বাসের লাগেজ বক্সে লাশ ৬ বছর পর মিলল পরিচয়

প্রায় সাড়ে ৬ বছর আগে রাজধানীর গাবতলীতে ঈগল পরিবহনের বাসের লাগেজ বক্সে একটি লোহার ট্রাঙ্কে পাওয়া ২৫ বছর বয়সী অজ্ঞাতপরিচয় নারীর লাশের পরিচয় শনাক্ত এবং তাকে হত্যার রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শম্পা বেগম নামে ওই নারীকে হত্যায় জড়িত অভিযোগে গত শুক্রবার ভোরে তার কথিত স্বামী নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য রেজাউল করিম স্বপনকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গ্রেপ্তারের পর শম্পা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন স্বপন। গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানম-িতে পিবিআই সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানান সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৩ মে বিকেলে রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ঈগল পরিবহনের একটি বাসের মালামাল রাখার বক্সে থাকা একটি ট্রাঙ্কে অজ্ঞাতপরিচয় নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্তে নামে পিবিআই। সংস্থাটির তদন্তে বের হয়ে আসে অজ্ঞাতপরিচয় ওই লাশের পরিচয়। লাশটি শম্পা বেগমের নিশ্চিত হওয়ার পর উদঘাটন হয় হত্যার রহস্য।

এর আগে ২০১৫ সালের ৩ মে সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলেন শম্পা। সেদিন শম্পার কথিত স্বামী রেজাউল করিম স্বপনের চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর বাসা থেকে বাবার বাড়ি খুলনার দৌলতপুরে যাওয়ার কথা ছিল শম্পার। শম্পার বাবা ইলিয়াস শেখকে ফোনে স্বপন জানান শম্পাকে টার্মিনাল থেকে বাসে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু গত সাড়ে ৬ বছরেও বাড়িতে ফেরেননি শম্পা।

শম্পা হত্যার রহস্য উদঘাটনের পর পিবিআই বলছে, বিয়ে না করেই ২০১৪ সাল থেকে একই ছাদের নিচে বসবাস করছিলেন শম্পা ও স্বপন। শম্পা তার বাবা-মাকে জানান তারা বিয়ে করেছেন। ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকে শম্পা বিয়ের জন্য স্বপনকে চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু স্বপনের স্ত্রী-সন্তান থাকায় শম্পাকে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয়। ২০১৫ সালের ২ মে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাদের মধ্যে কলহের সময় স্বপন শম্পার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে লাশ ট্রাঙ্কে ভরে বাসে করে ঢাকা পাঠিয়ে দেন। শম্পা নিখোঁজের পর ২০১৫ সালের ১০ জুন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শম্পার ভগ্নিপতি বিজিবির ল্যান্স নায়েক আবদুল মান্নান। ওই জিডির সূত্র ধরেই অজ্ঞাতপরিচয় লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়।

মামলার তদন্তকারী পিবিআই পরিদর্শক আশরাফুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৩ সালে রেজাউল করিম স্বপন (অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সদস্য) খুলনার তিতুমীর নৌঘাঁটিতে কর্মরত থাকাকালীন শম্পা বেগম হাসপাতালে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন। হাসপাতালে শম্পার মায়ের চিকিৎসার সময় স্বপনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের সূত্রে প্রথমে প্রেম এবং পরে শম্পা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে স্বপন বদলি হয়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন। শম্পাও কিছুদিন পর চট্টগ্রামে চলে আসেন। চট্টগ্রামে শম্পা তার এক ফুফুর বাসায় কিছুদিন থাকেন। এরপর ফয়স’ লেক এলাকায় একটি হোটেলে কিছুদিন অবস্থান করেন। পরে পাহাড়তলী থানাধীন উত্তর গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আনোয়ার হোসেনের টিনশেড বাড়ির একটি বাসায় সাবলেট নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে স্বপন ও শম্পা একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এভাবে তারা ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত একত্রে বসবাস করেন।

গতকাল দুপুরে ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দপ্তরে শম্পা বেগমের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ইলিয়াস শেখের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ছয় বছর ধরে ভেবেছিলাম শম্পা পাচার হয়েছে অথবা কোনো কারণে নিখোঁজ রয়েছে। আমার বিশ্বাস ছিল সে এক দিন আমার বুকে ফিরে আসবে। কিন্তু গত বুধবার জানতে পারলাম শম্পা ছয় বছর আগেই খুন হয়েছে। প্রথম থেকেই আমার সন্দেহ ছিল স্বপনের ওপর। শম্পা নিখোঁজের পর আমি তাকে থানায় জিডি করতে বললে সে আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে।’  

