অধিকার আদায়ে সোচ্চার কণ্ঠ কমলা ভাসিন

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও আইসিইউ থেকে একটি অনলাইন মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন কমলা ভাসিন। পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি। ভারতীয় উপমহাদেশে নারীবাদকে এনেছেন রাজনৈতিক ময়দানে। নারীবাদী আইকন কমলা ভাসিনকে নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

আমির খানের মুখোমুখি কমলা

সত্যমেব জয়তে। স্পর্শকাতর সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে এক চমৎকার টিভি অনুষ্ঠান। আমির খানের উপস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের মানুষের মতবিনিমিয়ের সুযোগ এই টক শো আরও জীবন্ত করে তুলেছে। ২০১৩ সালে এ অনুষ্ঠানের একটি শোতে উপস্থিত হয়েছিলেন কমলা ভাসিন। আমির খান জানালেন তিনি প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। আমিরের স্বগতোক্তি দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল তুলল। কমলা ভাসিন হাসলেন না। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানালেন এখানে হাসির কিছু নেই। স্পষ্ট বললেন, আমাদের সমাজে নারীদের কী কী করতে হয় তা নিয়ে আমরা কথা বলি কিন্তু যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন পুরুষ বেড়ে ওঠে সে প্রক্রিয়া খুবই দুঃখজনক। পুরুষরা যদি এ ধারার কোনো পরিবর্তন না চায় তাহলে তাদের মানবতা ধ্বংস হয়ে যাবে। নারীকে সমর্থন করার জন্য একজন পুরুষকে পরিবর্তিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের সংস্পর্শে এসে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠার হাত থেকে বাঁচাতে হবে তাদের। আপনি যদি ধর্ষণের আসামিদের দিকে তাকান, আপনি দেখতে পাবেন তারা জানত যে তারা ধরা পড়বে। আজকাল আইনের ফাঁক গলে পালানো মুশকিল। তবুও তারা এ ধরনের অপরাধ করে। কারণ তারা নির্মম মানুষ, পিতৃতন্ত্র তাদের নির্মম করে তুলেছে। আর তারা এর ফল ভোগ করছে।

এমন সমাজ গড়ে তুলুন যেখানে একটি মেয়ে ও একটি ছেলেকে সমান হিসেবে দেখা হবে। আরও বেশি নারী এখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছে, শিক্ষিত হচ্ছে, অর্থ উপার্জন করছে তবু আপনি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই দেখবেন লিঙ্গভিত্তিক অপরাধ বাড়ছে, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে ভ্রƒণহত্যা বাড়ছে, যৌতুকের বলি হচ্ছে নারী, পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে। স্বামী, পতি, কন্যাদানের মতো শব্দগুলো আমাদের একটি সমতাবাদী সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে বাধা দেয়। স্বামী শব্দের অর্থ নিয়ন্ত্রক বা মালিক। একজন মানুষ আরেকজনের মালিক হয়ে দাঁড়ালে কীভাবে আশা করব যে, দুজন মানুষ সমান হতে পারে? আমার মতে ‘কন্যাদান’ প্রথা ভারতের সংবিধানবিরোধী। কারণ দাসপ্রথা অনেক আগেই ভারত থেকে উঠে গেছে। একজন বাবা কীভাবে তার মেয়েকে (১৮ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক) কাউকে দিতে পারেন? এটা অবৈধ হওয়া উচিত। একজন পূর্ণ মানুষ অন্য একজন পূর্ণ মানুষের কাছে তুলে দিচ্ছেন। তাই যা কিছু বিনিময় করা হয়েছে তা এখন মালিকানাধীন। আর মালিকানাধীনকে মালিকের ইচ্ছেমতো আচরণ করতে হবে, নাম থেকে শুরু করে পোশাক পরিবর্তন করতে হবে। এরকম অবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়নও কোনো পরিবর্তন আনবে না। কারণ মালিকানা পরিবর্তন হলে নারী হয়ে ওঠে ‘সম্পত্তি’। আজ ভারতের প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এছাড়াও আমাদের সামাজিক ও আইনি বিধিনিষেধ ধর্মের ওপরে নির্ভরশীল। এখানে ভাবনার বিষয় আছে। ধর্ম মানেই বিশ্বাস। ধর্ম পিতৃতন্ত্রকে সমর্থন করে। আর পিতৃতন্ত্র সমর্থিত নিয়মকানুন হয়ে ওঠে প্রথা বা রেওয়াজ। মানুষ কীভাবে একজনের বিশ্বাসের সঙ্গে তর্ক করবে? 

