করোনাকালে মেয়েদের দুর্দশা-যন্ত্রণা বেড়েছে

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মেয়েদের ভালো থাকবার কথা নয়, তারা ভালো নেইও। পুঁজিবাদের সর্বসাম্প্রতিক অবদান করোনার আক্রমণ ও দুঃশাসনের কালে পুরুষের তুলনায় মেয়েদের দুর্দশা ও যন্ত্রণা বেড়েছে বেশি। তালেবানরাও সব পুঁজিবাদীদের মতোই পিতৃতান্ত্রিক, তবে মাত্রায় ও গুণে অধিক উগ্র। বাংলাদেশের মেয়েদের অবস্থা বোঝার জন্য নির্যাতন, হয়রানি, ধর্ষণ, হত্যা ও আত্মহত্যার খবর নিত্যদিন শুনতে হয় আমাদের। এসব খবরের সারমর্মটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রশিল্পী পরীমণির দুর্দশাতে। শ্বাসরুদ্ধকর যে কোনো চলচ্চিত্রের কাহিনী হার মানবে। মেয়েটি প্রতিভাবান, অল্প বয়সে ভালো খ্যাতি অর্জন করেছে, বয়স এখন তিরিশও হয়নি, ভবিষ্যতে নিজের শিল্প-মেধাকে আরও বিকশিত করবে এমনটাই ঘটবার কথা। কিন্তু বাধা এসেছে। প্রচন্ড। চলচ্চিত্রের জগৎ এখন অবশ্য আর আগের মতো নেই। সিনেমা দেখা আগে যেমন একটি সামাজিক ব্যাপার ছিল এখন আর তেমন নেই, লোকে ঘরে বসে একা একাই সিনেমা দেখে। সবচেয়ে দুঃখজনক যে ঘটনা তা হলো চলচ্চিত্র শিল্পে ব্যবসা ও টাকার দৌরাত্ম্য এখন দুর্দান্ত ও অপ্রতিরোধ্য।

পরীমণিদের তাই শুধু নিজের শিল্পীজীবন নিয়েই ভাবলে চলে না, তাদের নানা জায়গায় যেতে হয়; বিশেষ করে ক্লাবে। এসব ক্লাব টাকাওয়ালা ও প্রভাবশালীদের বিনোদন কেন্দ্র। ইংরেজরা যখন এদেশে শাসন-শোষণ করত তখন তাদের কোনো সামাজিক জীবন ছিল না, ক্লাবই ছিল তাদের ভরসা। পরে স্থানীয়রা ক্লাবে যাতায়াত শুরু করে। পাকিস্তানি জমানায় ঢাকা ক্লাব ও চট্টগ্রাম ক্লাব বেশ জমে উঠেছিল। ইংরেজদের ক্লাবে স্থানীয়রা ঢুকতে পারত না। একাত্তরে পাকিস্তানিরা পূর্ববঙ্গে যখন গণহত্যার তান্ডব করেছে তখন ক্লাবগুলোও তাদের একক দখলে চলে যায়। চট্টগ্রাম ক্লাবের দরজায় নাকি তারা নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছিল, ‘ডগস অ্যান্ড বেঙ্গলিজ আর নট অ্যালাউড।’ এখন ঢাকায় ও অন্যত্র যেসব অভিজাত ক্লাব আছে সেখানেও কিন্তু একই ব্যাপার, সাধারণ বাঙালিদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ক্লাবে ঢুকতে হলে সদস্য হওয়া চাই, আর সদস্য হতে নাকি কয়েক লাখ টাকা লাগে। পরীমণিদের এসব ক্লাবে যেতে হয়, নইলে তারা শিল্পী হিসেবে টিকে থাকতে অসমর্থ হবে, পরিণত হবে এফডিসি’র দ্বারপ্রান্তে অপেক্ষমাণ এক্সট্রাতে, তা যতই প্রতিভাবান হোক না কেন। ওইসব ক্লাবে কী সব স্বর্গীয় কা-কারখানা ঘটে তা আমাদের অজানা, তবে কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে পরীমণি যে মামলা করেছিলেন, এবং যার জন্য তাকে দুর্বিষহ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে তার অভিযোগপত্রে। পরীমণির অভিযোগ মধ্যরাতে তাকে তুরাগ নদীর প্রান্তে স্থাপিত বোট ক্লাবে নিয়ে গিয়ে জোর করে মদ গেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এবং চেষ্টা করা হয়েছিল ধর্ষণের। আশঙ্কা ছিল তাকে মেরে ফেলা হবে।

