মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এবার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এজন্য দুটি জায়গায় স্থাপন করা হচ্ছে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এর মধ্য কেরানীগঞ্জে একটি ভাড়া বাসায় অস্থায়ী ভিত্তিতে একটি কেন্দ্র করা হয়েছে। অপরটি স্থায়ীভাবে হচ্ছে মানিকগঞ্জে। সম্পূর্ণ অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হবে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে। উন্মুক্ত থাকবে সর্বসাধারণের জন্য। পরিচালিত হবে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে। এরই মধ্যে কেরানীগঞ্জে একটি ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ওই ভবনে সরঞ্জাম স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতিও ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ওয়েসিস। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে অবস্থিত এ কেন্দ্রটি ৭ অক্টোবর উদ্বোধন করা হবে। এছাড়া চলতি বছরের মধ্যেই মানিকগঞ্জে অন্য কেন্দ্রটি স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু করার কথা রয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
তারা আরও জানান, পুলিশের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র দুটি হবে সম্পূর্ণ অলাভজনক। পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত দুটি প্রতিষ্ঠানই সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। যেখানে উন্নতমানের চিকিৎসা দিয়ে মাদকাসক্তদের সুস্থ করে তোলা হবে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের উদ্যোগে কোলাহলমুক্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে কেরানীগঞ্জের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হচ্ছে। যেখানে দেশের খ্যাতনামা মনোচিকিৎসক থাকবেন। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম, সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ইয়াগো এক্সপার্ট এবং এডিকশন কাউন্সেলের মাধ্যমে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এসি/নন-এসি, টেলিভিশন ও ফ্রিজসহ উন্নতমানের কক্ষ, ২৪ ঘণ্টা মেডিকেল সার্ভিস, ২৪ ঘণ্টা নার্সিং সেবা, স্বতন্ত্র কাউন্সেলিং সেশন, শারীরিক ব্যায়াম ও প্রশিক্ষণ, প্রতি সপ্তাহে আলাদাভাবে বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা, ২৪ ঘণ্টা লিফট, জেনারেটর ও সিকিউরিটির ব্যবস্থা, শিক্ষামূলক ক্লাস এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ থাকছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে ওই প্রতিষ্ঠানটি (কেরানীগঞ্জ কেন্দ্র) চালানো হবে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। ৭ অক্টোবর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য এবং বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। তাছাড়া সেখানে আরও উপস্থিত থাকবেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ।
তিনি আরও বলেন, ‘কেরানীগঞ্জের পর মানিকগঞ্জে আরও একটি অত্যাধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সেখানে ইতিমধ্যে ১০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। আরও জমি কেনা হবে। ওই কেন্দ্রটিতে সুইমিংপুল এবং গার্ডেনসহ নানা ধরনের অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। সম্পূর্ণ অলাভজনক এ সেবা নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। আশা করছি, সফলতার মুখ দেখবে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, সরকারি হিসাবে দেশে ৩৬ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। তাদের মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বছরের তরুণের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু দেশে মাদকাসক্ত মানুষের চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই সীমিত। মাদকে বিপদাপন্ন মানুষ ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা থেকেই পুলিশ মাদক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ওয়েসিসে জনবলের সংখ্যা ৮৫ জন। তার মধ্যে একজন পরিচালক (এসপি পদমর্যাদার), তিনজন সহকারী পরিচালক, চারজন কো-অর্ডিনেটর এবং ২৭ জন নার্সিং অফিসার বা ম্যাট্রন রয়েছেন। এছাড়া হিসাব শাখায় ২, নিরাপত্তা ও রিসিপশন শাখায় ১১, কন্ট্রোল রুমে ৬ এবং প্রশাসন শাখায় জনবল আছে আরও ১৪ জন। পুলিশের অত্যাধুনিক এ মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটির অন্যতম চমক গ্যাস ক্রমোটোগ্রাফি মেডিকেল ইকুইপমেন্ট। এ যন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত ও প্রস্রাব ছাড়াও চুল থেকেও ডোপ টেস্ট করা যাবে। তিন মাস আগেও কেউ মাদক সেবন করে থাকলে তা ধরা পড়বে। দেশে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক এ যন্ত্রটি স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে দ্রুততম সময়ে শতভাগ নির্ভুল রিপোর্ট পাওয়া যাবে।
ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক ডা. এসএম শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাততলা বিশিষ্ট আধুনিক এ মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি খোলা থাকবে ২৪ ঘণ্টা। ৬০ শয্যার এ কেন্দ্রে আছে ২২টি রুম। পুরুষদের জন্য ১৬টি রুমে থাকছে ৪৬টি শয্যা। মহিলাদের ছয়টি রুমে শয্যা থাকবে ১৪টি। ডাবল কেবিন ২৮টি, ট্রিপল কেবিন ১৫টি এবং জেনারেল ওয়ার্ডে আছে ১১টি বেড। এছাড়া জেনারেল ট্রিপল বেড আছে ছয়টি। জেনারেল ওয়ার্ড ছাড়া সব ওয়ার্ড বা কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
তিনি আরও বলেন, ‘মাদকাসক্ত মানুষের কথা মাথায় রেখেই আমরা এ নিরাময় কেন্দ্র চালু করছি। প্রচলিত নিরাময় কেন্দ্রের বাইরে গিয়ে পাঁচতারকা হোটেলের আদলে এ নিরাময়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এর আগে অন্তত ৩০টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেখান থেকে তাদের ত্রুটিগুলো দেখে নতুন করে এ প্রতিষ্ঠান সাজানো হয়েছে। অনান্য মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের থেকে এখানে তুলনামূলক অনেক কম খরচে রোগীরা সেবা পাবেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায়ই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে কেউ চাইলেও আত্মহত্যা করার সুযোগ পাবে না। প্রতিটি কক্ষেই বিশেষ ফ্যান স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে ২০ কেজি ওজনের বেশি কিছু ঝুললেই নিজ থেকেই ভেঙে পড়বে ফ্যানটি। কেউ যাতে বাথরুমে গিয়ে আত্মহত্যা করতে না পারে সেজন্য কোনো বাথরুমেই লক সিস্টেম রাখা হয়নি। বাথরুমগুলোর দরজায় লাগানো হয়েছে ম্যাগনেট। বাথরুমের শাওয়ার হ্যাঙ্গারে রডের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে বিশেষ প্লাস্টিক। তাই শাওয়ার হ্যাঙ্গার ব্যবহার করে আত্মহত্যার সুযোগ নেই। প্রতি তলার সিঁড়িতে আছে বিশেষ লকের ব্যবস্থা। তাই কোনো রোগী ইচ্ছা করলেই একতলা থেকে অন্য তলায় অবাধে চলাচল করতে পারবে না। ওয়েসিস মাদক নিরাময় কেন্দ্রের জানালায় রয়েছে স্বচ্ছ কাচ। জানালার গ্রিল হিসেবে দেওয়া হয়েছে শক্ত নেট। জানালার পর্দাগুলোও জোরে টান দিলে নিচে পড়ে যাবে। এ কারণে পর্দা ব্যবহার করে আত্মহত্যার কোনো সুযোগ নেই। ভবনের ছাদে রয়েছে বাগান। ছাদবাগানে প্রাকৃতিক পরিবেশে খোলা আকাশের নিচে রোগীদের বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইয়োগা এবং মেডিটেশন করার সুযোগ রয়েছে। ষষ্ঠ তলায় নার্সিং স্টেশন ও পঞ্চম তলায় রয়েছে বিশেষ কেবিন ও ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা। চতুর্থ তলায় রয়েছে ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা এবং তৃতীয় তলায় আছে কেবিন ব্লক, ডাইনিং ও বিশেষ নার্সিং স্টেশন। ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রশাসনিক ব্লকের পাশাপাশি থাকছে প্যাথলজি বিভাগও।