ধর্মের দোহাই দিয়ে কোটি টাকা নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে সাব’আ সানাবিল সমাজকল্যাণ একাডেমি নামে সুনামগঞ্জে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান। কথিত প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ‘ড.’ আবদুল আজিজ আল হেলাল ও তার বোন আকলিমা বেগমের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে জেলার বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার কয়েকশ হতদরিদ্র পরিবার এখন নিঃস্ব। ১ লাখ টাকায় মিলবে ৫ লাখ টাকার ঘর, এমন লোভনীয় টোপ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে এখন লাপাত্তা আবদুল আজিজ ও তার বোন। কয়েকজন ভুক্তভোগী মামলা করার পর আদালতের নির্দেশে এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
জানা গেছে, চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে টাকা দিয়ে টাকা বাড়ানোর প্রচারণায় নামে সদ্য গজিয়ে ওঠা সাব’আ সানাবিল সমাজকল্যাণ একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ আল হেলাল ও তার বোন। তবে এজন্য কিছু শর্ত বেঁধে দেন তারা। যার মধ্যে রয়েছে ১ লাখ টাকা ইসলামের জন্য দান করতে হবে, আদায় করতে হবে নামাজ, করতে হবে পর্দা ও সুদ খাওয়া যাবে না। তবেই ১০০ দিনে মিলবে নতুন ঘর ও টিউবওয়েল। আর আবদুল আজিজ ও তার বোনের লোভনীয় ওই টোপ গিলতে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার কয়েকশ পরিবার।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবদুল আজিজের বাড়ি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। সুনামগঞ্জে শ্বশুরবাড়ির পক্ষের আত্মীয়তার সুবাদে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় আসেন আজিজ ও তার বোন আকলিমা। তিনি এলাকায় নিজেকে মাওলানা পরিচয় দিয়ে ধর্মীয় নানা কার্যকলাপ চালাতে থাকেন। বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক ও স্থানীয় ওলামাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি সাব’আ সানাবিল সমাজকল্যাণ একাডেমি নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি ১০০ দিনের মধ্যে দরিদ্রদের ঘর ও নলকূপ সহায়তা হিসেবে দেবেন বলে প্রচার করেন। তবে এজন্য কিছু শর্ত বেঁধে দেন। যার মধ্যে রয়েছে ১ লাখ টাকা ইসলামের জন্য দান করতে হবে, আদায় করতে হবে নামাজ, করতে হবে পর্দা ও সুদ খাওয়া যাবে না। তবেই ১০০ দিনে মিলবে নতুন ঘর ও নলকূপ। এর মধ্যে ‘ইসলামের জন্য’ ১ লাখ টাকা দিলে মিলবে ঘর আর যারা টিউবওয়েল পাবেন তারা দেবেন ১০ হাজার টাকা। এজন্য গ্রাহকদের সঙ্গে করেন চুক্তিপত্রও। ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে আজিজ ও আকলিমা মিয়ারচর ও কলাগাঁও গ্রামের কয়েকশ গ্রাহকের মন জয় করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু এখন আর খোঁজ নেই সাব’আ সানাবিল সমাজকল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজের। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা দফায় দফায় যোগাযোগের চেষ্টা করেও আজিজের খোঁজ না পেয়ে শেষমেশ তাদের কয়েকজন কয়েক দিন আগে সুনামগঞ্জের আদালতে মামলা করেন। এরপর আদালত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পিবিআইকে নির্দেশ দেয়।
প্রতারণার শিকার বিশ্বম্ভরপুরের মিয়ারচর গ্রামের হতদরিদ্র বকুলা বেগম জানান, দুধের গরু বিক্রি করে ও সুদে টাকা ঋণ নিয়ে ১ লাখ টাকা তুলে দেন সাব’আ সানাবিল সমাজকল্যাণ একাডেমি নামের ওই প্রতিষ্ঠানকে। ১০০ দিনের মধ্যে ৫ লাখ টাকার ঘর দেওয়ার কথা বলে সেজন্য জায়গা মেপেও যায় প্রতিষ্ঠানটির লোকজন। কিন্তু এখন আর তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
আরেক ভুক্তভোগী তাহিরপুরের কলাগাঁও গ্রামের ইসমাঈল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে কাগজে চুক্তি করে ১ লাখ টাকা নিয়েছেন আজিজ। এছাড়া আমার এলাকার আরও ১০ জনকে টিউবওয়েল সহায়তা হিসেবে দেবেন বলে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার করে টাকা করে নিয়েছেন। কিন্তু এখন শুনি এই হুজুর নাকি ভুয়া।’
ভুক্তভোগীরা জানান, আবদুল আজিজ আত্মীয়তার সূত্রে তাদের এলাকায় আসা-যাওয়া করতেন। ধর্মীয় বিষয়ে পড়াশোনা থাকায় এলাকাবাসীও তাকে সম্মান করত। সেই বিশ্বাসেই তাকে টাকা দেন তারা। কিন্তু এখন ঘর তো দূরে থাক, আজিজের দেখাই মিলছে না। নিজের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব এসব পরিবার।
বিশ্বম্ভরপুরের মিয়ারচর হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসায় প্রায়ই সে (আজিজ) আসত। এসে এলাকায় ধর্মের নানা জ্ঞান দিত। ইসলামের জন্য মানুষকে সহায়তা করবে বলে প্রচার চালিয়ে গরিব মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এসব গরিব মানুষ এখন টাকা ফেরত না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।’
আজিজের প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবু সাঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে ধর্মকে সহজেই ব্যবহার করে এসব অপরাধ বাড়ছে। ধর্মকে পুঁজি করে অসহায় মানুষদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে এরা। এসব অভিযোগের দ্রুতই সমাধান করা হবে এবং অপরাধী যে জায়গাই থাকুক না কেন খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’