প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভাতা খাচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতা

গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে লড়েও হেরে যান তিনি। যৌথভাবে করেন ঠিকাদারি। আছে মাছ চাষের প্রকল্প। এত কিছু থাকার পরও প্রতিবন্ধী না হয়েও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা তুলে নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছেন। এ কাজটি যিনি করেছেন তিনি হলেন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইদুল ইসলাম সরকার বাবু (৩০)। শুধু ভাতা নিয়েই জালিয়াতি নয়, এই ছাত্রলীগ নেতা প্রতিবন্ধী কার্ড করে প্রতিবন্ধী কোটায় সরকারি চাকরির চেষ্টাও করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ছাত্রলীগ নেতা মাইদুল ইসলাম সরকারের নামে ইস্যু করা প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের নম্বর ৭৯৬। সোনালী ব্যাংক আদিতমারী শাখায় তার সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ৫২০১৯০১০১৯৬০৯। এই হিসাব নম্বর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের ৭৯৬ নম্বর বইয়ের বিপরীতে মাইদুল ইসলাম সরকার ইতিমধ্যে দুই দফায় মোট ১১ হাজার ২৫০ টাকা উত্তোলন করেছেন।

আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় ও আদিতমারী সোনালী ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০২০ সালের ৬ অক্টোবর ছাত্রলীগ নেতা মাইদুল ইসলাম সরকারের ওই ব্যাংক হিসাবে ৯ হাজার টাকা অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে জমা হয়। এই টাকা মাইদুল ওই বছর ২০ অক্টোবর উত্তোলন করেন। এরপর দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের ১৫ মার্চ একই খাত থেকে ভাতা হিসেবে আরও ২ হাজার ২৫০ টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসেবে জমা হয়। সেই টাকা তিনি গত ২৩ মার্চ উত্তোলন করেন।

মাইদুল ইসলাম সরকার বাবু আদিতমারীর ভাদাই ইউনিয়নের বসিনটারী গ্রামের নজরুল ইসলাম সরকারের ছেলে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মাইদুল মেজ। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মাইদুল রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ২০১৬ সালে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ২০১৯ সালে বিয়ের পর তার সংসারে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। মাইদুল ইসলাম ২০১৮ সালে আদিতমারী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। সেই থেকে তিনি ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিবন্ধী না হয়েও আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় এই ছাত্রলীগ নেতাকে প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেয়। এরপর থেকে মাইদুল প্রতিবন্ধী কোটায় সরকারি চাকরির চেষ্টাও করছেন বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসী বলছে, উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইদুল ইসলাম সরকার বাবু প্রতিবন্ধী নন, অসচ্ছলও নন। তিনি দিব্যি দামি মোটরবাইক নিয়ে চলাফেরা করেন। সবসময় পরেন দামি পোশাক। তিনি কীভাবে সুস্থ মানুষ হয়ে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে ভাতা নিয়ে থাকেন?

প্রতিবন্ধী না হয়েও প্রতিবন্ধী ভাতা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আদিতমারী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইদুল ইসলাম সরকার বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেটি হয়েছে তা ভুলবশত হয়েছে। আর উত্তোলিত টাকাও সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

এ প্রসঙ্গে আদিতমারী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি কামাল হোসেন সরকার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সম্পূর্ণ দায়ভার তার (মাইদুল)। যেহেতু এখন জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে সে কারণে বিষয়টি নিয়ে ফাদার সংগঠনের (আওয়ামী লীগ) নেতাদের সঙ্গে কথা বলব।’

ভাদাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান রোকন বলেন, ‘ছাত্রলীগ সম্পাদক মাইদুল ইসলাম সরকারের প্রতিবন্ধী হিসেবে ভাতা গ্রহণের বিষয়টি আমার জানা  নেই। প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এ কাজটি উপজেলা কমিটি করে থাকে।’

প্রতিবন্ধী না হলেও ছাত্রলীগ নেতাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রওশন আলী মণ্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন মাইদুল ইসলাম সরকারের ভাতার কার্ডটি হয়ে থাকে সেই সময় (কার্ড হওয়ার ১৯ দিন আগে) আমি এই উপজেলায় যোগদান করি। সব প্রসেস শেষ করে আমার সামনে ফাইল এসেছিল, আমি তাতে শুধু স্বাক্ষর করি। এছাড়া মাইদুল ইসলাম অনলাইনে নিবন্ধন করেননি।’