ম্যাকফারসন লাইব্রেরি

বাগেরহাট শহরে সম্ভবত এই একটি স্থাপনা এখনো পর্যন্ত বহন করে চলেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভার। চার দশক আগে যে দিনগুলোতে সেখানে এক একটি বিকেলে সবে ঢুঁ দেওয়ার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু কোনো বই নেওয়ার মতন অবস্থা হয়নি, কিংবা তখন জানি না কী করে সেখানকার সদস্য হতে হয়, সে সময় থেকে বহুদিন পর্যন্ত আমাদের কাছে এই প্রশ্ন একবারও ওঠেনি, কে এই ম্যাকফারসন। কেন তার নামে এই লাইব্রেরি। অবশ্য সেই ঔপনিবেশিক কেতার পুরনো ছোট্ট একতলা ঘেরা টানা বারান্দা ও ভেতরে দুটো বড় ঘর, সামনে আরও ছোট একটি ঘাসের আঙিনা, এই ভবনের ওপরে ইটে খোদাই করা ওই সাহেব মশাইয়ের নামের সঙ্গে আরও একটি দেশি নাম জুড়ে দেওয়া ছিল। কিন্তু আমাদের মুখে সে নামটি ফিরত না, আমরা প্রচলিত নামটাতেই অভ্যস্ত ছিলাম। আরও এক জায়গায় উল্লেখ ছিল। তা দেখেছি সদস্য হওয়ার ফরমটি হাতে নিয়ে। সেখানে ওপরে লেখা : ম্যাকফারসন লাইব্রেরি ও পূর্ণচন্দ্র রিডিং রুম। কোনো বয়স্কজন জানিয়েছেন, পূর্ণচন্দ্র ছিলেন স্থানীয় একটি অঞ্চলের জমিদার। ওই ইংরেজ সাহেবের সঙ্গে মিলে এই জায়গা আর লাইব্রেরি ভবনটি স্থাপনের জন্য অনুদান দিয়েছিলেন। হয়তো সে গল্পগাছার ওখানেই শেষ নয়। সেই ঔপনিবেশিক শাসনের কাঠামোগত কায়দা-কৌশল সম্পর্কে পরে যখন খানিক ধারণা করা গেল তখন জানলাম অথবা আমাদের বোধে কুলালো যে, হয়তো একটি পাঠাগারের অনুমোদন দিয়েছেন ইংরেজ রাজের ওই সরকার বাহাদুর আর আর্থিক বিষয়টি দেখভাল করেছিলেন স্থানীয় জমিদার। জমিদারদের তৈরি করে দেওয়া এমন স্থাপনার নমুনা এই শহরে আরও আছে। কিন্তু এটির ক্ষেত্রে অনুমোদনের প্রশ্নে হয়তো ওই ইংরেজের নামটা মাথায় রেখে লাইব্রেরি ভবনটি ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে গেছে। সত্যি, এইটুকু আমাদের প্রজন্মের সবারই ওই পাঠাগারটির প্রাথমিক ঠিকুজি-কুলজি সম্পর্কে ধারণা।

