(প্রথম কিস্তির পর)
সাতক্ষীরা থেকে পদোন্নতি পেয়ে ‘ঋণং কৃত্বা’-র সেই ভেসপা নিয়ে ২০০০ সালে এলাম দিনাজপুরে। কপালের ফের, সাব-জজ হিসেবে আমার বরাতেই জুটল ‘অর্থঋণ আদালত’! তখন আবার চালু হলো কম্পিউটার কেনার সরকারি ঋণ! ‘কম্পিউটার ক্রয় অগ্রিম’ নামের বাহার, আসলে পুরোদস্তুর ঋণ। ৬০ হাজার টাকা অগ্রিমে সুদ বার্ষিক ১০ টাকা হারে, আসলটা আদায় হবে সমান ৬০ কিস্তিতে মাসিক বেতন থেকে এক হাজার করে টাকা কেটে; ফাঁকে ৫ বছরে সুদ বাড়বে ৩০ হাজার টাকা (আসলের অর্ধেকের সমান), আদায় হবে ৫ কিস্তিতে মাসিক বেতন থেকে ছয় হাজার করে টাকা কেটে! কিস্তি খেলাপ করলেই বার্ষিক ১১ টাকা চক্রবৃদ্ধি হারের ছোবল! (কাবলিওয়ালার চেয়ে কম কীসে!) এই বারে মাফ করেন, হিসাবটা আর কষতে পারছি না! স্কুলে পাটিগণিতের সব পরীক্ষায় ফাঁকি মেরেছি এই চক্রবৃদ্ধি অঙ্ক করার!
সাড়ে নয় হাজারি মাসিক বেতনের অক্ষম ‘সাব-জজ অর্থঋণ’ আমি ৬০ হাজার টাকার ঋণটা নিয়েছিলাম খানিকটা সঙ্গদোষে, বাকিটা সেই ‘ঋণং কৃত্বা’ স্বভাবদোষে। খেলাপি হওয়ার কথা মনেও আনিনি চক্রবৃদ্ধির অঙ্কটা করার ভয়ে! কম্পিউটার কেনার প্রমাণ রসিদ জমা দিতে হবে, টাকাটা অন্য কাজে লাগালে বিভাগীয় ব্যবস্থার ‘ফণাও তোলা’ ছিল মঞ্জুরিপত্রে। নগদায়ন করতেই হলো কম্পিউটার। শর্তের ঠেলায় ঋণের অর্থের সে-কম্পিউটারে নিজের আঙুল লাগাতে লাগাতে আমার লেখা হয়ে গেল প্রথম বই ‘অর্থঋণ আদালত আইনের টুকিটাকি’। ঋণ গ্রাসকারী অক্টোপাসে গিলে খায় সে-আইন, আর ‘অক্ষম নরাধম’ পড়ে ফাঁদে! সেখান থেকে বদলি হয়ে এলাম আইন মন্ত্রণালয়ে। দেখি সঙ্গীরা এখানেও ‘ঋণং কৃত্বা’ করছেন, এবারে ‘গৃহ নির্মাণ ঋণ অগ্রিম’। সরকারি ঋণ পাওয়া যাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, কাটা যাবে ১২০ কিস্তিতে মাসিক বেতন থেকে এক হাজার টাকা করে। ঋণ নেওয়া যখন স্বভাবে এসেই গেছে তখন কি আর কিছু শোনার আছে! গৃহ নির্মাণ ঋণের কামনায় আকুল হলো এই গৃহহীনের ঋণস্বভাবী মন। সায় মিলল ফের বাসাতেই! এবারে আর বেসরকারি নয়, খাঁটি সরকারি একেবারে।
