শিল্পীর রূপান্তরে বিশ্বাস করতেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ব্যক্তির রূপান্তরের প্রতিও ছিল তার অগাধ আস্থা। তার মধ্যে প্রকৃত শিল্পীসত্তা ছিল বলেই এই দুইয়ের মধ্যে তিনি কোনো বিরোধ দেখেননি। সেই একই কারণে পারিপার্শ্বিক নানান সীমাবদ্ধতাকেও তার তুচ্ছ মনে হয়েছিল। কেননা, সীমাবদ্ধতার চেয়ে প্রকৃত শিল্পের শক্তিকেই তিনি বড় করে দেখেছিলেন আমৃত্যু। সে-কারণেই বলতে পেরেছিলেন, ‘একজন কবির অনেক সীমাবদ্ধতাই তুচ্ছ হয়ে যায়, যদি তার উচ্চারণে থাকে সত্যের জোর।’ এই যে যাকে তিনি বলেছেন, ‘সত্যের জোর’, সেটি তার সমস্ত সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি। বলা যায়, সেই শক্তিকে অবলম্বন করেই তিনি তার মতো করে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন।
২. তিনি ছিলেন বাংলাদেশেরই একজন সাহিত্যিক, স্বাভাবিকভাবেই সেই কারণে নানান ধরনের প্রতিকূলতা তাকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে। সবসময়ই যে তার সঙ্গে পেরে উঠেছিলেন তা তো নয়। ভালোবাসতেন বই পড়তে, নিজের ধরনে লেখালেখি করতে। তাও তো নানা কারণে তার পক্ষে সেটা খুব একটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। জীবনের উপান্তে এসে নিজের দিনলিপিতে তাই তিনি অনেকটা বেদনা নিয়েই লিখেছিলেন : ‘আমার যদি জীবিকার সমস্যা না-থাকত, শরীর হতো নীরোগ, পরমায়ু সুদীর্ঘ, শুধু বই পড়ে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ থেকে অখ্যাত সব লেখকের বই পড়ে সময় কাটিয়ে দিতাম। আর কিছুই করতাম না।’ শুধুই এইটুকুতেই যে ব্যাপারটি শেষ হচ্ছে, তা নয়; তার পাশাপাশি ভগ্ন হৃদয়ে এ-ও লিখেছিলেন, ‘ইদানীং যখুনি একটি ভালো লেখা পড়ি, নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। আমি কেন বোকার মতো লেখালেখির ভেতর গিয়ে পড়েছিলাম?...আবার কখনো ভাবি, চেষ্টা করলে স্মরণীয় কিছু কি লিখতে পারতাম না?’ এরপরেই কতকটা নিজেকে যেন সামলিয়ে বলেছেন, ‘এখন এসব কথা ভাবাই উচিত নয়। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।’
৩. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এমন একজন ব্যক্তি, চাইলেও কারও পক্ষে, তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। কেন সেটা সম্ভব নয় তা বলছি। যদি বাংলাদেশের দশজন প্রধান গীতিকারের তালিকা করা হয়, তার নামটি আসবেই। যদি বাংলাদেশের প্রথম সারির দশজন প্রাবন্ধিকের তালিকা করা যায়, আবু হেনার নামটি আসবেই। যদি বাংলাদেশের দশজন কবির তালিকা করা হয়, তাহলেও আবু হেনা মোস্তফা কামালের নামটি উপেক্ষিত হবে না বলেই আমরা ধারণা করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী অধ্যাপক হিসেবেও তিনি ছিলেন একেবারে প্রথম সারির একজন।
৪. খুব বেশি না হলেও তিপান্ন বছরের পরমায়ু পেয়েছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। সেই তুলনায় তার রচনার পরিমাণ সামান্যই বলতে হয়: তিনটে কবিতার বই; দুটো প্রবন্ধ-সংকলন; বেশ কিছু অসামান্য গান আর তার গবেষণা-সন্দর্ভ, মোটামুটি এই হচ্ছে তার রচনাকর্মের একটি প্রাথমিক হিসাব। এটিও সত্যি যে, সাহিত্যের বিচারে সংখ্যার চেয়ে শিল্পগুণই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। হিসাব করলে দেখা যাবে যে, বিলেতের টি. এস. এলিয়ট কিংবা আমাদের সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার সংখ্যা এমন বেশি কিছু নয়। কিন্তু তারপরও আবু হেনার বেলায় কিছু কথা থেকে যায়। নিজের সময়টুকুর পুরোটাই যে তিনি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন, এমনটি কিন্তু বলা যাবে না। এটা ঠিক যে, অধ্যাপনা জীবনের শুরুর দিকটা তাকে মফস্বলে কাটাতে হয়েছে। ফখরুজ্জামান চৌধুরী তাকে নিয়ে লেখা একটি স্মৃতিকথায় জানিয়েছিলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়া আদৌ তার উচিত হয়েছিল কিনা এ নিয়ে তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। একটি ডক্টরেট ডিগ্রি ছাড়া রাজশাহী থেকে তার প্রাপ্তি ছিল শূন্য। এমনই ধারণা পোষণ করতেন তিনি।’ ওই একই স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে, আবু হেনা নাকি বলতেন, ‘জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অংশ আমি কাটিয়ে এলাম অজ পাড়াগাঁয়। সেখানে কিছু লিখতে পারিনি। লেখার কথা ভাবতেও পারিনি। লোকে কেন লেখে কিংবা আমি একসময় কেন লিখতাম, সব বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম।’ তার দিক থেকে কথাগুলো হয়তো সত্যি কিন্তু এসব হচ্ছে একধরনের আবেগীয় উচ্চারণ কিংবা একে বলা যেতে পারে একরকম অভিমানের কথা। কেননা, জীবনানন্দ দাশ তো তার জীবনের সেরা কবিতাগুলোর একটা বড় অংশ বরিশালের মতো একটা জেলা শহরে বসেই লিখেছিলেন। তিনি নিজেও যে নিজেকে নিয়ে একেবারেই অপচয় করেননি, সেটিও তো জোর দিয়ে আমরা বলতে পারি না। ১৯৭৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এর পরের সময়টুকুও কিন্তু তিনি তেমন একটা কাজে লাগাননি। বরং লেখালেখির চেয়ে, আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে বসেই ব্যস্ত সময় কাটিয়ে গিয়েছেন জীবনের শেষবেলা পর্যন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। এছাড়াও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হয়েছিলেন, হয়েছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। তার মেধাবী সময়গুলো এইভাবেই তিনি অনুতাপহীনভাবে ‘ক্ষয়’ করে গিয়েছিলেন।
৫. অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার একটি স্মৃতিচারণে আবু হেনা মোস্তফা কামালের সাহিত্য-বিষয়ক প্রবন্ধ সম্বন্ধে বলেছিলেন যে, এই লেখাগুলোর মধ্যে ‘সাহিত্য সমালোচকরূপে তার মৌলিকতার পরিচয় ধরা আছে।’ উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বহুল আলোচিত বিষয় নিয়ে লেখার সাহস আমাদের সকলের থাকে না। আবু হেনা সে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। দেখিয়েছেন যে অন্তর্দৃষ্টি থাকলে অনেক কথার পরেও কিছু বলার থাকে।’ আবু হেনার প্রবন্ধের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখব, সেগুলো বিষয় হিসেবে খুব যে নতুন কিছু তা কিন্তু নয়। কাদের নিয়ে লিখেছেন তিনি? বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে। তাহলে তার কৃতিত্বটা কোথায়? তার কৃতিত্ব হচ্ছে নতুন করে দেখার দৃষ্টি আর বিচিত্রভাবে বলার ভঙ্গি। এই দুই কারণেই পুরনো গতানুগতিক ব্যাপারও পাঠকের চোখে নতুনভাবে ধরা দেয়। যেমন মাইকেলের ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে’র আলোচনা শুরুই করেছেন এইভাবে : “ ‘তিলোত্তমাসম্ভব’, সকল অর্থেই, মধুসূদনের পরীক্ষামূলক সৃষ্টি। কিন্তু তার গুরুত্ব তাই বলে কম নয়। কেননা, ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ উদ্ভাসিত গুণাবলির প্রথম আভাস এই কাব্যেই সূচিত হয়েছিল।” রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘পুনশ্চ’-র উদাহরণ টেনে বলেছেন, “ ‘পুনশ্চ’-র সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার চিত্রলতা। সম্ভবত ছন্দের প্রতি মাধুর্যের অভাব পূরণের জন্যই নতুন করে চিত্রধর্মের প্রতি এই আসক্তি।” প্রাবন্ধিকের এইসব যুক্তিকে কোনোভাবেই অস্বীকার করবার উপায় থাকে না। শুধু মনে আফসোস জাগে এই কারণে যে, তিনি সমালোচনা-সাহিত্যের দিকে কেন আরও মনোযোগী হলেন না? কেন আরও খানিকটা বেশি সময় সাহিত্যচর্চায় ব্যয় করলেন না?
