কক্সবাজারে বনভূমিতে প্রশিক্ষণ একাডেমি নয় : সংসদীয় কমিটি

কক্সবাজারে বনভূমির জমিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমির বরাদ্দ বাতিলের দাবি জোরালো হচ্ছে। ওই বিপুল বনভূমি কীভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলোÑ তা খতিয়ে দেখতে এবং ওই জায়গায় যেন প্রকল্পটি না হয় সেই ব্যবস্থা করতে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটি এ বরাদ্দের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে।

গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রশিক্ষণ একাডেমির এ বরাদ্দের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত তা বাতিলের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরাও এ বরাদ্দের তীব্র বিরোধিতা করে গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।

গতকাল সংসদীয় কমিটির সভায়ও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, তানভীর শাকিল জয়, খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন ও মো. শাহীন চাকলাদার।

এদিকে বন অধিদপ্তর থেকেও বলা হয়েছে, বনভূমির মধ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেখানে আমরা বেদখলে থাকা বনভূমি উদ্ধার করছি আর সেখানে সরকারের আরেকটি সংস্থা জমি নিয়ে নেবে। এটা কীভাবে হয়। এটা কোনোভাবেই ঠিক নয়।’ সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পুরো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। কীভাবে এটি বরাদ্দ পেল। শুধু যদি জমির দাগ ও খতিয়ান দেওয়া হয় এবং ভূমির আকার ও প্রকৃতি বর্ণনা না করে, সেটা হতে পারে কি না। আমরা মনে করি, সেটাই হয়েছে। এটা আমরা দেখব। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে অনুমতি এসেছে, সেই দপ্তরও হয়তো এ বিষয়টি পুরোপুরি জানে না।’

কমিটির সভাপতি আরও বলেন, ‘এ জমির বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। সংরক্ষিত বন হিসাবে এ জমির মালিক জেলা প্রশাসন। আর এ জমি কোনো অবস্থাতেই বন্দোবস্তযোগ্য নয় বলে রিমার্ক থাকে। অর্থাৎ এ জমি কোনো অবস্থাতেই বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে না। দেওয়ার কোনো সুযোগও নেই।’ সাবের হোসেন বলেন, ‘জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে আমরা সমর্থন করি। তবে ওই জায়গায় এটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আমাদের বিধিনিয়ম এমনকি এটা সংবিধান পরিপন্থী। এটা অন্য জায়গায় হোক।’

ওই প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সেই চূড়ান্ত অনুমতি দিতে না করেছি। পাশাপাশি সঠিক তথ্য তুলে ধরতে বলেছি। আমরা চাই, বিষয়টি যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়।’ তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠাবে।

বনভূমির ওই জমি বরাদ্দ দেওয়া ‘বিধিসম্মত’ হয়নি উল্লেখ করে সাবের হোসেন বলেন, ‘যেহেতু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এখন তারা প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র চেয়েছে। আমরা এটা না দিতে বলেছি। পরিবেশমন্ত্রীও আমাদের সঙ্গে একমত।’

বনবিভাগ থেকে আগেই আপত্তি দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বন বিভাগ থেকে আগেই বলেছিল, এটা দেওয়া যাবে না। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে একটা ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা জানত না জমির ধরন কী। তাদের কাছে হয়তো দাগ ও খতিয়ান নম্বর দেওয়া হয়েছে।’

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আরেকটি প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ করতে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের জন্য ওই জমি এক টাকা প্রতীকী মূল্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ঝিলংজা বনভূমির ওই এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন। এর আগে ২০১৮ সালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ‘বঙ্গবন্ধু একাডেমি অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ নির্মাণের জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে অনাপত্তিপত্র চায়। সংস্থাটি ওই বছরই বিভিন্ন শর্তে অনাপত্তিপত্র দেয়।

ওই এলাকাকে ১৯৩৫ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৮০ সালে এটাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। ২০০১ সালে দেশের বনভূমির যে তালিকা করা হয়, তাতেও ঝিলংজা মৌজা বনভূমি হিসেবে উল্লেখ আছে।

সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই জমিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকায় বনায়ন প্রকল্পের আওতায় সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে ১০০ একর সৃজিত বাগান রয়েছে। ২০-২০০ ফুট পর্যন্ত বিভিন্ন উচ্চতার পাহাড় রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গর্জন, চাপালিশ, তেলসুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। ওই এলাকা হাতি, বানর, বন্য শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখির আবাসস্থল। মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই এলাকায় প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ জমি বরাদ্দ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এ বনভূমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা নিষেধ।

বৈঠকের পর সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজারে ওই বনাঞ্চলের জায়গায় জনপ্রশাসন একাডেমি নির্মাণের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে পর্যালোচনা করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া কমিটি ২০২১-২২ অর্থবছরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করে।

এদিকে গত শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (ওঅঅ) এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন ও সভাপতি শেখ মুহাম্মদ বেলাল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

তারা বলেন, ঝিলংজায় হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত পরিবেশগত সংকটাপন্ন ৭০০ একর গেজেটভুক্ত রক্ষিত বনভূমি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ একাডেমির ভবন নির্মাণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাবর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতামত উপেক্ষা করে প্রশিক্ষণ একাডেমির জন্য অকৃষি ও খাসজমি দেখিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এই বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া ও নেওয়া উভয় কর্মকাণ্ডই দেশের বিদ্যমান জাতীয় বন নীতি ১৯৯৪, বন আইন ১৯২৭, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১৬ সহ পরিবেশগত বিভিন্ন বিধিমালার পরিপন্থী এবং এ ধরনের কাজে বনভূমি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।