আমার বর ছিলেন নারীবাদী পুরুষ। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমাদের সন্তান আমাদের উভয়ের পারিবারিক উপাধি বহন করবে। ভারতীয় উপমহাদেশে একজন বিবাহিত নারী তার শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে এটাই বিধান। বিয়ের পরেও আমার মা আমাদের সঙ্গেই বসবাস করতেন। একবারের জন্যও তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেননি আমার মা কেন আমাদের সঙ্গে বসবাস করবে। কিন্তু এরপরেও তো আমাকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে হয়েছিল। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, জীবনের সবক্ষেত্রে তার চর্চা দেখাতে পারেননি। এভাবেই শেষ পর্যন্ত পিতৃতন্ত্র জিতে যায়, হেরে যায় পুরুষ।

কমলা ভাসিনের বেড়ে ওঠা

১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল পাঞ্জাবের শহিদানওয়ালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কমলা ভাসিন। ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার কাছাকাছি সময়ে জন্ম বলে নিজেকে তিনি দ্য মিডনাইট জেনারেশন বলে পরিচয় করিয়ে দিতে ভালোবাসতেন। ছয় ভাইবোনের ভেতরে তিনি ছিলেন চতুর্থ। বাবা ছিলেন রাজস্থানের ডাক্তার। বাবার কর্মস্থলের সুবাদে রাজস্থানে বেড়ে ওঠেন তিনি। গ্রামীণ পরিবেশ তার নারীবাদী বোঝাপড়াকে শাণিত করেছে। এ অভিজ্ঞতা তার জীবন ও ভবিষ্যতের কর্মজীবনে সব ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল। কমলা ভাসিন জয়পুরের মহারানী কলেজ থেকে তিনি তার ব্যাচেলর শেষ করেন। রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে ফেলোশিপ নিয়ে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। প্রায় এক বছর তিনি ব্যাড হনেফের জার্মান ফাউন্ডেশনে কাজ করেন। অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা নিজের দেশে কাজে লাগাবেন বলে ভারতে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে সেবা মন্দির নামের একটি এনজিওতে কাজ করা শুরু করেন। সেবা মন্দির মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে কাজ করত। কাজে নেমে তিনি উপলব্ধি করলেন ভারতীয় হিন্দু সমাজে ‘জাত’ কীভাবে বৈষম্যের সৃষ্টি করে। শ্রেণি ও নারীবাদ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এনজিওতে ৪ বছর কাজ করার পর ১৯৭৬ সালে তিনি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় যোগ দেন। দীর্ঘদিন কাজের পর ২০০২ সালে অবসর নেন তিনি। জাতিসংঘের ফ্রিডম অব হাঙ্গার ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজ করার সুযোগ হয়েছে তার। ফলে উপলব্ধির জায়গা আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাতিসংঘ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি পুরোপুরি নারী অধিকার কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। নব্বইয়ের দশকে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জাগরী এবং বেশ কিছুদিন পর তার হাতেই গড়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী নেটওয়ার্ক সাংগাত।  কর্মবীর এই নারী তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও হাস্যোজ্জ্বলভাবে উপস্থিত ছিলেন পাক ইন্ডিয়া পিপলস ফোরাম ফর পিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির মিটিংয়ে। হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়েছিলেন। এ বছর জুন মাসে তার ক্যানসার ধরা পড়ে। ফুসফুসে তরল জমার ফলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ভোররাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজাদি, আমরা স্বাধীনতা চাই

১৯৭০ সালে পাকিস্তানে স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামল চলছিল। জিয়ার শাসনকালে পাকিস্তান নারীর জন্য চরম নিপীড়ক রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল। কমলা ভাসিন পাকিস্তানে গিয়ে দেখলেন নিপীড়িত নারীরা ফুঁসে উঠেছেন। তারা তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার। তারা আজাদি (স্বাধীনতা) চাইছিলেন। এরপরে নারী অধিকার কর্মী কমলা চিরকাল আজাদিই চাইতেন। আশির দশকে কমলার হাত ধরেই প্রতিবাদ মিছিলের জন্য গানের প্রচলন ঘটে। পাকিস্তান থেকে সে পপ-

