দেশে পেঁয়াজের দাম হু-হু করে বাড়ছে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় দেশে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, এমন ১১ জেলা প্রশাসককে (ডিসি) চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চিঠিতে ওই ১১ জেলাতে চাহিদা, মোট মজুদ ও উৎপাদনের পরিমাণ জানাতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে দেশি পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে তদারকি জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে আগামী সোমবার জরুরি বৈঠকে বসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বৈঠকে পেঁয়াজের দাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তার একটি কৌশল নির্ধারণ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বিভাগের (আইআইটি) প্রধান সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজারে হঠাৎ করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে।ভারতের পেঁয়াজের দাম একটু বাড়লেও দেশি পেঁয়াজের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। কারণ দেশে যথেষ্ট মজুদ রয়েছে, উৎপাদনও ভালো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ১১ জেলায় পেঁয়াজের বাজার মনিটরিং জোরদার করতে ডিসিদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই সঙ্গে জেলাতে চাহিদা, মোট মজুদ ও উৎপাদনের পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর বাইরে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে বিভিন্ন কাস্টমসে চিঠি দেওয়া হয়েছে; পেঁয়াজ বহনকারী ট্রাকের জন্য আলাদা ফেরির ব্যবস্থা করতেও বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে সফিকুজ্জামান বলেন, সোমবারের বৈঠকে পেঁয়াজ একটি অন্যতম ইস্যু হিসেবে প্রাধান্য পাবে। বৈঠকে বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যে ১১ জেলায় চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেসব জেলাতে পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হয়। এর মধ্যে রয়েছেফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিসি বলেন, ‘বাজার নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। এখন একটু বাড়ানো হবে। অন্যদিকে উৎপাদন ও মজুদের তথ্য রয়েছে, এখন একটু আপডেট করা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট পরিমাণ দেশি পেঁয়াজ রয়েছে। বাজারে দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই।’
এ প্রসঙ্গে ভোক্তাস্বার্থ নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান বলেন, ‘বাজারে চাল, ডাল, সয়াবিন তেলসহ সব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন পেঁয়াজের দাম হু-হু করে বাড়ছে। এ অবস্থায় ভোক্তা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয় করা, চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানির সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা বাড়ানো উচিত। যেন জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা যায়। মানুষকে বাঁচানো যায়।’
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজে ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। গতকাল রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়, যা গত সপ্তাহে ছিল যথাক্রমে ৪০-৫০ টাকা ও ৩৫-৪৫ টাকা। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তাদের প্রতিবেদনে দাম বাড়ার বিষয়টি জানিয়েছে। হঠাৎ করে দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজারে এখন দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কম। আর ভারতেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। ফলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়তি।
কারওয়ানবাজারে বাজার করতে আসা ওসমান গণী বলেন, ‘বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসলাম, কিন্তু এসে দেখি পেঁয়াজের বাজারে আগুন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এত দামে পেঁয়াজ কিনতে হলে মাসের দিনগুলো চলবে কীভাবে? পেঁয়াজের পাশাপাশি বাজারে অন্যসব সবজির দামও চড়া।’
কারওয়ান বাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ার চিত্র দেখে আমরাও অবাক। কারণ, বাজারে সরবরাহের ঘাটতি নেই। ভারত পেঁয়াজ দেওয়া বন্ধ করেনি। তবে ভারতেও পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেড়েছে। যে কারণে আমাদের বাজারে পেঁয়াজের দাম যতটুকু বাড়ার কথা তার থেকে বেশি বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম নির্ভর করে সরবরাহের ওপর। বাজারে মাল বেশি থাকলে দাম কমবে। আবার মালের ঘাটতি থাকলে দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।
এদিকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ আগেও ভারত ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ পাইকারিতে প্রতি কেজি ৩২-৩৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ৪০-৪৫ টাকায়। কিন্তু গত ২-৩ দিনে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম পাইকারি ও খুচরায় এক লাফে কেজিতে বেড়ে গেছে ১৫-২০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতে পেঁয়াজের বুকিং রেট বৃদ্ধির কারণে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে নিত্যপণ্যটির দাম ঊর্ধ্বমুখী।