তাতে কী! নদীর তো নাম সব সময়ে জানা জরুরি নয়। আবার জানলেও তার উৎস ইত্যাদি সম্পর্কে যা একেবারেই ঠিকঠাক সব কিছু জানাশোনা থাকতে হবে, তাও হয়তো নয়। তেমনি, হোক উপনিবেশ বাংলার এক শাসকের নাম বহনকারী এই প্রতিষ্ঠান, সে হিসাব-নিকাশের চেয়ে আমাদের কাছে জরুরি ছিল এর ভেতরের যে অসাধারণ গ্রন্থ সাম্রাজ্য সেখানেই। সে সাম্রাজ্যে আজকের সময়েও বাংলাদেশের সেই দক্ষিণতম প্রান্তের একটি জনপদের বিষয়টি মাথায় রাখলে অসাধারণ! প্রায় একশো বছর আগে যারা এটি স্থাপনের প্রাথমিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের গ্রন্থপ্রীতি আর পড়াশোনার আকাক্সক্ষার কথা ভাবলে সত্যি বিস্মিত হতে হয়। এমনিতে ইংরেজ সরকার প্রতিষ্ঠিত যে কোনো পাঠাগারে তৎকালীন রীতি অনুযায়ী এলিজাবেথীয় ও ভিক্টোরীয় যুগের কাব্য-উপন্যাস ও নাটকে ভরপুর থাকবে, এ কথা যাদের লাইব্রেরি সম্পর্কে সামান্য ধারণা আছে তারা জানেন। পাশাপাশি ইংরেজিতে অনূদিত প্রচুর গ্রিক সাহিত্য, বিশেষত নাটক ও মহাকাব্য ইত্যাদি আর দর্শন ও সমাজবিদ্যার বইপত্র সেখানে সুলভ হবে। আমাদের যতদিনে সেখানে যাতায়াত শুরু হয়েছে, তখন ওসব বই ওপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ, সেই একতলা দুই কামরার ভবনটির সারি সারি বুক শেলফের ওপরে ছাদ ছুঁয়ে টানা শেলফগুলো ওসব পুরনো বইয়ে ভরা। সেগুলো একে তো ব্যবহার অযোগ্য আর ইংরেজি উপন্যাসের পাঠক আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরে প্রায় নেই। (সে সময়ে ইংরেজিতে অনূদিত বিভিন্ন ভাষার যেসব উপন্যাসের জয়জয়কার শুরু হয়েছে, সেগুলো স্বাভাবিকভাবে এই লাইব্রেরিতে আসবে না; দেশের বইয়ের বাজারেও আর আনাগোনা কম, ডলারের বিপরীতে তখন সেগুলোর দামও ধরা ছোঁয়ার বাইরে।) একটি ক্যাটালগ খাতায় ওই বইগুলোর তালিকা থাকত। কখনো কখনো অন্য ক্যাটালগ খাতা বাদ দিয়ে অথবা নিজের জন্য প্রয়োজনীয় খাতাটা না-পাওয়া গেলে, আমরা সবান্ধব ওই খাতাটাও উলটে দেখেছি। সেখানে অনেক বই লেখকের নাম আমাদের পরিচিত। সবই সেবা প্রকাশনীর অনুবাদের কল্যাণে। ওপরে আরও কিছু বইও উঠিয়ে রাখা ছিল। বাংলা ভাষার উনিশ শতকের প্রধান লেখকদের। এই লাইব্রেরি যখন স্থাপন করা হয়েছিল সে সময়ে আনা হয়েছিল। সেখানে ঈশ্বরচন্দ্র, মধুসূদন, নবীনচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, মীর মশাররফ, দীনবন্ধু মিত্রসহ আমাদের সময়ে যে লেখকরা প্রায় অপরিচিত ও অপঠিত তাদের আনাগোনা। হয়তো সেখানে থাকতে পারে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের বইপত্রও। কিন্তু তার বইগুলো বাংলাদেশের অননুমোদিত সংস্করণ এই লাইব্রেরিতে ঢাকা থেকে আসত। বাকিদের বইগুলোতে সাধারণ পাঠকের তেমন আগ্রহ ছিল না, থাকারও কোনো কারণ নেই। তবে এই লাইব্রেরি ভবনের রাস্তার উলটো দিকে কোনায় পোস্ট অফিস, এর সামনের মেইন রোডের পরই ভৈরব নদ। শহরবাসী তাকে দড়াটানা নামে ডাকে। এই পোস্ট অফিসে একসময়ে পৌঁছত মাইকেল মধুসূদনের চিঠি, তখন মহকুমা-শাসক তার বন্ধু গৌরদাস বসাক। খুলনায় কাজ করতেন বঙ্কিমচন্দ্র, তার দাপ্তরিক পত্রও এই ডাকঘরের অলিন্দে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তাদের পুরনো সংস্করণের বইগুলো তখন ওপরে তোলা, আর হাতে নিয়ে পড়ার মতন অবস্থায় নেই সেগুলো।