থানা প্রথমে তার মামলা নিতেই চায়নি, যেমনটা স্বাভাবিক; পরে বাধ্য হয়েছে ফেইসবুকে পরীমণির আকুল আবেদন ছড়িয়ে পড়ার কারণে। যার বিরুদ্ধে তার অভিযোগ সে ব্যক্তি অত্যন্ত ধনবান। ক্লাবে ক্লাবে তার নিত্য যাতায়াত। সে নাকি উত্তরা ক্লাবের সভাপতি ছিল এক সময়ে। সেটা চাট্টিখানি কথা নয়। এখন সে বোট ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বোট ক্লাবের সঙ্গে সাঁতার প্রতিযোগিতা বা নৌকাবাইচের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না; তবে নদী দখল করে ভবন নির্মাণ এবং সেখানে নানাবিধ বিনোদন কর্ম সম্পাদন এসব যে চলে তাতে সন্দেহ কী। ক্লাবে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, আমলা সবারই যাতায়াত। সবাই ধনী। অভিযুক্ত ব্যক্তিটির বয়স দেখলাম ৬৫। কিন্তু স্বভাবে টগবগে যুবক। জানা গেল যে সে আবার জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের সদস্য। জাতীয় সংসদের জরুরি বাজেট অধিবেশন চলছিল, সেখানে তাকে নিয়ে কথাবার্তা পর্যন্ত হয়েছে। জাতীয় পার্টির একজন বলেছেন তিনি শুনেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিটি নাকি একজন ভদ্রলোক ও ভালো মানুষ। এটা তো তার শুধু শুনবার কথা নয়, জানবারই বিষয়। অভিজ্ঞতা থেকে।

তারপরে যা ঘটেছে তাকে অবশ্যই মর্মবিদারক বলা যাবে, কিন্তু অস্বাভাবিক বলা যাবে না। পরীমণি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিন তিনবার তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, যেমনটা সাধারণত ঘটে না। জামিন চাওয়া হয়েছিল, প্রথমবার আবেদন নাকচ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার শুনানির দিন ঠিক হয়েছিল আবেদনের তিন সপ্তাহ পরে। ইতিমধ্যে পরীমণি জেল খাটুক, বুঝুক দুঃসাহসী হওয়ার মূল্য কত। পরীমণির পক্ষে কিন্তু নাগরিক সমাজ সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়নি। মহিলা সংগঠন দুয়েকটি যা এগিয়ে এসেছে তাও বেশ পরে। আর সামাজিক মাধ্যম তো বটেই, গণমাধ্যমও বলা যায় তার ওপর ঝাঁপিয়েই পড়েছে। ধরেই নিয়েছে মেয়েটি অপরাধী; তার শাস্তি হওয়া চাই। নইলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। এবং শাস্তিদানের অভিপ্রায়ে দু’ঘা বসিয়েও দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর এটা যে চলচ্চিত্র জগতের শিল্পী, প্রযোজক, প্রদর্শকদের কোনো সমিতি বিপন্ন শিল্পীটির পক্ষ নেয়নি, বলেছে ওটি তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা তো বটেই, ব্যক্তিই প্রতিবাদ করেছে, এবং দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

এই ব্যক্তিটির অপরাধ একটি নয়, একাধিক। প্রথমত তিনি মেনে নেননি, প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদটা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, সমস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে-ব্যবস্থা নারীকে নিরাপত্তা দেয় না, পারলে হেনস্তা করে। প্রতিবাদটা আসলে চ্যালেঞ্জই, একপ্রকারের। পরীমণির দ্বিতীয় অপরাধ তিনি একজন নারী। এবং যে সমাজে তার বসবাস সেটি নির্মমরূপে পুরুষতান্ত্রিক। তৃতীয় অপরাধ মেয়েটি অভিজাত শ্রেণির নয়, এসেছে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে। তার ওপর আবার পিতামাতাহীন। বিদ্যমান ব্যবস্থা এসব অপরাধ ক্ষমা করবে না। শাস্তি দেয়। পরীমণি কেন পার পাবেন? তাকে শাস্তি পেতেই হবে। পরীমণির ঘটনা সমাজের পঙ্কিল অধঃপতনের দশাটাকে উন্মোচিত করে দিয়েছে, এমন কথা বলা যাবে, বলা হচ্ছেও। তা অধঃপতন তো বটেই, কিন্তু আসল ঘটনা হলো বাস্তবতা। বাস্তবতারই উন্মোচন ঘটেছে। নোংরা ও অসুস্থ এই বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের বসবাস। একালে গণমাধ্যমের শক্তি অপরিসীম। বানাতে পারে, ভাঙতেও পারে। গণমাধ্যম কিন্তু স্বাধীন নয়, ভীষণভাবে ব্যবসার অধীন। ব্যবসা ধনীরাই করে, এবং করে আরও ধনী হয়। করোনাকালেও হয়েছে এবং হচ্ছে। পরীমণি গণমাধ্যমের সহায়তা পাননি, উল্টো বৈরিতা সহ্য করেছেন। তার বিরুদ্ধে ডালপালায় সুসজ্জিত নানা কাহিনী প্রচার করা হয়েছে। তাকে অপরাধী বলে ইতিমধ্যেই সাব্যস্ত করা হয়ে গেছে। এর পেছনে একটা অতিরিক্ত কারণ রয়েছে। সেটা হলো ব্যবসা। মিডিয়া ব্যবসা বোঝে। রমরমা কাহিনী প্রচার করতে পারলে কাটতি বাড়ে পত্রিকার, জনপ্রিয়তা বাড়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার। আর নারীর অপরাধের মতো মনোরঞ্জক খবর আর কী-ই বা হতে পারে?

