সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের সিংহভাগ (৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ) অধিগ্রহণ করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অন্যতম শীর্ষ ওষুধ উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। বাংলাদেশে ৬২ বছরেরও বেশি সময় ওষুধ উৎপাদনে থাকা সানোফি অধিগ্রহণের ফলে বেক্সিমকো ফার্মা ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি পণ্য উৎপাদনে আরও বৈচিত্র্য আনতে পারবে। এখন পর্যন্ত সানোফিসহ দেশের দুটি বহুজাতিক কোম্পানি অধিগ্রহণ করল বেক্সিমকো ফার্মা। এর আগে ২০১৮ সালে নুভিস্তা ফার্মা (আগের নাম অরগানন বাংলাদেশ) লিমিটেড অধিগ্রহণ করেছিল বেক্সিমকো ফার্মা।
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধিগ্রহণ বলে জানিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা। সানোফি বাংলাদেশ অধিগ্রহণ উপলক্ষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান, বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ মো. ইমদাদুল হক, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম আলম এবং উভয় কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে সানোফি বাংলাদেশের পাঁচ সদস্যের একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে, যেখানে নাজমুল হাসান পাপন ছাড়াও বেক্সিমকো ফার্মার চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজা ও চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার আলী নওয়াজ, বিসিআইসি চেয়ারম্যান এবং সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
সানোফি বাংলাদেশের বিদেশি শেয়ারগ্রহীতাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফিশনস লিমিটেড ৮ লাখ ৮৬ হাজার শেয়ার এবং মে ও বেকার লিমিটেড তাদের ১০ লাখ ৭৬ হাজার শেয়ার বেক্সিমকোর কাছে বিক্রি করে। প্রতিটি শেয়ার ২ হাজার ৪৪৫ টাকা দরে মোট ৪৮০ কোটি টাকায় বিদেশিদের শেয়ার কেনে বেক্সিমকো ফার্মা।
২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর হিসাব বছরে সানোফি বাংলাদেশের রেভিনিউ ছিল ৩০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ সময় করপূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৪০ কোটি টাকা।
সানোফি বাংলাদেশ হচ্ছে বৈশ্বিক বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সানোফি এসএ’র একটি প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ কেমিক্যাল কোম্পানি মে অ্যান্ড বেকারের অংশ হিসেবে ১৯৫৮ সালে দেশে কার্যক্রম শুরু করে সানোফি বাংলাদেশ। এরপর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের পর ২০০৪ সালে এটি সানোফি-এভেনটিস নামে পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালে নাম পরিবর্তন করে হয় সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেড।
দেশের ওষুধ শিল্পে একটি আস্থাশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবসা চালিয়ে এলেও ২০১৯ সালে হঠাৎ বাংলাদেশ ছাড়ার ঘোষণা দেয় বৈশ্বিক জায়ান্ট সানোফি। তখন থেকেই মালিকানা হস্তান্তরের জন্য সানোফি একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের সন্ধানে ছিল, যারা নৈতিক এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সানোফির পণ্য প্রচারে প্রতিষ্ঠানটির সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারা দীর্ঘ সময়ের জন্য সমুন্নত রাখতে পারবে এবং পাশাপাশি রোগী ও সানোফি বাংলাদেশের কর্মীদের কল্যাণে কাজ করে যাবে। এ ঘোষণার ১৪ মাস পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি শেয়ার হস্তান্তরের জন্য বেক্সিমকো ফার্মার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী সানোফি বাংলাদেশের ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করল বেক্সিমকো। সানোফির অবশিষ্ট প্রায় ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনসের অধীনে রয়েছে।
সানোফি বাংলাদেশের রয়েছে অত্যাধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা। মানসম্মত অ্যান্টিবায়োটিক, সেফালোস্পোরিন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে কোম্পানিটির যা পিআইসি/এস’র অনুমোদনপ্রাপ্ত। টঙ্গীতে বেক্সিমকো ফার্মার কারখানার কাছাকাছি ২৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সানোফি বাংলাদেশের কারখানাটি। প্রধানত বাংলাদেশের বাজারের জন্য প্রায় ১০০টি ব্র্যান্ডেড জেনেরিক পণ্য উৎপাদন করে সানোফি বাংলাদেশ। কোম্পানিটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিকস, ক্যানসার, চর্মরোগ এবং সিএনএস (সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম)-এর ওষুধের জন্য প্রসিদ্ধ। এছাড়া এর বৈশ্বিক ব্র্র্যান্ড থেকে টিকা, ইনসুলিন ও কেমোথেরাপির ওষুধসমূহ সরাসরি আমদানি করে কোম্পানিটি।
সানোফি বাংলাদেশের প্রতিটি শেয়ার ২ হাজার ৪৪৫ টাকায় কিনেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বেক্সিমকোকে এ সংক্রান্ত অনুমোদন দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এছাড়া সানোফির ১৯ লাখ ৬৩ হাজার শেয়ার কেনার জন্য বেক্সিমকোকে সর্বোচ্চ ৪৮০ কোটি টাকা বিদেশে কোম্পানিটির শেয়ারগ্রহীতাদের অনুকূলে পাঠানোরও অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সানোফি অধিগ্রহণ করা বেক্সিমকো ফার্মা গত চার বছর ধরেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। ২০২০-২১ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ৩৭০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। সানোফি অধিগ্রহণ, করোনাভাইরাসের টিকা আমদানির কমিশন ও মুনাফা বাড়ায় গত এক বছরে বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার দর দ্বিগুণ বেড়েছে।
সানোফির শেয়ার অধিগ্রহণ উপলক্ষে বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘বেক্সিমকো ফার্মার ইতিহাসে এই দ্বিতীয় অধিগ্রহণের চুক্তি সম্পন্ন হওয়া আমাদের জন্য এক মাইলফলক অর্জন। আমাদের একটি স্পষ্ট কর্মকৌশল হচ্ছে- বৈচিত্র্য ও প্রসারতা; পাশাপাশি দেশের অন্যতম শীর্ষ ফার্মা কোম্পানি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করা। সানোফি বাংলাদেশের সিংহভাগ অধিগ্রহণ করা সেই কর্মকৌশলের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে প্রধান প্রধান চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান আরও সুসংহত হওয়ায় টেকসই রাজস্ব ও মুনাফার প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সানোফি বাংলাদেশের ৮শ’ দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের আমাদের কর্মী হিসেবে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছি আমরা।’