সিনোফার্ম ছাড়া অন্য টিকায় টান

চীনের সিনোফার্ম ছাড়া বাকি তিন ধরনের করোনার টিকায় টান পড়তে শুরু করেছে। কমতে শুরু করেছে মজুদ। বিশেষ করে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় টান পড়েছে সবচেয়ে বেশি। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এই মুহূর্তে প্রথম ডোজ নেওয়া ১৫ লাখ ১৬ হাজার ৪ জনের জন্য এই টিকার দ্বিতীয় ডোজ মজুদ নেই। এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত সাত দিনেরও বেশি সময় ধরে এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া কমিয়ে এনেছে। বেশি কমেছে দ্বিতীয় ডোজ।

একইভাবে মডার্না ও ফাইজার টিকার পরিমাণও কমে এসেছে। বাধ্য হয়ে অ্যাস্ট্রানেজেনেকার মতো এই দুই ধরনের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কমানো হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সংখ্যা।

ভবিষ্যৎ সরবরাহ ও মজুদের দিকে তাকিয়ে সরকার এখন চীনের সিনোফার্ম টিকা ব্যাপক হারে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বুধবারও এক দিনে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে এই টিকা দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩১৭ জনকে। পক্ষান্তরে একই দিন অ্যাস্ট্রাজেনেকা দেওয়া হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে ২৮ হাজার ২৫ ডোজ, ফাইজার ৭ হাজার ২শ ডোজ ও মডার্না ১০ হাজার ৭৩৭ ডোজ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা প্রদান তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত দেশে মোট টিকা নেওয়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টিকা নিয়েছেন সিনোফার্ম, ৫৫ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ৩২ শতাংশ। ১৩ শতাংশ মানুষ নিয়েছেন মডার্না টিকা। সবচেয়ে কম, অর্থাৎ দশমিক ১৬ শতাংশ বা ১ শতাংশের অনেক কম সংখ্যক মানুষ নিয়েছেন ফাইজারের টিকা।

ফুরিয়ে আসছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা : সরবরাহ না থাকায় অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার মজুদে টান পড়তে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও টিকা দেওয়ার সংখ্যা কমিয়ে এনেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই টিকা গত বুধবার পর্যন্ত মোট দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫২ ডোজ। এর মধ্যে প্রথম ডোজ ৭০ লাখ ৭০ হাজার ১৫২ ও দ্বিতীয় ডোজ ৫৪ লাখ ৩ হাজার ৫০০। সে হিসাবে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় রয়েছেন ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫২ জন। কিন্তু বর্তমানে টিকা মজুদ আছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৪৮ জন। অর্থাৎ প্রথম ডোজ নেওয়া ১৫ লাখ ১৬ হাজার ৪ জনের জন্য টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেই। কারণ এখন পর্যন্ত মোট টিকা এসেছে ১ কোটি ২৬ লাখ ২৪ হাজার ৩শ ডোজ। দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫২ ডোজ।

সংকটের কারণে এই টিকা দেওয়ার পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিশেষ করে দ্বিতীয় ডোজের সংখ্যা কমেছে অনেক। গত বুধবার এই টিকা দেওয়া হয়েছে ২৮ হাজার ২৫ ডোজ। এর মধ্যে প্রথম ডোজ ছিল ২৭ হাজার ৪০৯ ও দ্বিতীয় ডোজ ছিল ৬১৬। অথচ সাত দিন আগেও ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছিল ২ হাজার ২৯৬ ডোজ। সে হিসেবে সাত দিন পরে এসে আগের চেয়ে দ্বিতীয় ডোজ কমেছে ১ হাজার ৬৮০।

এমনকি গত ১৫ দিনে এই টিকার মোট সংখ্যাও কমেছে অনেক। গত বুধবার যেখানে এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে দেওয়া হয়েছে  ২৮ হাজার ২৫ ডোজ; সেখানে ১৫ দিন আগে ৬ সেপ্টেম্বর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার  ১৩৮ ডোজ। সে সময় দেওয়া প্রথম ডোজ ১ লাখ ৫২ হাজার ২৮৮ থেকে কমে গত বুধবারে নেমে এসেছে ২৭ হাজার ৪০৯-এ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৫ হাজার ৮৫০ থেকে কমে নেমে এসেছে মাত্র ৬১৬ ডোজে।