৬. আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে তার কবিতা সম্পর্কে কিছু না-বলাটা মোটের ওপর একটা ‘অন্যায়’ ব্যাপার বলে মনে হয়। তার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশি তো নয়, মাত্র তিনটি। আবদুল মান্নান সৈয়দ তার কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আবু হেনার সমস্ত রচনা সুচিন্তিত ও সুলিখিত। এই সুচিন্তা ও সুলেখার পেছনে যে-মন কাজ করেছে, তা আসলে সুচেতনা।’ আবদুল মান্নান সৈয়দ কথিত সেই সুচেতনা থেকেই এরকম পঙ্ক্তির সৃষ্টি হয় ‘মা, তোমার উষ্ণ কোলে আহত অবুঝ মাথা রেখে/ আমি শুধু শুয়ে থাকবো, আমার সোনালি লম্বা চুলে/ তোমার নিঃশ্বাস ঢেউ তুলে যাবে, আমি আজ কিছুই করবো না, শুধু/ চেয়ে চেয়ে দেখবো এক অলৌকিক গর্বে দীপ্ত সম্রাজ্ঞীর মতোন তোমাকে।’ (‘আপন যৌবন বৈরী’) আবু হেনার ‘সুচিন্তা’র প্রতিচ্ছায়া যেন দেখতে পাই এইসব কবিতায় ‘যখন একটি গান নিষ্পাপ হাঁসের মতো উড়ে আসে/ লেখার টেবিলে/ একটি উপমার ফুল ঝরে পড়ে কবিতার সুঠাম চরণে/ অথবা একটি দুঃখ সোনালি সরোদে বাজে স্মৃতির ভেতরে/ তখন তোমাকে দেখি, তোমাকেই দেখি অরুন্ধতী/ যতোদিন বেঁচে আছি দেখা হবে। শুধু এমনি করে।’ (‘যেহেতু জন্মান্ধ’)
৭. কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আবেগ আর অনুভূতির হৃতরাজ্য পাঠকের হাতে ফিরে এলো। তার মানে এ নয় যে, কবিতায় হয় শুধু বুদ্ধি, নয় শুধু আবেগ থাকে। কবিতা কবন্ধ নয়, আবার রাহুর মতো ধড়হীন শুধু মুন্ডু ও নয়।’ অর্থাৎ আবেগ ও বুদ্ধির শৈল্পিক সমন্বয়ের ভেতর দিয়েই একটি সার্থক কবিতা তৈরি হয়ে ওঠে। আবু হেনার কবিতাতেও এর যথেষ্ট নমুনা আমরা দেখতে পাই ‘ছিনতাইকারীর মুখের ওপরে/ এক টুকরো গজল ছুড়ে দিয়ে/ আমি চলে যেতে পারি;/ আমার পকেটে নেই বৈদেশিক মুদ্রা/ কব্জিতে নেই সোনার ঘড়ি, তবে?/ আর যদি এসব না থাকার জন্যে, তার হাতের শীতল ছুরি ঝিকিয়ে ওঠে,/ বলবো, অনায়াসে হৃৎপি- বিদ্ধ করতে পারো/ কেননা সেখানে নতুন কোনো রক্তপাত কখনো হবে না।’ (‘আক্রান্ত গজল’) কবি মুখে যতই বলুন না কেন, তার হৃদয়ে রক্তপাত তো হতেই থাকে। কেননা কবির হৃদয়ে রক্তপাত না হলে তার নিজস্ব উপলব্ধি কখনোই কবিতা হয়ে উঠতে পারে না। আবু হেনার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এ হচ্ছে কবির একপ্রকার অপ্রকাশ্য অভিমান, যার জন্ম সেই সুলেখা আর সুচিন্তা থেকে। টি এস এলিয়ট (T.S. Eliot) অনেক আগেই বলেছিলেন, ‘Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the expression of personality, but an escape from personality.’ আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবিতায় সেই সদ্গুণটি বেশ ভালোভাবেই আমরা দেখতে পাই। সে-কারণেই আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো সমালোচক তার কবিতায় একটি ‘অভিজ্ঞতাস্পৃষ্ট গাঢ় বাণীবন্ধ’ রূপের সন্ধান খুঁজে পেয়েছিলেন।
৮. এই রকম একজন প্রাণবান, সতেজ সাহিত্যিককে পাঠক হিসেবে আমরাও যে ভুলে থাকলাম, সে দায় আমাদের নিজেদের ওপরেও বর্তায়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, ‘আবু হেনার মধ্যে একটা উঁচু মান কাজ করত। সে মান স্পর্শ করতে কেউ কখনো ব্যর্থ হলে তাকে তিনি ছেড়ে কথা বলতেন না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘তার আত্মপ্রত্যয় যেমন ছিল প্রবল, তেমনি ছিল প্রচ- অভিমানবোধ।’ সেই উঁচু মানের সাহিত্যিক আবু হেনার সাহিত্যকর্মের মুখোমখি হওয়ার মতো প্রস্তুতি কি আমাদের আছে, কখনো কি ছিল? তার সেই প্রবল আত্মপ্রত্যয় আর অভিমানবোধের সামনে দাঁড়াবার সামর্থ্য তো অর্জন করতে হবে। তিনি তো আমাদেরই আপনজন, কোনো পরদেশি তো নন! গত ২৩ সেপ্টেম্বর ছিল আবু হেনা মোস্তফা কামালের ৩২তম প্রয়াণ দিবস। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়