বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির জন্য তৈরি করা পোশাক বন্দরে যাওয়ার পথে কৌশলে সরিয়ে ফেলছে একাধিক চক্র। তারা দীর্ঘদিন ধরেই এ কাজ করছে। এসব দেশীয় চক্রের সঙ্গে বিদেশিদেরও হাত রয়েছে। আবার সরিয়ে ফেলা পণ্যগুলো নির্দিষ্ট দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে চক্রের সদস্যরা। চোরাই মালামাল লুকিয়ে রাখার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে গড়ে তুলেছে অন্তত ৭টি গোডাউন। সেখান থেকেই পরে এসব মালামাল বান্ডিল করে পাঠানো হচ্ছে বিদেশে। এমনভাবে বান্ডিল করা হচ্ছে এতে বোঝার উপায় নেই এগুলো চোরাই পণ্য। সম্প্রতি তৈরি পোশাক লুটের দুটি ঘটনায় গ্রেপ্তার ৯ জনের কাছ থেকে উদঘাটিত হয়েছে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর চক্রের সক্রিয় সদস্য ইমরান ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে চুরি চক্রের আদ্যপান্ত বর্র্ণনা করেছেন বলে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, চোরাই মালামাল বিক্রির টাকা কয়েক ধাপে ভাগ হয়। তবে মাল যে পরিমাণই হোক প্রতিটি কাজের চালক ১৫ ও হেলপারের জন্য ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা থাকে। মালামাল লুটের পর লেবারদের খরচ মিটিয়ে তা গোডাউনজাত করা হয়। এরপর স্যাম্পল নিয়ে বিভিন্ন বায়িং হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ করে অপেক্ষাকৃত কম দামে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ দুটি ঘটনায় সাঈদকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দেশি চক্রের সঙ্গে ইউরোপসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশের কিছু চক্র জড়িত। ওই চক্রের নামও আমরা পেয়েছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন চট্টগ্রামের বন্দরে আছেন। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তা ছাড়া বেশ কয়েকটি বায়িং হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চক্রের সদস্যদের সহায়তা করে বলে তথ্য পেয়েছি।’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহাদাত হোসেন সুমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গার্মেন্টসের এসব চোরাই পণ্য কেনাবেচার শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে কাভার্ড ভ্যানের চালক-হেলপার, বিভিন্ন বায়িং হাউজ ও বিদেশি বায়াররাও জড়িত। এসব মালামাল চুরির পর ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি গোডাউনে লুকিয়ে রাখা হয়। এরপর তা হাতবদল হয়ে আবারও বিদেশে চলে যায়। এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম ঠিকানা-প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে নানা তথ্য। তাদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার জয়ন্তী নিট ওয়্যার লিমিটেডের পক্ষে বুলবুল আহম্মেদ নামে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, ১১ সেপ্টেম্বর রাতে শিল্পাঞ্চল এলাকার বেলায়েত ট্রান্সপোর্টের চালক এমরান ও তার সহযোগী মহিউদ্দিন, মোবারক, রিপন সাইদসহ আরও অনেকে মিলে সিপমেন্টের জন্য ২৮ হাজার ৮২০টি বান্ডিল তৈরি পোশাক চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পথে ১১ হাজার পিস মাল চুরি করে ফেলে। এতে বায়াররা তাদের কাছে ২৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে চক্রের অন্যতম সদস্য এমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এমরান আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেখানে তিনি মহিউদ্দিনের নির্দেশে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকার একটি গোডাউনে মালামাল নামিয়েছেন বলে দাবি করেন। ওই ঘটনার পর মহিউদ্দিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেখানো মতে, উদ্ধার করা হয় চোরাইকৃত পোশাক। এ ঘটনায় পুলিশ তাদের কাছ থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক গোডাউনের সন্ধান পায়; বিশেষ করে বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনের পাশে এ ধরনের ৭টি গোডাউন গড়ে উঠেছে। শুধু কুমিল্লা এলাকায়ই পাওয়া গেছে তিনটি গোডাউন। গাজীপুরে রয়েছে একটি ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তিনটি গোডাউন রয়েছে। এসব গোডাউনে কাভার্ড ভ্যান ঢোকানোর পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই মালামাল সরিয়ে ফেলা হয়। আগে থেকেই সেখানে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা উপস্থিত থাকে। ১২ সেপ্টেম্বরে ঘটনার পর ১৫ সেপ্টেম্বর আবারও নেটওয়ার্ক ক্লদিং লিমিটেড নামক গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ১৫২ পিস তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়ার পথে ৫ হাজার পিস পোশাক চুরির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ১৭ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় আরও একটি মামলা হয়। এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় আরেকটি চক্রের সদস্য রাজ্জাক, ইউসুফ, মাইনুল, আল-আমিন, দুলাল হোসেন ও খায়রুলকে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪ হাজার ৭০৫ পিস তৈরি পোশাকসহ দুটি কাভার্ড ভ্যান জব্দ করা হয়। এ দুই ঘটনায় মূল হোতা হিসেবে সাঈদ ওরফে সিলেটি সাঈদের নাম চলে আসে। এরপর সাঈদকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাঈদের নামে অন্তত ২৪ মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ মামলা রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর থানায়। এ ছাড়া ডিবিতেও রয়েছে তিনটি মামলা। গার্মেন্টসের পণ্য চুরি করেই সাঈদ বাড়ি-গাড়িসহ অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। এমনকি স্ত্রী-সন্তানদের লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলে পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক তদন্তে সাঈদসহ এই চক্রের বেশ কয়েকজনের নাম জেনেছি, তদন্তের স্বার্থে সেগুলো বলছি না। দেশের ছোট ছোট কিছু বায়িং হাউজে যাচ্ছে সেসব চোরাই গার্মেন্টস পণ্য। আর ওই ছোট বায়িং হাউজগুলো বিদেশি ‘ছোট ক্রেতা’দের কাছে বিক্রি করে দেয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন মার্কেটেও যাচ্ছে সেসব চোরাই গার্মেন্টস পণ্য।
গোয়েন্দা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার গার্মেন্টস থেকে কাভার্ড ভ্যানে মালামাল চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়ার পথে চুরির ঘটনা ঘটে বেশি। সম্প্রতি দুুটি প্রতিষ্ঠান থেকে আনুমানিক ৫০ হাজার পিস বিভিন্ন ধরনের পণ্য শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। বিদেশে পৌঁছানোর পর ক্রয়াদেশ দেওয়া মালের পরিমাণের সঙ্গে দেখা যায় বিস্তার ফারাক। এরপর ওই দুই বায়ারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতিকে নির্দেশনা অনুযায়ী কম পণ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি ক্রয়াদেশ বাতিল করা হয়। এরপর অভিযুক্ত ওই দুই গার্মেন্টস মালিককে ডেকে পাঠানো হয়। তারা বিজিএমইএকে চুক্তি অনুযায়ী সঠিক মাল সরবরাহের তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরেন। ইন ভয়েজ ও চালানের কপিতে উঠে আসে সঠিক পণ্য দেওয়ার তথ্য। পরিবহনে যুক্ত কাভার্ড ভানের লোকজনও মাল বুঝে নিয়েছে বলে চালানের কপিতে সই করার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি বন্দর কর্তৃপক্ষও মালামাল বুঝে পেয়েছে বলে তথ্যে উঠে আসে। বিষয়টি নিয়ে গোলকধাঁধায় পড়েন বিজিএমইএর কর্তাব্যক্তিরা। এমন পরিস্থিতিতে তারা গোয়েন্দা পুলিশের শরণাপন্ন হন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিম। এরপর তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকটি সিএনজি গ্যাস স্টেশনসংলগ্ন অনেক গোডাউন রয়েছে। ওইসব গোডাউনে আগে থেকেই কার্টন ও পলিথিনের প্যাকেট রেডি করে রাখা হয়। আগে থেকেই জানিয়ে রাখা হয় প্রশিক্ষিত লেবারদের। তারপরই মালামাল পাঠিয়ে দেওয়া হয় গন্তব্যস্থানে।