ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গর্বভরে যে কজন বিশ্বখ্যাত শিক্ষকের নাম উচ্চারণ করতে পারে তাদের একজন অধ্যাপক আহমদ হাসান দানী। ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ পুরো এক যুগ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং একই সঙ্গে তিনি ঢাকা জাদুঘরের (এখন জাতীয় জাদুঘর) কিউরেটর ছিলেন। উপমহাদেশে প্রত্নবিদ্যার একজন জনক হিসেবে তিনি বিবেচিত।
২০ জুন ১৯২০ তার জন্ম ভারতের ছত্তিশগড়ে কাশ্মীরের একটি মুসলিম বণিক পরিবারে। বেনারস হিন্দু বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েট আহমদ হাসান দানীর শুরুটাই সর্বোচ্চ নম্বর ও স্বর্ণপদক ও টিচিং ফেলোশিপপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে দেয়নি। তিনি বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার রবার্ট এরিখ মর্টিমার হুইলারের (১৮৯০-১৯৭৬) অধীনে পাকিস্তানের তক্ষশিলা ও মহেঞ্জোদারো প্রত্নখনন কাজে যোগ দেন এবং তার মূল্য পাঠ্য বিষয় সংস্কৃত থেকে সরে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৪৭-এর ভারত বিভাজনের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন গ্রহণ করেন এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে বরেন্দ্র মিউজিয়াম পুনর্গঠন করেন। ১৯৫০ থেকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং ঢাকা জাদুঘরের কিউরেটরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সম্পাদক এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল কমিটি ফর মিউজিয়ামের প্রেসিডেন্ট পদেও অধিষ্ঠিত থাকেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এক যুগ কাটিয়ে তিনি পেশোয়ার ও ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবেও নিয়মিত পাঠদান করতেন। পাকিস্তান ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি ছিলেন দীর্ঘকাল, পরে পাকিস্তান সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা। অবাঙালি হয়েও তিনি বাংলা ভাষায় ঈর্ষণীয় দক্ষতা অর্জন করেছেন। তিনি বাংলা, ফরাসি, ফারসি, হিন্দি, কাশ্মীরি, মারাঠি, পশতু, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সিন্ধি, তামিল, সেরাইকি, তুর্কি এবং উর্দুতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন এবং পঁয়ত্রিশটি ভাষা ও উপভাষায় তিনি কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন বহু ভাষাবিদের একজন ডক্টর আহমদ হাসান দানী, অন্যজন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
দানীর মূল খ্যাতি সিন্ধু সভ্যতার গবেষণাকর্মে। ঢাকায় থাকতেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময় ক্যানবেরাতে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। তার বহুসংখ্যক প্রকাশনার একটি ‘ঢাকা : এ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত। ঐতিহাসিক ও প্রত্নবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে তিনি ডাকা শহরকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার রচনা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও কয়েকটি স্থাপনা সম্পর্কে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করা হচ্ছে। আহমদ হাসান দানীর বইটি বাংলায় ‘কালের সাক্ষী ঢাকা’ নামে ভাষান্তর করেছেন আবু জাফর। এই রচনার বন্ধনীযুক্ত সরাসরি উদ্ধৃতিসমূহ ‘কালের সাক্ষী ঢাকা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
দানী মনে করেন লর্ড কার্জনের ভারতের ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক জীবন পুনর্গঠিত হয়। তার সংস্কার কার্যক্রম অনমনীয় হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বাংলা ভাগ বাঙালি বুদ্ধিজীবীকেন্দ্রিক ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী মানসের ওপর আঘাত করে। বাংলা ভাগ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ‘‘যাদের প্রায় সবাই হিন্দু, কায়েমি স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তারা চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য পেশায় সমগ্র প্রেসিডেন্সিতে একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করছিল। তারা মনে করে পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করে তাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে দ্বিখন্ডিত করা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তারা যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিল তা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।’’