সংস্কৃতি বয়ে এনেছেন কমলা। ক্রমেই তা এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে মুখে মুখে গানের প্রচলন হয়ে দাঁড়ায় পপ-সংস্কৃতির অংশ। কমলা ভাসিনের শিক্ষা ছিল সমাজ থেকে অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকে মুক্তি। অপশিক্ষা থেকে মুক্তির বিষয়টিও তার ভাষায় আজাদিই। এমন শিক্ষা তিনি আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন, ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন মানুষের মাঝে।

ছোটদের জন্য তিনি বই লিখেছেন। রূপকথায়, প্রবাদ প্রবচনে যে নারীবিদ্বেষ ছড়ানো হয় সেটি রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ছড়া লেখার মধ্য দিয়ে। এমনভাবে তিনি শিশুতোষ গল্পগুলো সাজিয়েছেন যেন কোনো লিঙ্গের মানুষই কারও দ্বারা নির্যাতিত না হয়।

একবার দিল্লির একটি বেসরকারি বিদ্যালয় তাদের এক সান্ধ্য অনুষ্ঠানে কমলা ভাসিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। খুবই আনন্দের সঙ্গে তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন তিনি। পৌঁছানোর পর দেখলেন, চার পাঁচজন ছোট বাচ্চা স্নো হোয়াইট ও সিন্ডারেলা হিসেবে নাচার জন্য রিহার্সেল করছে। সাধারণ চোখে দেখলে পুরো অনুষ্ঠানকে খুব স্নিগ্ধ দেখাবে। কিন্তু কমলার কাছে বিষয়টি ভালো লাগল না। এত কমবয়সী বাচ্চারা স্নো হোয়াইট বা সিন্ডারেলা হওয়ার জন্য ভারী পোশাক পরে নাচানাচি করবে কেন? তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললেন। শিক্ষক জানালেন, এই রিহার্সেল তাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। কমলা আবারও তার লেখা ছড়ার প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে পারলেন। তিনি বুঝলেন তাকে আরও কাজ করে যেতে হবে।

কমলা ভাসিন জীবনে দুই বার মা হয়েছেন। কিন্তু তিনি সেই প্রচলিত গৃহিণী ছিলেন না। তাকে তার কাজের প্রয়োজনে সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়াতে হতো। কিন্তু সমাজ তা মানবে কেন? একজন কর্মজীবী মায়ের যন্ত্রণা একুশ শতকেও সমাজ বুঝতে অক্ষম, আর সেখানে কমলা তো বহু আগের সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে এসেছেন। প্রচলিত পথের দিকে না গিয়ে কমলা তার নিজের মতো করে তার মাতৃত্ব উপভোগ করেছেন। সমাজের যে যে বিধিনিষেধ তাকে কষ্ট দিয়েছে সব নিয়েই তিনি লিখেছেন ‘উল্টি সুল্টি আম্মা’ বাংলায় যে বইয়ের নাম দাঁড়ায় ‘উল্টাপাল্টা আম্মা’। ভিন্ন মায়ের গল্প, ভিন্নভাবে স্থান পেয়েছে তার হাতে। সমাজ মেয়েদের মাতৃত্বকে কীভাবে দেখতে চায় সে নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে দিয়েছেন তিনি। বইটিতে মূল চরিত্রে ছিল মিতুর মা। মিতুর মা তার মাথায় পাজামা পরতেন আর রাতের খাবারের মেন্যুতে যোগ করতেন সকালের নাস্তা। কিন্তু এত উল্টোপাল্টা ঘটনার পরেও মেয়ে মিতুর জন্য মায়ের ভালোবাসা ছিল অবিচল। বইয়ে কমলা দেখিয়েছিলেন এই নিঃশর্ত ও বিশুদ্ধ ভালোবাসাই মাতৃত্ব।  লিঙ্গ সহিংসতার বিচারের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশই কঠোর শাস্তির বিধান করেছে। কিন্তু কঠোর শাস্তি দিয়ে কি আর ভেতরের চিন্তাধারা বদলে দেওয়া যায়? নারী নির্যাতন আইনের বেশিরভাগ ধারাই জামিন অযোগ্য। এ বিষয়ে কমলা ভাসিনের মতামত চাওয়া হলো। তিনি জানালেন, আমি শাস্তিতে বিশ্বাস করি না। যদি শাস্তি দিয়ে অপরাধের সমাধান করা যায় তাহলে আমাদের দেশে কোনো অপরাধই হওয়া উচিত নয়। মানুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত ও সংশোধনের ব্যবস্থা করা উচিত। লিঙ্গের ন্যায়বিচার আপনি আদালতে করতে পারবেন না। প্রথমেই আপনাকে বাড়িতে নজর দিতে হবে। অসম সমাজ সহিংসতার জন্ম দেয়। নিজেদের সংশোধনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হবে। অপরাধ ও প্রতিশোধ নিয়ে মানুষের আরও স্পষ্ট বোঝাপড়া দরকার।  ভারতীয় উপমহাদেশে একটি জনপ্রিয় ধারণা নারীবাদ পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত। এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন কমলা। ভারতীয় নারীবাদের শেকড় তার নিজস্ব সংগ্রাম ও দুর্দশায়। কমলা ভাসিন কোনো নারীবাদী বই পড়ে নারীবাদী হননি। তিনি তার সামগ্রিক বেড়ে ওঠা বোঝাপড়ার জায়গা থেকে নারীবাদী হয়েছেন। ফলে একটি বৃহত্তম

