ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অনুসারে সেখান থেকে বিভিন্ন বিষয়ে সব মিলিয়ে মোট ১৭টি জার্নাল প্রকাশিত হয়। এই ১৭টির মধ্যে একটির সামান্য বা নন-জিরো ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর আছে। সেটি হলো ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অফ ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস এবং এর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হলো ০.৩০৬! বাকি ১৬টির মধ্যে ২০১০ সাল থেকে ৫টির কোনো ইস্যুই বের হয় না। ১টির কোনো ওয়েবলিংক নেই। আর ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অফ সায়েন্স এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অফ স্ট্যাটিসটিক্স যথাক্রমে প্রায় ৬৮ বছর এবং ৫২ বছর যাবৎ প্রকাশিত হচ্ছে। এই দুটি জার্নাল যে এত বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে, কখনো কি এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে এর আসলে ইমপ্যাক্ট কী বা কতটা? সমাজ কিংবা দেশের উপকারের কথা বাদই দিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং বৃদ্ধিতেও কি কোনো প্রভাব ফেলতে পেরেছে এসব জার্নাল? ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শততম বর্ষে তাই এই প্রশ্ন করাই উচিত যে, এসব জার্নাল প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা খরচ ছাড়া আর কোনো লাভ কি হচ্ছে? শুধুই কি টাকা খরচ? এসব জার্নালের প্রকাশের জন্য যে গবেষকরা গবেষণা করছেন কিংবা এসব আর্টিকেল লিখছেন তাতে কি বিপুল শ্রম ঘণ্টার অপচয় হচ্ছে না? কাগজের অপচয় হচ্ছে না? এসব জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেল কেউ ‘সাইট’ করা তো দূরে থাক পড়ে দেখে কি? তাহলে লাভ তো হচ্ছেই না, উল্টো অর্থ ও শ্রমঘণ্টার ক্ষতি হচ্ছে অনেক। এসব ছাড়াও আরেকটা সূক্ষ্ম ক্ষতি আছে। সেটা কি জানতে চান?
এই জার্নালগুলো আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রমোশনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্টিকেল ম্যানুফ্যাকচারিং মেশিন ছাড়া কিছুই নয়। অনেকে আবার অসংখ্য আর্টিকেল প্রসব করে নিজেকে বড় বিজ্ঞানী প্রমাণের জন্য লিখে দেন, দেশি-বিদেশি জার্নালে আমার অর্ধশতাধিক কিংবা শতাধিক আর্টিকেল আছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে ওসবের অধিকাংশই নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন জার্নালগুলোতেই প্রকাশিত। চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে আবার এমন নিয়ম করা হয়েছে, যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রকাশনা সহজ হয়। ধরুন অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কেউ একজন একটি আর্টিকেল লিখেছে এবং তিনি সেটা ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অফ সায়েন্সে প্রকাশ করতে চান। কিন্তু তিনি সেখানে প্রকাশনার জন্য জমাই দিতে পারবেন না, যদি না লেখকদের অন্তত একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না হন। তাহলে তিনি বা তারা কী করবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে গিয়ে অনুরোধ করবেন তিনি যেন একজন ‘কো-অথর’ বা সহ-লেখক হন। তাহলে কিছুই না করে হয়ে গেল না একটি আর্টিকেল? সাম্প্রতিককালে এই হালেই পৌঁছে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও জার্নালগুলোর হাল-হকিকত।
পৃথিবীতে এখন মোট প্রায় ৩৪,১০০ জার্নাল প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই প্রকাশিত হয় প্রফেশনাল সোসাইটি; যেমন আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি, আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি, ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্স, আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্স ইত্যাদি থেকে। বাকিগুলো প্রকাশিত হয় বড় বড় পাবলিশিং কোম্পানি থেকে। যেমন Elsevier, Springer ইত্যাদি কোম্পানি। আর খুবই খুবই স্বল্পসংখ্যক জার্নাল প্রকাশিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন পরিস্থিতি পাবেন না বললেই চলে; যেখানে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালগুলোতে নিজেরাই এডিটোরিয়াল বোর্ডে থেকে জার্নাল প্রকাশ করেন এবং সেখানে নিজেদের শিক্ষকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে আর্টিকেল প্রকাশ করা হয় আর সেসব কৃতিত্ব ব্যবহার করে প্রমোশন নেওয়া হয়। শুধুই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটা পাবলিক এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও জার্নাল প্রকাশিত হয়। জার্নাল প্রকাশ যেন প্রেস্টিজের ব্যাপার। দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোর এসব জার্নালে কারা এবং কেন আর্টিকেল প্রকাশ করছেন? কারা এসব আর্টিকেলের পাঠক? আর এতগুলো জার্নাল পরিচালনার জন্য যথেষ্ট গবেষক ও রেফারি কি বাংলাদেশে আছেন? এগুলো চলে কারণ এগুলো হলো আমাদের শিক্ষকদের প্রমোশনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আর্টিকেল প্রকাশের ফ্যাক্টরি। গত বছর থেকে এই বছর জার্নালের মান বৃদ্ধি পেল কি না এসব দেখার যেন কেউ নেই। যেহেতু প্রমোশনের ক্ষেত্রে এসব জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেল আর বিশ্বখ্যাত ‘নেচার’-এর জার্নালগুলোতে প্রকাশিত আর্টিকেলের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না, সেহেতু শিক্ষকরা কেন ভালো জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশ করার প্রচেষ্টায় অতিরিক্ত চাপ মাথায় নিতে যাবেন?
আবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ৫০টিরও বেশি রিসার্চ সেন্টার বা গবেষণা কেন্দ্র। এসব যদি সত্যিকারের গবেষণা কেন্দ্র হতো তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং-এ অন্তত ২০০-র মধ্যে থাকত। এই ৫৬টি গবেষণা সেন্টার বা ব্যুরোকে বছরের পর বছর বাজেট বরাদ্দ দিয়ে জার্নালগুলোর মতো বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। এটাও সম্ভবত একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৬টি গবেষণা কেন্দ্র আছে। বৈশ্বিক তালিকায় প্রথম দুইশতের মধ্যে থাকা আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো রিসার্চ সেন্টার আছে কি না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অথচ বিশ্ব র্যাংকিং-এ টেনেটুনে ১০০০-এ থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে! আর এসব গবেষণা কেন্দ্র বাঁচিয়ে রাখার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। এসব রিসার্চ সেন্টারগুলোর বেশিরভাগই যদি সত্যি সত্যিই কোনো কাজে না লাগে তাহলে এক্ষুনি সেসব বন্ধ করে দেওয়াই উচিত বলে মনে হয়। একইভাবে সত্যিকারের গবেষণাপত্র প্রকাশে কোনো ভূমিকা না থাকলে এসব নামকাওয়াস্তের জার্নালগুলোও এক্ষুনি বন্ধ করে দেওয়া উচিত বলেই মনে হয়। অন্যদিকে, এসব নামকাওয়াস্তের জার্নাল থাকার কারণেই কিন্তু আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সহজে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে সহজে পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছেন। ফলে ভালো মানের গবেষণা করার জন্য তাদের যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতো সেটা আর হতে হচ্ছে না। পদার্থবিজ্ঞানে কাজের একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে। কাজের জন্য বল বা চাপ (প্রতি একক ক্ষেত্রফলে চাপের পরিমাণ) এবং সরণ দরকার। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের সরণ ঘটাতে হলে গবেষণার দিকে চাপ প্রয়োজন। এই চাপ শূন্য হলে সরণও শূন্য হবে, ফলে কাজও শূন্য। এই চাপ না থাকার কারণে দেশে ভালো মানের গবেষক তৈরি হচ্ছেন না।
একটা প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাটাই এমন হওয়ার কথা যেন ‘প্রমোশনের বার’ অনেক ওপরে থাকে। সেই বার উৎরাতে যেন চ্যালেঞ্জ অনুভব করতে হয় এবং কেউ সেটা উৎরাতে পারলে যেন তাকে যথোপযুক্ত রিওয়ার্ডই দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত গবেষণার এমন পরিস্থিতির অবর্তমানে আসলে কি গবেষক নামের ‘অভিনেতা’ই তৈরি হচ্ছে না? একেক জন বড় বড় গবেষক হওয়ার ভান করে বেড়াচ্ছেন যা নতুন প্রজন্মের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছে। তাই এসব জার্নাল ও গবেষণা কেন্দ্র বিলুপ্ত করে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ভালো মানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন এবং কেউ ভালো গবেষণা করে একটা ভালো জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশ করতে পারলে তাকে প্রণোদনা দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (বুয়েট) সম্প্রতি একটি নিয়ম করেছে। ভালো মানের জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশিত হলে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গবেষককে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও সম্প্রতি একটা নিয়ম করেছে। কিন্তু সেটা কেবল অনলাইন জার্নালে প্রকাশের ক্ষেত্রে যে খরচ লাগে সেটা দেওয়ার জন্যই। এদেশের গবেষকরা