সেই আশির দশকের মাঝামাঝি সময়টা তখন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের পাঠের জগৎ প্রায় পুরোটাই দখল করে নিয়েছে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেডের বইগুলো। বিশেষত তখন দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত উপন্যাসগুলোর গ্রন্থ সংস্করণ। একটু একটু করে পিছিয়ে যেতে শুরু করেছেন বিমল মিত্র আর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। এমনকি শংকরও। ঢাউস বই সেভাবে লেখেননি বলে সমরেশ বসুও সে দলে। এ প্রায় সেবা প্রকাশনীর সিরিজ বইয়ের মতন কায়দা। কলকাতা থেকে এলে দাম বেশি পড়বে, কলকাতায় ছাপা কিন্তু বাংলাদেশের একটি প্রকাশনীর নামে সে বইগুলোই পাঠকদের কাছে ভীষণ আকর্ষণীয়। বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন যারা পড়েন, তার ঠিক মাধুকরী-দূরবীনের পাঠকের মতন ‘আধুনিক’ নন। এমন একটি অবস্থা আরকি। ‘সেই সময়’-এর ঐতিহাসিকতার পাঠই প্রায় বেঙ্গল রেনেসাঁর একটি ভাষ্য হিসেবে খসড়া মান্যতা পাচ্ছে। পূর্ব-পশ্চিম তখনো বের হয়নি। উত্তরাধিকার উজিয়ে অনিমেষ মাধুরীলতার রোমান্টিকতার মোড়কে নকশালবাড়ির ছদ্মবিপ্লবের এক বিপ্লবহীনতার কালবেলার সেই শুরু। সামরিক জান্তা সিপাহসালারের বিরুদ্ধে সেøাগান তখন জরুরি, কিন্তু একদিন তার গদিচ্যুতি যে বিপ্লবহীনতা আর লুম্পেন পুঁজির সর্বগ্রাসী দশার অনন্ত এক কাল রচনা করবে সেকথা তো দেবতাও ন-জানি। সত্যিকার অর্থে এর বাইরে পশ্চিম বাংলার কথাসাহিত্যের অস্তিত্ব তখন আমাদের সামনে প্রায় ছিল না। সেখানে শ্যামল দেবেশ প্রফুল্ল সন্দীপনের কোনো বই দেখিনি। অমিয়ভূষণ-কমলকুমার, অসম্ভব। তবে রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর আর বারোঘর এক উঠোন নামক একটি বইয়ের জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী ছিলেন।