বাংলাদেশে মাশাআল্লাহ পত্রিকা এখন অনেক, টেলিভিশনও চলছে পাল্লা দিয়ে। এদের সংখ্যা দেখিয়ে মন্ত্রীরা বলেন, বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা না থাকলে এরা টিকে আছে কী করে? বটেই তো। টিকে আছে কী করে? টিকে থাকার মস্ত কারণ সরকার এদের সহ্য করে, অনেক ক্ষেত্রে কাজে লাগায়। মিডিয়া সরকারের মন জুগিয়ে চলে। না-পারলে বিপদে পড়ে যায়। গেছেও। মিডিয়াকে অধীনে থাকতে হয় বিজ্ঞাপনদাতাদের। এবং সর্বক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হয় মালিকের মুখের দিকে। পত্রিকায় অনেক সম্পাদকই এখন আর সম্পাদক নন, পরিণত হয়েছেন মালিকের পাবলিক রিলেশন অফিসারে। অসম্মত হলে পতন ঘটবে। চাকরি হারাবেন। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার’ নামের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি সাংবাদিকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে বাংলাদেশের বিষয়ে তারা বিশ্বকে জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের এবং সাংবাদিকদের অবস্থা আগেও খারাপই ছিল, বর্তমানে আরও খারাপ হয়েছে।

রিপোর্টটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, কিছু সংস্থা বিবৃতি বিক্রি করে থাকে। কিন্তু বিবৃতির ক্রেতা যে কারা সে-বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। বিবৃতি কিনে ক্রেতার কী লাভ তাও জানাননি। সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশ (সরকার-সমর্থক বলে সর্বজন-পরিচিত) অবশ্য আরও একটু স্পষ্টভাষী। তারা জানিয়ে দিয়েছে যে সংস্থাটির প্রতিবেদন ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর, অগ্রহণযোগ্য ও উদ্দেশ্যমূলক। তাদের মতে এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তা ষড়যন্ত্রের কারণটা কী? হতে পারে ঈর্ষা। তথ্যমন্ত্রী তার প্রতিক্রিয়াতে সে-রকম একটা ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তবে সাংবাদিক ইউনিয়ন মনে হয় কিছুটা বিভ্রান্তির ভেতরও পড়ে গেছে। তাই জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আবার এটাও বলেছে, ‘কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কার স্বার্থে এ-রকমের প্রতিবেদন দিয়েছে তা স্পষ্ট নয়’। (প্রথম আলো, ০৭-০৭-২১) প্রতিবেদনটি যারা প্রচার করেছে তাদের কাছে তথ্যের ভিত্তি নিশ্চয়ই আছে, চাইলেই হয়তো পাওয়া যাবে। তবে কার স্বার্থে, এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না। কারণ ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার’-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা কারও কাছ থেকে ঘুষ খেয়েছে এটা যেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়, তেমনি কেউ তাকে ঘুষ দিয়ে বশীভূত করবে সেটাও একেবারেই অসম্ভব। তাছাড়া কে দিতে যাবে ঘুষ, কোন লোভে বা বাংলাদেশের সঙ্গে কোন শত্রুতায়? উন্নয়ন দেখে ঈর্ষা জন্মেছে এই তত্ত্বে তবু আস্থা রাখা যেত যদি বাংলাদেশের উন্নতি গগনচুম্বী হতো। এবং তা অধিকাংশ মানুষের জন্য দুঃখের কারণ না হতো।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়