এখন কোনো প্রণোদনা বা পুরস্কার পাচ্ছেন না। কিন্তু আমাদের সময় এসেছে কিছু ভালো কাজ করে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান বাড়িয়ে আগামী প্রজন্মকে গবেষণামুখী করার। উন্নত হওয়ার এটাই সবচেয়ে সেরা পথ। গবেষণা একটি কঠিন কাজ। গবেষণা করাই যথেষ্ট না। সেটি dissemination বা প্রচারের জন্য জার্নালেও প্রকাশ করতে হয়। যত ভালো জার্নাল তত বড় যুদ্ধ। অর্থাৎ আর্টিকেলটি যারা রিভিউ করবে সেই রেফারিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। বিশ্বখ্যাত জার্নাল ‘নেচার’ কিংবা ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশের জন্য জমা দেওয়া ৯৩ শতাংশ আর্টিকেলই রিজেক্টেড বা প্রত্যাখ্যাত হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালগুলোতে রিজেকশন রেট প্রায় শূন্য। হবেই বা না কেন? এর এডিটোরিয়াল বোর্ডে থাকেন ডিন। আর ডিন হতে শিক্ষকদের ভোট লাগে। যেখানে ভোট সেখানে কি কোনো ভোটারকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়?
আসলে হাই রিজেকশন রেটই হলো গবেষণা জার্নালগুলোর প্রেস্টিজ সিম্বল। সে জন্যই ভালো একটি জার্নালে কারও একটি আর্টিকেল প্রকাশের একসেপ্টেন্স চিঠি এলে তখন খুশিতে কাটখোট্টা গবেষকরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে সেটা জানান দেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো জার্নালে কোনো আর্টিকেল প্রকাশ করে কোনো শিক্ষককে আজ পর্যন্ত ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সেই খুশির বার্তাটি সবাইকে জানাতে দেখেছেন? কখনো না। যাক এইটুকু লজ্জাবোধ তো আছে!
গবেষণা একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার। এর জন্য গবেষণার পরিবেশ দরকার, গবেষকদের প্রণোদনা বা উৎসাহ দানের ব্যবস্থা দরকার। ভারতে অনেকগুলো আইআইটি (ওওঞ) আছে। সেই সেরাগুলোর মধ্যে সেরা প্রতিষ্ঠানটি হলো আইআইটি-মাদ্রাজ। এই প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রসংখ্যা হলো ১,৭২৬ জন। এই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানটির চলমান বাজেট প্রায় এক হাজার কোটি রুপি। অর্থাৎ প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা হলো ৩৫ হাজারেরও বেশি যা আইআইটি-মাদ্রাজের ২০ গুণেরও বেশি। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কত? বড়জোর ৮০০ কোটি টাকা। পার্থক্য বুঝতে পারছেন? আর আইআইটি-মাদ্রাজের গবেষণা বরাদ্দ কত? ৫০০ কোটি রুপি কেবল আইআইটি-মাদ্রাজের স্পন্সর্ড রিসার্চ বাজেট। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাজেট বরাদ্দ তো আছেই। দেশে উচ্চশিক্ষার কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছাতে চাইলে জেলায় জেলায় নামমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে স্বল্পসংখ্যক সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলায় সর্বশক্তি বিনিয়োগ করা দরকার। সেখানে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করুন, তাদের যথোপযুক্ত বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দিন, ভালো মানের গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত অ্যাওয়ার্ড-রিওয়ার্ড দিন। তাহলেই দেশে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় দীক্ষিত একটা আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা একদিন সত্যিকার অর্থেই উন্নত একটি দেশ গড়ে তোলার সামর্থ্য অর্জন করবে।
লেখক অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
khassan@du.ac.bd