সেই বিপুল উৎসাহী গ্রন্থরাজির ফাঁকে, ইমদাদুল হক মিলন আর হুমায়ূন আহমেদের বইপত্র সাধারণ ও সব পড়–য়া পাঠকের উৎসাহের জগৎ সবে ছুঁয়েছে। এইসব দিনরাত্রি নাটকের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদও জনপ্রিয় হতে শুরু করলেন। পূর্ব দিন পূর্ব রাত্রির শওকত আলীও। না, প্রদোষে প্রাকৃতজনের শওকত আলী নন। সে বই তখনো হাতে ঘোরার অবস্থায় আসেনি। এছাড়া দেশের অন্য লেখকরা পূর্বজ কথসাহিত্যেকরা তো আছেন। তবে মোটামুটিভাবে ওই তিনজন পঠিত হতেন বেশি, কিছু দিন পরে যুক্ত হন মঈনুল আহসান সাবের। বাকিরা প্রায় সবাই, যেমন শওকত ওসমান, রশীদ করীম, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, রিজিয়া রহমান, দিলারা হাশেম বা সদ্য প্রকাশিত চিলেকোঠার সেপাইয়ের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পঠিত হন একেবারে নির্দিষ্ট পাঠকের কাছে। তবে এর পাশাপাশি মাসুদ রানার পাঠক ছিল সবাইকে ছাড়িয়ে। কিংবা সেবা প্রকাশনীর যে কোনো বই। লাইব্রেরি বাদেও, শহরের তখনকার একমাত্র সংবাদপত্রের স্টলে সেবা প্রকাশনীর বই আসত এত পরিমাণে যে এখনকার দিনে এত এত প্রচার, এত বিপণন কৌশলের পরেও সেই সংখ্যা ভীষণ বিস্ময়কর! কী যে উঠে গেছে, পড়াশোনা না বিপণন, নাকি গোটা বিষয়টাতেই ভীষণ ওলট-পালট ঘটেছে। নাকি ওই মফস্বলের কিশোর-তরুণদের কাছে তখন লাইব্রেরি ছিল একটি সত্যিকারের বিনোদন কেন্দ্র। আজ যাকে বিনোদন বলতে বুঝি কোনোভাবেই সেই অর্থে নয়। পড়ার আমোদ আর আনন্দের জায়গা হিসেবে। বই পাঠ তখন আনন্দ ও বিনোদনের বিষয়, পরস্পরের সঙ্গে তা নিয়ে কথা বলে ভাগাভাগি করে নেওয়ার বিষয়। একটু আগে কয়েকটি বা কিছু বইয়ের পাঠককে হুড়মুড়িয়ে পড়ার কথা বলা হলো, আজ তো সেই হুড়মুড় করে পড়ার কোনো পাঠক, কিংবা পাঠক প্রজন্মই যেন নেই। যাদের অপেক্ষা থাকত নির্দিষ্ট বইটির জন্য। ভেতরে অস্থিরতা কবে একমাত্র বই আসার জায়গা এই ম্যাকফারসন লাইব্রেরিতে আসবে সেই বইটি। শহরে বইয়ের দোকানদাররা বই বলতে তো ক্লাসের বই-ই বোঝেন। এর ফাঁক গলে কখনো কখনো অন্য বইও আসে। সে অতি সামান্য। ভারতীয় বই, কালেভদ্রে। কাছের বিভাগীয় শহরেই তা পাওয়া যায় না সেভাবে। পাওয়া গেলেও বড়রা বলে নাকি তিনগুণ দামে তা কিনতে হয়। এই যেখানে অবস্থা, সেখানে ম্যাকফারসন লাইব্রেরিই আমাদের সেই কালকে এক সূত্রে বেঁধে দিয়েছিল। ফলে, এখন সেই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে, রবীন্দ্রনাথের লাইব্রেরি প্রবন্ধের সেই বিখ্যাত প্রথম বাক্যটি ঘুরে ফিরে সামনে আসে। আমাদের জন্য শত বৎসর নয়, একটি কি দুটি দশকের আগে পরের কল্লোলকে সে একখানে করে বেঁধে রেখেছিল। সেই বন্ধনের একমাত্র যোগসূত্র ওই ম্যাকফারসন। অন্য নাম পূর্ণচন্দ্র। অর্থাৎ পূর্ণিমা। সে রাতের আকাশে তার প্রকাশ বা বিকাশ ঘটিয়ে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ুক কি নাই পড়ুক, চেষ্টার ত্রুটি তার ছিল না।

বিকেল পৌনে পাঁচটা নাগাদ একদল কিশোর-কিশোরী ওই চত্বরে উপস্থিত। পাঁচটায় খোলা হবে। একটু বাদেই আসবে আজকের একগাদা সংবাদপত্র, তাই বড়রাও কেউ কেউ আছেন। এই সময়ে অপেক্ষা, আসবেন লাইব্রেরিয়ান হালদার ফজলুর রহমান। আমাদের ফজলু স্যার। সাইকেল থেকে নেমে প্রথম গেটের তালা খুললেন, এরপর মূল ভবনের। তার পেছনে সবাই প্রায় এক সঙ্গে ঢুকে পড়া। এমন ছিল ওই পাঁচটার সময়ের ম্যাকফারসনের সামনের বিকেল। দিনে দিনে সামনের আঙিনা নিয়ে সেখানে দোতলা, দোতলায় লাইব্রেরি, আয়তনে দ্বিগুণ। ফজলু স্যার গত পঁয়তাল্লিশ বছরে কোনোদিনই এখানে ঠিক সময়ে আসেননি এমন প্রায় ঘটেনি। ছোট্ট শহরের ম্যাকফারসনের লাইব্রেরির সঙ্গে তার নামটাও সমার্থক হয়ে গেছে। কিন্তু পড়ুয়ারা যে আসেই না আর। ফজলু স্যার ঠিকই লাইব্রেরি খুলে বসে থাকেন!

লেখক কথাসাহিত্যিক

prasantamridha@gmail.com