প্রাকৃতিক বিবর্তনের অংশ হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীবাদী হিসেবে তার পথচলা। কমলা বারবার জোর দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কারণ ছাড়াই যারা নারীবাদবিরোধী তাদের বোঝানো সম্ভব নয়। আমরা স্বাধীনতা চাই, সমতা চাই সমাজের বেশিরভাগ মানুষই নারী স্বাধীনতার পক্ষে নয়।

জাগরী

১৯৮৪ সালে নারীসম্পদ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে জাগরী। এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ৭ জন। আভা, গৌরী, কমলা, মঞ্জুরী, রুনু ও সেবা মিলিতভাবে একটি সক্রিয় নারী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। মতবিনিময়ের জন্য তৎকালীন কোনো সংগঠনই জাগরীর মতো শক্তিশালী ছিল না। প্রতিষ্ঠার পর প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে সামনে হাজির হয় জাগরী। নারীর যৌনতা, নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, রেলে নারীদের নিরাপদ ভ্রমণ, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরোধিতাসহ খুঁটিনাটি নানা বিষয়ে জাগরী ভারতে হইচই ফেলে দিয়েছিল। প্রতি দু-বছর পরপর একটি বার্ষিক সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হতো। নারীর ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারীর পক্ষে নিয়মিত লড়ে গেছে। জাগরীর একটি সহকারী প্রোগ্রাম হিসেবে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী নেটওয়ার্ক সাংগাত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কমলা ভাসিন এর সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং

কমলা ভাসিনের আরেক কাজ ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং। পৃথিবীতে প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন নারী তার জীবদ্দশায় পারিবারিক সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের শিকার হন। যার কারণে জন্ম নিয়েছে ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’-এর মতো সামাজিক আন্দোলন। ২০১২ সালে ভালোবাসা দিবসে এ আন্দোলনের সূচনা হয়। এটি কোনো দেশের একক আন্দোলন নয়। বিশ্বের সব দেশের নারী, ট্রান্সজেন্ডার ও অন্যান্য জেন্ডারের মানুষের প্রতি একাত্মতা দেখিয়ে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে দলের সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন আর নাচগানের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতার প্রসার ঘটান। কভিড-১৯ মহামারী বছর হিসেবে পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। বেশিরভাগ মানুষই জাতি লিঙ্গ শ্রেণির কারণে নিপীড়িত হয়েছেন। ২০২১ সালে তাদের প্রতিপাদ্য ছিলরাইজিং গার্ডেন বা বাগানের মতো বেড়ে ওঠ। বাগানের বিভিন্ন গাছ যেমন একে অপরকে প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে, একটি গাছ অসুস্থ হলে অন্য গাছ যেভাবে শেকড় বাড়িয়ে তার টিকে থাকার পথে পাথেয় হয়ে দাঁড়ায় ঠিক সেভাবেই নারী ও প্রান্তিক জেন্ডারের মানুষেরা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করবে এমনটাই আশা তাদের।