রাজধানীসহ সারা দেশে মশার উৎপাত আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বাসা-বাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবখানেই মশা আর মশা। মশার এ উৎপাত ও মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেওয়াকেই দায়ী করছে সচেতন মহল। এমনই এক পরিস্থিতিতে সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সব মন্ত্রণালয়ের সচিব ও দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সব পৌর মেয়রকে এ বিষয়ে অবহিত করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মশক নিধনের জন্য বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’ তৈরি করে তা সংশ্লিষ্টদের কাছে বিতরণ করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক ও ঢাকার দুই সিটির মেয়রসহ ১২টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ৫টি দপ্তরপ্রধানকে সদস্য করে ২৪ জনকে উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে রাখা হয়েছে। এ কমিটি গঠনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে আরও কমপক্ষে ৫টি উপকমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শাফিয়া আক্তার শিমু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মশা-সম্পর্কিত বিষয়ে আমরা একটি সংস্থার কাছ থেকে প্রতিবেদন পেয়েছি। যেখানে মূলত নির্মাণাধীন ভবন ও বাসা-বাড়ির ফুলের টবে মশার উৎপত্তিস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সব মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। সেখানে সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এর অধীনে থাকা সব সংস্থাকে ইতিমধ্যে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে।’
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সব মন্ত্রণালয়ে সচিব ও সংস্থার প্রধানদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘চলমান কভিড মহামারীর মধ্যে গত মে মাস থেকে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সব সরকারি/বেসরকারি দপ্তর বা সংস্থার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের জাতীয় গাইডলাইনে বলা হয়, মশকের বংশ বিস্তার রোধ ও প্রজননস্থল ধ্বংস করার জন্য কীটনাশক আমদানির লাইসেন্স সহজ করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে বলা হয়েছে। মশক নিধনে প্রয়োজনীয় জনবল ও জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার ও বিটিআরসির মাধ্যমে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা ও অডিও বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা মশক নিধনে পৃথক পৃথক দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
মশক নিধনে জাতীয় কমিটি : ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক ও ঢাকার দুই সিটির মেয়রসহ ১২টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ৫টি দপ্তরপ্রধানকে সদস্য করে ২৪ জনকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে রাখা হয়েছে। কমিটিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. হেলালুদ্দীনকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
জানা যায়, করোনা মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়েও ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছে রোগীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮৭ জন। এর মধ্যে ঢাকায় আক্রান্ত ৪৫ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে ১ হাজার ১৯৭ জন। এর মধ্যে ঢাকার ৪১টি হাসপাতালে মোট ৯৯০ জন রোগী ভর্তি আছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৪৬০ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৫৯ জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিরদের মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি।
একাধিক নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মশক নিধনে সিটি করপোরেশনর ভূমিকা আগের মতো এবারও প্রশ্নবিদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিনিয়তই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে সিটি করপোরেশন থেকে সময়মতো মশক নিধনের কীটনাশক ছিটানোর ক্ষেত্রে অবহেলার কথাও বলা হয়েছে। এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে মশার ওষুধ নিয়ে সিটি করপোরেশনের লোকজনকে যেতে দেখা যায় না। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে রাজধানীর তিনটি স্থানে মানববন্ধনসহ বিক্ষোভও করেছে সংক্ষুব্ধ লোকজন। ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি বিদেশে যাওয়ার পর থেকে নগর ভবনে যেন চলছে ছুটির আমেজ। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ছুটি কাটিয়েছেন। আবার কেউ ছুটিতে যাচ্ছেন। এ তালিকায় রয়েছে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ, সচিব মো. আকরামুজ্জামান, প্রধান প্রকৌশলী রেজাউর রহমান, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বোরহান উদ্দিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশিকুর রহমান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্টাফ অফিসার (সিনিয়র সহকারী সচিব) মোবাশে^র হোসেন, আইন কর্মকর্তা খায়রুল হক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসেরসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা ছুটি কাটিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে খোদ নগর ভবনেই সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।