শম্পার মা মেয়ে নিখোঁজের পর থেকে অসুস্থ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শম্পার মা লিভার ও কিডনির সমস্যায় ভুগছে। তাছাড়া শম্পা নিখোঁজের পর থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।’

শম্পার ভগ্নিপতি আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে শম্পা ছিল মেজ। সে খুলনা আজম খান সরকারি কমার্স কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। শম্পা আমাদেরকে বলেছিল সে স্বপনকে বিয়ে করেছে। স্বপনের আরেক বউ ও সন্তান আছে জানতে পারার পর তাদের মধ্যে বিরোধ বাধে। শম্পা তার বোনকে জানায়, স্বপন তাকে নির্যাতন করে। শম্পা নিখোঁজের পর থানায় জিডি করলেও কোনো খোঁজ পায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বপন থানায় আমার সামনে পুলিশকে জানায় শম্পা তার স্ত্রী না। শম্পা নিখোঁজের আগে স্বপনের সঙ্গে কোথায় কোথায় ছিল তার প্রমাণ পুলিশকে দিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ বলে বিয়ের কাবিন দেখাতে। আমাদের কাছে কাবিন ছিল না। স্বপন নৌবাহিনীর চাকরি করায় পুলিশও কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে তার বিরুদ্ধে দুই দফায় নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ২০১৯ সালে স্বপনকে চাকরি থেকে অবসরে পাঠায়।’

শম্পা হত্যার রহস্য উদঘাটনের বিষয়ে জানাতে গিয়ে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘ঘটনার দিন চট্টগ্রাম এ কে খান মোড়ে ঈগল পরিবহনের কাউন্টারে টিকেট কেটে একজন ব্যক্তি একটি ট্রাঙ্ক তুলে দেন বাসের বক্সে। বাসের হেলপারকে তিনি বলেন সামনের ভাটিয়ারি কাউন্টার থেকে টিকেটের যাত্রী উঠবে। কিন্তু পরবর্তী কাউন্টারে কোনো যাত্রী না উঠায় বাসটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে। ওইদিন বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে বাস গাবতলীতে পৌঁছায়। শেষ গন্তব্যে সব যাত্রী যে যার মতো তাদের জিনিসপত্র নিয়ে নেমে যায়। পরে হেলপার দেখে একটি ট্রাঙ্ক বাসের বক্সে মালিকবিহীন পড়ে আছে। তখন বাসের ড্রাইভার-হেলপার মিলে ট্রাঙ্কটি নামিয়ে দেখে এটি খুব ভারী। তাদের সন্দেহ হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে দারুস সালাম থানায় খবর দিলে থানা পুলিশ হাজির হয়ে ট্রাঙ্কটি খুলে একজন অজ্ঞাতনামা তরুণীর লাশ দেখতে পায়। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে পোস্টমর্টেমের জন্য হাসপাতালে পাঠায়।’

লাশের পরিচিতি শনাক্ত না হওয়ায় তা অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন করা হয় জানিয়ে পিবিআই প্রধান বলেন, কেউ বাদী না হওয়ায় থানা পুলিশের পক্ষে এসআই জাহানুর আলী বাদী হয়ে আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করে দারুস সালাম থানায় মামলা করেন। মামলাটি হওয়ার পর থেকে শুরুতে প্রায় তিন মাস থানা পুলিশ তদন্ত করে। থানা পুলিশের পরে সিআইডি দীর্ঘ চার বছর তদন্ত করে। কিন্তু লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় এবং হত্যারহস্য উন্মোচিত না হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে সিআইডি। দাখিলকৃত চূড়ান্ত রিপোর্ট গ্রহণ না করে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে দেয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই। পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) উক্ত মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর আশরাফুজ্জামান ভিকটিমকে শনাক্ত করার জন্য প্রচলিত সব পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। অবশেষে গত শুক্রবার ভোরে কুমিল্লা ইপিজেড এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে স্বপনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পিবিআইয়ের সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল এবং সংস্থাটির ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) ইউনিট ইনচার্জ মো. জাহাঙ্গীর আলম।