২০০২-২০০৩ সালের ঢাকায় অবস্থা ছিল এখনকার ঠিক উল্টো (থাকবে কতদিন ঠিক নাই তার)। বেসরকারি বাসায় ভাড়া অনেক বেশি কাটা যেত সরকারি বাসা ভাড়া ভাতার চেয়ে, টানাটানি বাড়ত সংসার চালাতে। সরকারের সংসারে আবার টানাটানি সবার চেয়ে বেশি চিরকাল! চাহনেওয়ালার চেয়ে বাসা কম। আজিমপুর জাজেস কোয়ার্টার, সরকারি আবাসন পরিদপ্তর, কোনো খানে বাসা দূরে থাক আশাও পাওয়া গেল না। এক সুহৃদ জানালেন, খালি বাসার নম্বর নিজেই জোগাড় করে না নিয়ে গেলে সরকারি বাসা পাবেন না ঢাকাতে। নম্বর কোথায় পাই! সুহৃদই সহায় হলেন। তিনি থাকতেন বেইলি স্কয়ার সরকারি কোয়ার্টারে ৪৮০ স্কয়ারফিটের ছোট ছোট খুপরিওয়ালা ছ-তলা বিল্ডিংয়ের একটাতে। সেটারই ছ-তলায় খালিযোগ্য (বসবাসকারী বাইরে বদলি হয়েও বাসা ধরে আছেন ঢাকাতে) একটার নম্বর দিলেন হাতে। লিফ্ট নেই আবার গণপূর্তের এই পুরাকীর্তিতে। অনিচ্ছা যত, তারও বেশি নিরুপায়। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরে দরখাস্ত করে এক মাস ধরে ঠেলে বরাদ্দ পাওয়া গেলে আরও এক মাস ঠেলতে হলো বাসা খালি করাতে। চিপাচাপা বাসাটার ভাড়াও ছিল ‘চিপ’ (সস্তা) একেবারে, মাসে ছ-শো মাত্র (এখন নাকি সাত হাজার)। হাতে থাকে নগদ তিন হাজার আট-শো টাকা সরকারি বাসা ভাড়া ভাতা থেকে। ‘ঋণং কৃত্বা’-র কিস্তি টানা যাবে ফুর্তিসে। নিয়ে ফেললাম গৃহ নির্মাণ ঋণ নিঃসংকোচে। আসলে কি ১ লাখ ২০ হাজার টাকাতে মোজাফ্ফর ন্যাপের কুঁড়েঘরও হয় ঢাকাতে! গৃহ নির্মাণ করতে দেওয়া হয় প্রকৃত কর্মস্থলে, শুধুই নিজের বসবাসের শর্তে। মঞ্জুরিপত্রে আবার সেই বার্ষিক ১০ টাকা হারের সুদ আর খেলাপি হলেই বার্ষিক ১১ টাকা হারের চক্রবৃদ্ধি! ওরে বাবা! এ কোন চিপায় ফেঁসেছি! ব্যাসদেবের ‘নরাধম’ তো আমি আসলেই! করা যায় কী এবারে! রাখলাম সঞ্চয়পত্র কিনে, যদি সুদে সুদ ক্ষয় হয় কিছুটা হলেও (সুদ কমিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এখন যে-অনর্থ ঘটিয়েছে তাতে সঞ্চয়পত্র কুপুত্র ঠেকছে কি সাধে)!