অন্যদিকে দানী মনে করেন পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা প্রথমবারের মতো অনুভব করে ইংরেজ শাসকরা তাদের ভুল বুঝতে পেরে এত বছরের অবহেলার ক্ষতিটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইংরেজদের যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন বাংলা ভাগে ঢাকা এবং সার্বিকভাবে মুসলমানরা লাভবান হবে। “লর্ড কার্জন ঢাকার মুসলমান ভদ্রলোক ও রাজনীতিক নবাব স্যার সলিমুল্লাহর অতিথি হিসেবে তার রাজকীয় বাসস্থান ‘আহসান মঞ্জিল’-এ অবস্থান করেন। তিনি ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্জন এলাকায় কার্জন হলের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, এই জঙ্গলের মধ্যেই অতি শিগগির ঢাকার নতুন শহর গড়ে উঠবে। বর্তমানে ওই স্থানেই রমনা এলাকা গড়ে উঠেছে।” হিন্দুরা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলা ভাগ প্রত্যাখ্যান করে বিষয়টিকে তারা তাদের ‘রাজনৈতিক আশা-আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে গ্রহণ করে এবং বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বিভিন্নভাবে সংগঠিত হতে থাকে। ১৬ অক্টোবর ১৯০৬ থেকে ঢাকা আবার রাজধানী শহর হয়ে ওঠে। যোসেফ ব্যাম্পফিল্ড ফুলার হলেন প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর; যখন ল্যান্সলট হেয়ার গভর্নর হিসেবে যোগ দিলেন এর মধ্যে ঢাকা শহর নতুনভাবে উদ্ভাসিত হতে শুরু করল, বিস্ময়কর এ পরিবর্তন ‘সময়ের বিবর্তনে ধূসর ইটের বিপরীতে লাল ইট দিয়ে একটি আধুনিক শহর গড়ে উঠতে শুরু করল... অবিশ্বাস্য কম সময়ের মধ্যে অস্থায়ী গভর্নমেন্ট হাউজ গড়ে উঠেছে প্রাচীন এই শহরে নবজীবনের যে প্রত্যুষের সূচনা হয়েছে এই গভর্নমেন্ট হাউজ হলো তার কেন্দ্র ও প্রতীক’ (ব্র্যাডলি বার্টের ‘রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল’ থেকে)।
নতুন রাজধানীর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ সম্রাট পঞ্চম জর্জ বাংলা ভাগ বাতিল করে দিলেন আর ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। ১ এপ্রিল ১৯১২ থেকে ঢাকা মর্যাদা হারিয়ে আবার জেলা শহরে পরিণত হলো। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতেই ইংরেজ সরকার ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এর পেছনে রয়েছে পূর্ববাংলার মুসলমান নেতাদের অনেক শ্রম ও উদ্যোগ। দানী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন রিপোর্টের এ. এফ. এম. আবদুল আলীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, ‘‘সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পকেট সংস্করণ ঢাকায় দিয়ে পূর্ববাংলার মুসলমানদের পুরস্কৃত করা হবে, যেন তারা বিনীতভাবে বাংলা ভাগ রদ মেনে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতা যতদূর সম্ভব বাড়াতে হবে। পুরোপুরি একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় সঠিক পদক্ষেপ; তবে এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববাংলার মুসলমানদের প্রায় কোনো উপকারে আসবে না। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় সুবিদিত গরিব সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোকের জন্য একটা বিলাসিতা মাত্র। আমার মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আবাসিক এবং একই সঙ্গে এফিলিয়েটেড বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে। পূর্ববাংলার এমনকি আসামের সব কলেজকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশন পাওয়ার অনুমতি দিতে হবে।’’ দানী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনে প্রদত্ত শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে উদ্ধৃত করেন : ‘‘প্রথমেই আমি বলতে চাই যে, ঢাকায় বা বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্য কোনো স্থানে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণার আমি প্রবল বিরোধী। কারণ একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ একটি পৃথক নিয়ন্ত্রণ এজেন্সির প্রতিষ্ঠা। একটি পৃথক নিয়ন্ত্রণ এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করা হলে রাজনৈতিক দিক থেকে তার ফল হবে খুবই ভয়াবহএর অর্থ হলো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অনুভূতিতে বাধা দেওয়া। এই অনুভূতি জনগণের কল্যাণের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে তা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। বাংলা ভাগ ইস্যুতে আমি যে বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলাম, এ বিষয়েও আমি সেই অবস্থান নিয়েছি।’’
