ই-কমার্সে বিশৃঙ্খলার দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও

বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশনসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব, সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতার কারণে ই-কমার্স খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে বলে খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন। কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার দায় এখন সব পক্ষকে নিতে হবে। তবে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের অনলাইন বাণিজ্য বা ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে খাতটির জন্য নতুন আইন বা আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, তার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করেন ই-কমার্স সংশ্লিষ্টরা। 

গতকাল শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় অনলাইন বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তা ও আইনজীবীরা বলেছেন, নতুন আইন কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন না করে বরং সরকারের উচিত হবে বিদ্যমান যেসব আইন আছে, সেগুলো বাস্তবায়নে নজর দেওয়া; একই সঙ্গে সরকারের এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার সমন্বয় করা।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, আইনজীবী তানজীব উল আলম, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন, বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর, চালডাল ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিম আলিম, শপ আপের চিফ অব স্টাফ জিয়াউল হক, অ্যাসিক্স বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফসানা আসিফ, ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ তমালসহ অন্যরা।

আবদুল ওয়াহেদ বলেন, আমরা তিন বছর আগেই সরকারকে বলেছিলাম এ ধরনের একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। ই-কমার্সে যে স্বচ্ছতা নেই, তা সরকারকে জানানো হয়েছিল। ইভ্যালিসহ অন্যদের বিজনেস মডেল নিয়ে অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে জানান তিনি।

আবদুল ওয়াহেদ আরও বলেন, ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে বেশ আগেই এ খাতের সমস্যা সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিজিটাল মনিটরিং পদ্ধতি চালু, উপদেষ্টা ও কারিগরি কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়। তবে আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে বেশি কিছু তাদের করার থাকে না।

ফাহিম মাশরুর বলেন, ই-কমার্সের জন্য দেশে নতুন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাই না। ই-কমার্সে শৃঙ্খলা আনতে হলে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে জবাবদিহি করা এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে তাদের শক্তিশালী করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনে এসব ঘটনা ঘটেছে। এখানে তাদের অবহেলা ছিল স্পষ্ট। ব্যাংকগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, দেশে বড় একটি সমস্যা বেকারত্ব। অসংখ্য তরুণ বেকার। কর্মহীন। তারাই ই-কমার্সে বিনিয়োগ করছে। চাকরি না থাকলে তো এখানে আসবেই। ব্যাংকের সুদের হার কম। পুঁজিবাজারও নিরাপদ নয়। তাহলে তরুণ জনগোষ্ঠী যাবে কোথায়? একটা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করে ফেললাম, আর সঙ্গে সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমনটা ভাবা ঠিক হবে না।

জিয়াউল হক বলেন, এই যে ব্যাংকিং চ্যানেলে এত টাকা লেনদেন হলো, ব্যাংকের ভূমিকা কী ছিল। ই-কমার্সকে যদি নজরদারি করা হয়, তাহলে নতুন আইনের প্রয়োজন হবে না।

আইনজীবী তানজীব উল আলম বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা পরিশোধের দায় সরকারের হতে পারে না। সরকার জনগণের করের টাকায় সে দায় পরিশোধও করতে পারে না। তা সাংবিধানিকও হবে না। তিনি বলেন, ইভ্যালির লেনদেন হয়েছে অনলাইনে। তাদের কাছ থেকে কারা কত টাকা নিয়েছে সেগুলো নিশ্চয়ই অনলাইন লেনদেনের হিসাবে ডকুমেন্ট রয়ে গেছে। মোটা দাগে আমরা ক্রিকেট বোর্ডে ইভ্যালিকে স্পন্সর হতে দেখেছি। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাও টাকা নিয়েছে। এসব খাতে লেনদেনে অস্বাভাবিকতা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এ ধরনের ডিটেইল তদন্ত করতে হলে সবার আগে ইভ্যালিতে একজন লিক্যুইডিটর নিয়োগ দিতে হবে।

তানজীব বলেন, কোনো সংকট তৈরি হলেই নতুন আইনের কথা বলা হয়। তবে আজকের আলোচনায় সবাই মোটামুটি একমত নতুন আইন না করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে আর্থিক জালিয়াতি ধরার জন্য আলাদা একটা উইং করতে হবে।

ওয়াসিম আলিম বলেন, ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও আলাদা কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। শুনতে পাচ্ছি, ই-কমার্সে শৃঙ্খলা ফেরাতে আলাদা একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করবে সরকার। এটি ই-কমার্সকে আরও কঠিন করে ফেলবে। সরকারের বিদ্যমান যেসব সংস্থা আছে, তাদের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ালে সেটি আরও বেশি কার্যকর হবে।

আফসানা আসিফ বলেন, আমাজনের সঙ্গে আমাদের দেশের ই-কমার্সের বড় পার্থক্য হলো এখানে পণ্য ডেলিভারিতে অনেক সময় নেয়। তা ছাড়া আমাজনের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা আছে, যেটা আমাদের দেশে নেই।

সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ই-কমার্স নতুন একটি শিল্প। ই-কমার্সে যা কিছু ঘটেছে, তাতে এককভাবে কাউকে দোষ না দিয়ে বলা যায়, এখানে সবারই দোষ ছিল। যে টাকা লোপাট হয়েছে, এখন জরুরি সে টাকা ফিরিয়ে আনা।

রেহমান সোবহান বলেন, দেশে সুশাসনের মারাত্মক ঘাটতি আছে। সে কারণে গ্রাহকের টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটছে। আর ই-কমার্সের মাধ্যমে প্রথম এ ঘটনা ঘটেনি। এর আগেও বহুবার একই ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বিচার হয়নি।