এদিকে, ছ-তলার সে খুপরি ঘরে ঠাসাঠাসি বসবাসে হাঁসফাঁস একেবারে। সুবিধা ছিল একটাই, বাসায় ক্ষণিকের অতিথি হতেও রাজি হতো না কেউ সিঁড়ি ভেঙে ছ-তলা ওঠানামার কথা শুনে! আমার ওঠানামা প্রতিদিন। ওঠার কিংবা নামার কালে কিছু নিতে কিংবা দিতে ভুলে এলে খেসারতি আরেক দফা ওঠানামা। বাসায় সরকারি টেলিফোন পাওয়ার হক ছিল, ভোগ করে এসেছি আগের স্থানে। ছ-তলায় সেটাকে ওঠাতেই পারা যায়নি কিছুতে (সে কথা আগেও বলেছি ‘টেলিফোন বিলোপন’-এ)। মোবাইল ফোন তখনো দামি বিলাসিতা, নামেনি হাতে হাতে। ঘরে রাখি না হাতে রাখি! রাখলেই বা কি! উঠবে যে তাকে তো নামতেই হবে, আর নামবে যে তাকে আবার উঠতে তো হবে। ওদিকে, সরকারি বাসা ভাড়া ভাতা থেকে হাতে আসা মাসে তিন হাজার আটশো আর গৃহ নির্মাণ না করা ঋণের সেই ১ লাখ ২০ হাজার টাকার গরমে গরম লাগতে লাগল ভেসপাতে। একখানা মোটরগাড়ি না হলে কি চলে! উঠল বাই এবার মোটরগাড়ি-সেবা নগদায়নের। ড্রাইভার আর গাড়ি একসঙ্গে পোষা কুলাবে না, বোঝা গেছে বিনামগজে। বাইসাইকেল চালানো শিখেছিলাম বাবার নিজের বাইসাইকেলে, মোটরসাইকেল চালানো শিখেছিলাম বাবার সরকারি মোটরসাইকেলে। মোটরগাড়ি তো বাবার ছিল না নিজের কিংবা সরকারি। ড্রাইভিং শেখা ধরলাম ড্রাইভিং-স্কুলে, খোঁজা ধরলাম পুরাতন মোটরগাড়ি। ড্রাইভিং শেখা শেষ হয়ে আসে, শেষ হয় না মোটরগাড়ি খোঁজা। পুরাতন বলেই কি অত অল্পে মোটরগাড়ি পাওয়া সোজা? হায়! গৃহ নির্মাণের সরকারি ঋণ! নগদায়ন না হয় কুঁড়েঘর, না হয় পুরাতন মোটরগাড়ি!
মোটরগাড়ির সরকারি ঋণের খোঁজ নিয়ে দেখি, বাবা! প্রথম শর্তেই ধরা! সরকারি কাজের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মোটরগাড়ির ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন বলে সরকার যদি সন্তুষ্ট হয় তবেই। সরকারের চিত্ত কি সন্তুষ্ট হয় সহজে? তাও আবার নিম্নপদস্থ এক অক্ষম বিচারকর্মীর বাইয়ের এই ‘ঘৃতং পিবেৎ’-এ! রুষ্ট না হয় শেষে! তার ওপর দেখি, সন্তুষ্ট হলে সেই বার্ষিক ১০ টাকা হার সুদের গোদ আর ১১ টাকা হারের চক্রবৃদ্ধির বিষফোঁড়াসহ দেবে মোটে ৬০ হাজার টাকা। তাতে তো নিজেরও সন্তুষ্টি হয় না। কতগুলো কী পার্টস বাদে মোটরগাড়ি মিলবে তার অঙ্ক করুন পরে, আগে স্মরণ রাখুন ৬০ হাজারের কমে কেনা হলে বাকি টাকাটা তক্ষুনিই সরকারকে ফেরত দিতে হবে; বিধিতে লেখা আছে স্পষ্ট অক্ষরে, এখনো দেখতে পাবেন জেনারেল ফিনান্সিয়াল রুলসে ২৫৮ বিধিতে। তাজ্জব বাত! কমেও পাওয়া যায়! মশকরারও তো মাত্রা থাকে! এমন বিধিকারী সরকারি মহাজনরা নমস্য বটে, জন্মেছিলেন কি মোটরগাড়ির জন্মেরও আগে! তাই তো বলি, সরকারি বিধি থাকে কেন শুধু কাগজে, লাগে না কেন আসল কোনো কাজে!