কমছে মডার্না ও ফাইজার : অনেক দিন ধরেই এই দুই ধরনের টিকার কোনো চালান দেশে আসছে না। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর ১০ লাখ ফাইজারের টিকা ও ১৯ জুলাই ৩০ লাখ মডার্নার টিকার চালান আসে।

টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত মডার্না টিকা দেওয়া হয়েছে ৪৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৩ ডোজ। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ২৫ লাখ ৮০ হাজার ৬০৮ জন ও দ্বিতীয় ডোজ ২৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৫ জন। সে হিসেবে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় আছেন ১ লাখ ৮০ হাজার ২৯৩ জন। এ পর্যন্ত মডার্না টিকা এসেছে ৫৫ লাখ ১৭ হাজার ২০০ ডোজ। দেওয়া হয়েছে ৪৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৩ ডোজ। সে হিসেবে বর্তমানে এই টিকা মজুদ আছে ৫ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৭ ডোজ। অর্থাৎ দ্বিতীয় ডোজের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় টিকা বেশি আছে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮৫ ডোজ। তবে টিকায় টান পড়তে পারে আশঙ্কায় গত কয়েক দিন ধরে এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। গত বুধবার এই টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৪১ জনকে ও দ্বিতীয় ডোজ ৮ হাজার ৬৯৬ জনকে।

অন্যদিকে, গত বুধবার পর্যন্ত ফাইজার টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন ও দ্বিতীয় ডোজ ৪৫ হাজার ১৯১ জন। মোট টিকা নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৩ জন। সে হিসেবে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় রয়েছেন ১৭ হাজার ২৯২ জন। এই টিকা মোট এসেছে ১১ লাখ ৬২০ ডোজ। বর্তমানে মজুদ আছে ৯ লাখ ৯২ হাজার ৯৪৭ ডোজ। অর্থাৎ এখনো প্রথম ডোজ অনুপাতে দ্বিতীয় ডোজের টিকা যথেষ্ট পরিমাণ রয়েছে। তবে টান পড়তে পারে বিবেচনায় এখন আর এই টিকা ব্যাপকহারে দেওয়া হচ্ছে না। গত বুধবার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ২০০ ডোজ। এর মধ্যে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৬৩০ ও দ্বিতীয় ডোজ ৫৭০। অথচ সাত দিন আগেও এই টিকা দেওয়ার পরিমাণ ছিল আগের মতো। এই টিকা দেওয়ার সংখ্যাও কমিয়ে আনা হয়েছে।

চলছে সিনোফার্মের দাপট : মজুদ ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় এখন সিনোফার্ম টিকা ব্যাপক হারে দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই টিকা দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৬৪৮ জনকে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ ১২০ জন ও দ্বিতীয় ডোজ ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ৫২৮ জন। বর্তমানে প্রথম ডোজ নিয়েছেন এমন ৬১ লাখ ১৯ হাজার ৫৯২ জন। অথচ বর্তমানে মজুদ রয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫২ ডোজ। এই টিকা এখন পর্যন্ত এসেছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ ২৫ হাজার ডোজ। বর্তমানে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। গত বুধবার এক দিনে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩১৭ জনকে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৩ লাখ ৯ হাজার ৩৫৮ জন ও দ্বিতীয় ডোজ ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৯ জন।

মোট টিকার ৫৫ শতাংশই সিনোফার্ম : দেশে গত বুধবার পর্যন্ত মোট টিকা নিয়েছেন ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩১ হাজার ৮৯৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ২ কোটি ৩৫ লাখ ১৩ হাজার ৩৬২ জন ও দ্বিতীয় ডোজ ১ কোটি ৫৫ লাখ ১৮ হাজার ৫৩৪ জন। সে হিসেবে মোট টিকা পাওয়া মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ বা ২ কোটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৬৪৮ জনই নিয়েছেন সিনোফার্ম টিকা। এরপর ৩২ শতাংশ বা ১ কোটি ২৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫২ জন নিয়েছেন অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা। অবশিষ্টদের মধ্যে মডার্না নিয়েছেন ৪৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন বা ১৩ শতাংশ মানুষ ও ফাইজার নিয়েছেন সবচেয়ে কম ৬২ হাজার ৪৮২ জন বা দশমিক ১৬ শতাংশ মানুষ।

আরও ৫০ লাখ সিনোফার্ম টিকা এলো : চীন থেকে সরকারের কেনা আরও ৫০ লাখ সিনোফার্মের টিকা দেশে এসেছে। টিকার চালান নিয়ে একটি ফ্লাইট গত বুধবার রাত ২টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম প্রধান টিকা আসার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।