আহমদ হাসান দানী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ঢাকার বিশিষ্ট হিন্দুদের বিরোধিতার চিত্রটিও তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘‘এ বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পর হিন্দুরাই বেশি লাভবান হয়। মুসলমানদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দুরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিয়োগ লাভ করে।’’ এমনকি মুুসলমান ছাত্রের চেয়ে হিন্দু ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি১৯৪৭ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে। তখনকার হিন্দু-মুসলমান সৌভ্রাতৃত্বের যে চিত্রটি তুলে ধরা হয়, দানী তা সঠিক বলে মনে করেন না। তিনি মনে করেন ১৯২৬ সালে জন্মাষ্টমীর উৎসবে তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেএই দাঙ্গা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও প্রবেশ করে। ১৯৪২-এর দাঙ্গায় মুসলমান তরুণ নজিরের মৃত্যু বিশ্ববিদ্যালয়কে উত্তপ্ত করে রাখে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মুসলিম হল এবং ফজলুল হক হলে অস্থায়ী সামরিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৪২ সালে চিকিৎসাধীন সৈনিকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম অংশে, এখনকার ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। দানী উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা-পরবর্তী ঢাকার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ভাষা আন্দোলন। তখন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের প্রাথমিক সাফল্য বাংলার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাপ্রাপ্তি। আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় ভাষা ইস্যুটি শুরু মাত্র তা পাকিস্তানের দুই অংশের সমতার বিষয়টিকেও আলোচনায় টেনে আনে ‘এর ভবিষ্যৎ এখনো অজ্ঞাত’ পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় আহমদ হাসান দানী যখন তার ঢাকাবিষয়ক বইটি রচনা করেন এই উক্তিটিতেই পাকিস্তানের অখ-তা নিয়ে তিনি যে সন্দিহান ছিলেন তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। সে সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্দোলনকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ তিনি পেয়েছেন।
যদিও দানীর ‘ঢাকা : এ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ গ্রন্থটি ঢাকা শহরের পরিবর্তন ও বিকাশ নিয়ে, তিনি স্পষ্টত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ইতিহাসের অনিবার্য একটি দাবি হিসেবে বিবেচনা করেছেন, তখনকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে বিবেচনা করেছেন। আহমদ হাসান দানী তার গ্রন্থে কার্জন হল, ফজলুল হক মুসলিম হল, ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের প্রতিষ্ঠা কাহিনী ও বিবরণ তুলে ধরেছেন। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা অসাধারণ শৈলীর লাল ইটের ক্রম প্রলম্বিত ও চারদিকে বারান্দাশোভিত দ্বিতল ভবনটিকে টাউন হল হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। এর সঙ্গে তুলনীয় ভবন তখন ভারতবর্ষে দুর্লভ ছিল। ১৯১১-এর বঙ্গভঙ্গ রহিতকরণ আদেশে পূর্ববঙ্গের স্বপ্নভঙ্গের কারণ ঘটে। সে সময় কার্জন হলের বিভিন্ন কক্ষে ঢাকা কলেজ স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটিই হয়ে ওঠে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন, প্রধান হলটি পরীক্ষার হল এবং সমাবর্তন হল হিসেবে চিহ্নিত ও ব্যবহৃত হয়। বঙ্গভঙ্গের সময় নির্মিত কার্জন হলের নিকটস্থ কলেজ রোডের হলটি ছিল আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ছাত্র হোস্টেল। ১৯২১ সালে ভবনটি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের জন্য হস্তান্তর করা হয়। ১৯৪০-৪১ সালে ব্রিটিশ ফৌজের জন্য এটি অধিযাচন করা হয়। ১৯৪২ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে এলে নতুন নামকরণ করা হয় ফজলুল হক মুসলিম হল। এটি উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপত্যশৈলীর ভবন নয়।
ঢাকা হল এবং পরবর্তীকালের মুসলিম হল একই সময়ে নির্মিত, মাঝখানে একটি বড় পুকুর। শুরুতে এটা ছিল ঢাকা কলেজের ছাত্র হোস্টেল। ১৯২১-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটাকে হিন্দু ছাত্রদের হলে রূপান্তর করা হয়। ১৯৪৭-উত্তরকালে যখন হিন্দু ছাত্রসংখ্যা কমতে থাকে, একাংশ মুসলমান ছাত্রদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯২৯-এর ২২ আগস্ট বাংলার গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিত্তি স্থাপন করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই মুসলিম হল ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের পশ্চিমাংশে। দানী নবনির্মিত ভবনটির সৌন্দর্য ও স্থাপত্যশৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন।
পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকারের সচিবালয়কে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ করা হয়। এই ভবনের পশ্চিমাংশে মুসলিম হল এবং জগন্নাথ হলের ছাত্রদের আবাসিক স্থানের বন্দোবস্ত করা হয়। ফজলুল হক হলের ছাত্রদেরও সেখানে জায়গা দেওয়া হয়। ১৯৪২-এ মহাযুদ্ধের সৈনিকদের হাসপাতাল ও আবাসনের জন্য ভবনটি অধিযাচন করা হয়। ১৯৪৭-এর পরপর পুরো ভবন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থায়ীভাবে অধিকার করে নেয়। তিনি এই ভবনটিকে স্থাপত্য বিচারে বৈচিত্র্যহীন বলে উল্লেখ করেন।
লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট
momen98765@gmail.com