মোটরসাইকেলের সরকারি ঋণের অবস্থাও একই, সরকারি কাজের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মোটরসাইকেল ব্যবহার প্রয়োজন বলে যদি সরকার সন্তুষ্ট হয় তবে। সেই সুদের গোদ আর চক্রবৃদ্ধির বিষফোঁড়াসহ দেবে মোটে ২৫ হাজার টাকা এবং কমে কেনা হলে বাকি টাকাটা তক্ষুনিই সরকারকে ফেরত দিতে হবে। এতসব অসম্ভবে সম্ভব নয় বলেই আমার ভেসপা নগদায়নে যেতে হয়েছিল ইসলামী ব্যাংকের শরিয়তি ঋণে। তবে, বাইসাইকেল ঋণ ৩ হাজার টাকা পাবেন সুদের গোদ আর চক্রবৃদ্ধির বিষফোঁড়া সামলাতে রাজি সরকারি যে কেউই। আমার বোঝা সারা, মোটরগাড়ির সরকারি ঋণে মোটরসাইকেলও নগদায়ন হবে না সেই ভেসপা ছাড়া! তার ওপর আবার বার্ষিক ১০ টাকা হার সুদের গোদ আর ১১ টাকা হারের চক্রবৃদ্ধির বিষফোঁড়া! কাজ নেই বাবা গৃহ নির্মাণ ঋণের পরে আর গোদ বাড়িয়ে! কিন্তু, বাই তো থামে না কিছুতে! বাটি চালান দিয়ে খুঁজে পাওয়া গেল ছোট একখানা অতিপুরাতন মোটরগাড়ি, টয়োটা স্টারলেট। ১ লাখ ৫৬ হাজারের নিচে নামানো গেল না কিছুতে। গৃহ ঋণকে বানানো সঞ্চয়পত্রটা ভাঙিয়েও গাঁট থেকে বেরিয়ে গেল আরও ৩৬ হাজার টাকা। পরে ভেসপাটা বেঁচে এসেছিল মাত্র ৩২ হাজার। যে বাসনায় ‘ঋণং কৃত্বা’ সে ‘ঘৃতং পিবেৎ’ হওয়ার নয় সরকারি ঋণে। মিছেমিছির করবারে অধমর্ণকে নামানো উত্তম কর্ম হয় কি উত্তমর্ণের!
আমার গাড়ি কেনার খবরটাই কেন জানি রটে গেল আইন মন্ত্রণালয় জুড়ে। গাড়িটার কেমন হাল, কত কষ্টে পেলাম এসবে আগ্রহ নেই কারও। আমার পুরাতন গাড়িতে তাদেরই নতুন কষ্ট গেল বেড়ে! মাস তিনেকেই দিল ঢাকার বাইরে মুন্সীগঞ্জে বদলি করে। ঋণের পরে কায়দা-কিসিম করে পুরাতন এক মোটরগাড়ির নগদায়নে এত নাজেহাল কে জানত আগে! ফাঁকতালে লাভ হলো ওই ছ-তলার খুপরি ঘরে আমার ওঠানামার কষ্ট লাঘব মাত্র একটা বছরে। মুন্সীগঞ্জ আদালতে দেখি অদৃষ্টপূর্ব এক মাইক্রোবাস! বাইরেটা দেখতে ঠিক, ভেতরে আজব কারবার! ড্রাইভিং সিটের পেছনে দুজন বসার একটা আড়াআড়ি আসনের সঙ্গে আলগা একটা ফোল্ডিং আসন, সেই আসন ভাঁজ করে পেছনে গেলে কিংবা পেছন-ডালা তুলে ভেতরে এলে দুজন করে বসার লম্বালম্বি দুটো আসন। ঠেকা-বেঠাকায় অ্যাম্বুল্যান্সেরও কাজ চলবে, আবার পেছন-ডালাটা বাদ দিলেই পুলিশের টহল-গাড়ি! বাহ অদৃষ্ট, বিচারকদের বরাতে এই মোটরগাড়িটা কোত্থেকে জোটালে! বিচারকের কাছে চাওয়ার কোনো শেষ নেই, বিচারকের তো চাওয়ারও কোনো জায়গা নেই!
(শেষ অংশ আগামী কিস্তিতে)
লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক
moyeedislam@yahoo.com