আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেও বহাল প্রধান শিক্ষক!

বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও চাকরি দেওয়ার নামে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন কুড়িগ্রামের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি। মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে এমন প্রমাণ পাওয়ায় ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। যদিও নতুন জনবল কাঠামোর ক্ষমতাবলে মাউশি নিজেই ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ক্ষমতা নিজেদের হাতছাড়া করতে না চাওয়ায় মাউশি সেটি পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম উৎপল কান্তি সরকার। তিনি কুড়িগ্রামের উলিপুরের দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার দুর্নীতির সহযোগী বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম।

মন্ত্রণালয়ে পাঠানো মাউশির চিঠিতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকার ও তার সহযোগী সরকারি বরাদ্দসহ বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের নামে দুর্নীতি এবং বিদ্যালয়ের মাঠে গরু-ছাগলের হাট বসানো, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অনিয়ম করেছেন। আর এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম। এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০১৯ সালে মাউশির রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক বরাবর চিঠি দেয় দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি। এরপর বিষয়টি তদন্ত করে কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কার্যালয় ও উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়। এছাড়া জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এ দুই কমিটিই প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকার ও খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায়।

মাউশির চিঠিতে বলা হয়, টিআর ও কাবিখা প্রকল্প থেকে উলিপুরের দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাট বাবদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। কিন্তু কিছু কাজ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকার ও খোরশেদ আলম। পরে সেই পুকুর ভরাট করা হয় শরিফা বেগম সরদার নামে একজনকে বিদ্যালয়ের বাণিজ্যিক ঘর বরাদ্দ দেওয়ার নামে জামানতের টাকায়। এছাড়া জয়নাল আবেদীন নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে বিদ্যালয়ের বাণিজ্যিক ঘর বরাদ্দ দেওয়ার নামে ৪৮ হাজার টাকা জামানত নেওয়া হয়, কিন্তু টাকা গ্রহণ বাবদ তাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। ওই টাকাও উৎপল কান্তি সরকার আত্মসাৎ করেছেন।

একইভাবে বিদ্যালয়ের বাণিজ্যিক কক্ষ বরাদ্দ দেওয়ার নামে বাবু মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, আলতাফ হোসেনের কাছ থেকে ১ লাখ ৩ হাজার, হযরত আলীর কাছ থেকে দেড় লাখ এবং নয়ন মিয়া, মহসীন আলী ও যুধিষ্টির বর্মণ নামে অন্য তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাদের কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তদন্তে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সুইপার প্রতাপ চন্দ্রের চেকবই আটকে রেখে মাসে মাসে বেতন তুলে নেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও অবৈধভাবে টাকা আদায় করেন। এছাড়া শূন্যপদ না থাকলেও সাইফুল ইসলাম, সাহিত্য রঞ্জন ও উৎপল কুমার নামে তিন ব্যক্তিসহ পাঁচজনকে ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে কর্মচারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

গত ৮ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো মাউশির চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের নামে সব নতুন-পুরাতন ঘরের জামানত, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য বাবদ প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা তছরুপ হয়েছে। কারণ আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি বলে নিরীক্ষণ কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। বিদ্যালয়ের জায়গায় স্থাপিত জনতা ব্যাংকের দুর্গাপুর শাখা, প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকারের যোগদানের আগে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সেখানে ব্যয় দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এরপরও নিয়মবহির্ভূত ব্যয় দেখিয়েছেন তিনি। জনতা ব্যাংকের দুর্গাপুর শাখায় বিদ্যালয়ের যে ব্যাংক হিসাব রয়েছে সেখানে নিয়ম মেনে লেনদেন হয় না।

মাউশি বলছে, সব মিলিয়ে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকার ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম। এসব অনিয়মের বিষয়ে তদন্তকালে কর্মকর্তারা প্রধান শিক্ষকের কাছে একাধিকবার আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে লিখিত ও মৌখিক অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেননি। উল্টো তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। একইভাবে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরিদর্শন করতে গেলে তাকেও অসহযোগিতা করেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি আদেশ অমান্যকারী ও সরকারি কর্মকর্তাকে বঞ্চনাকারী এবং দুর্নীতির অভিযোগ থাকা প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে মাউশি মহাপরিচালক বরাবর প্রতিবেদন পাঠায় জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ২০০৪ সালের ৫নং আইন (দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪) অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনো তদন্ত শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাউশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঠানো চিঠিতে দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উৎপল কান্তি সরকার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টিআর কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমার নয়। আমার কাজ শুধু বাস্তবায়ন কমিটি করে দেওয়া, বাকি কাজ দেখার কথা ইউএনও স্যারের। ফলে টাকা আমি খাব কীভাবে?’

অন্য অভিযোগগুলোর (টিআর-কাবিখায় দুর্নীতি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী মহল এভাবে সব অভিযোগ তুলছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আগের জনবল কাঠামো অনুযায়ী কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেলে তার বেতনভাতা বন্ধ বা শাস্তির আওতায় আনার ক্ষমতা ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ অনুযায়ী এ ক্ষমতা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকেও দেওয়া হয়েছে। জনবল কাঠামোর ১৮(চ) ধারায় বলা হয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম/বেতনভাতাদির সরকারি অংশ উত্তোলনের অনিয়ম/অনুচ্ছেদ ১৮.১ এ বর্ণিত অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মচারী, প্রতিষ্ঠান প্রধানের সরকারি অংশের বেতন ভাতাদি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর/শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারবে। অথচ একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে শিক্ষক উৎপল কান্তি সরকারের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মেলার দীর্ঘদিন পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে মাউশির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন জনবল কাঠামোতে মাউশিকে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ক্ষমতা নিজেদের হাতছাড়া করতে নারাজ। এজন্য মাউশি চাইলেও ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যবস্থা নিতে দেড়-দুই বছর সময় লাগায়। এতে দুর্নীতিবাজ শিক্ষকরা নিজেদের রক্ষায় অনেক সময় পায়।’