেন্স দেওয়ার যুক্তিটি বোধগম্য নয়।
দেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কত তা নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। একসময় অধিদপ্তরের ধারণা ছিল, দেশে ৭০ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের এক জরিপ প্রতিবেদনে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৬৬ লাখ উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, একই বছর প্রথমবারের মতো সমীক্ষা চালিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানায়, মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। ফলে এই বিষয়ে একটি যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, দেশে সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়েও মোট মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা মাদকাসক্তের সংখ্যার তুলনায় অতি নগণ্য। অধিদপ্তরের হিসাব অনুসারে, দেশে বর্তমানে মাত্র ৪টি সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ১৯৯টি শয্যায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর সারা দেশে বেসরকারি ৩৬৬টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৭১১টি শয্যা রয়েছে।
খেয়াল করা দরকার দেশের মোট ১৯টি জেলায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো নিরাময় কেন্দ্রই নেই। সরকার এখন বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের শর্তে কর মওকুফ এবং লাইসেন্সের শর্ত শিথিল করাসহ নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে সরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ এবং বৃহত্তর ২১টি জেলায় ১০০ ও বাকি জেলাগুলোতে ৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের যে পরিকল্পনা রয়েছে সেসব দ্রুত বাস্তবায়নে জোর দেওয়া উচিত সরকারের।