মুক্তিযুদ্ধের সময় নদীতে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। নদীপথেই ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ। দুঃসহ সে সময়ে মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিবারও নৌকায় করে ভারতের পথে যাত্রা করেছিল। একুশ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর সেই নদীযাত্রা নিয়ে লিখেছেন ফয়সাল আহমেদ
যাত্রা শুরুর আগে
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরপরাধ-নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ চালায়। জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের এই সামরিক অভিযানটি ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত। এর আগে এদিন সকাল থেকেই ঢাকার পরিস্থিতি ছিল থমথমে। শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা পণ্ড হয়ে যাওয়ার খবরে উদ্বিগ্ন-উত্তপ্ত সকল মানুষ সমবেত হতে থাকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে। সমবেত উপস্থিত জনতা জানতে চায়, শুনতে চায় বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য, মতামত। এর মধ্যে সারা দিনে একাধিকবার ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু। সকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ভবনে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিস্থিতি সংকটজনক’। তারপর জেনারেল ইয়াহিয়া গোপনে বৈঠক করেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানসহ উচ্চপদস্থ সেনা কর্তাদের সঙ্গে। এরপর কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই জেনারেল ইয়াহিয়া গোপনে সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি বিমানবন্দরে যান এবং যাত্রা করেন পাকিস্তানের উদ্দেশে। রাত ১০টার পর ঢাকা সেনানিবাস থেকে একটি বড় কনভয় যুদ্ধসাজে বাইরে বেরিয়ে আসে। ইয়াহিয়ার ঢাকা ছাড়ার খবর এবং অন্যান্য সংবাদ পৌঁছে যায় বঙ্গবন্ধুর কাছে। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগও পাননি। এই পরিস্থিতে পরে আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে দলের নেতাকর্মী, এমনকি পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ময়মনসিংহে অবস্থানরত উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা জানেন না তার খবর, আবার তিনিও জানেন না কী অবস্থায় আছে তারা। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাওয়ায় সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা নাফিসা ইসলাম তার পুত্র-কন্যা সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম ও সৈয়দ শরিফুল ইসলাম, কন্যা সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি ও রাফিয়া নূর রূপাকে সঙ্গে করে ২৭/২৮ তারিখ ময়মনসিংহের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন। মায়ের সঙ্গে অন্য ভাই-বোনরা গেলেও থেকে যান সবার বড় ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সৈয়দ আশরাফ তখন ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করাসহ নানা জরুরি কাজের দায়িত্ব নিয়ে তিনি মা, ভাই-বোনদের ছেড়ে থেকে যাচ্ছেন। আর কখনো তাদের সঙ্গে কিংবা পিতার সঙ্গেও দেখা হবে কি না, কোনো কিছুই তখনো নিশ্চিত নয়। বড় অনিশ্চিত সে সময়!
নাফিসা ইসলাম তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে নৌকায় করে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে পার্শ্ববর্তী নান্দাইল এলাকায় পৌঁছান। এ সময় তাদের সঙ্গে কয়েকজন নিকটআত্মীয়ও ছিলেন। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে জড়ো হওয়া মানুষের সংখ্যা শতাধিক। সবাই মিলে একটি স্কুলঘরে রাত্রিযাপন করলেন। অভুক্ত-ক্লান্ত তাদের পাশে দাঁড়ালেন স্থানীয় লোকজন। তারা রান্না করে খাওয়ালেন তাদের। পরদিন সকালে সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্ত্রী-সন্তানরা তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের পথে যাত্রা করেন। নিজ বাড়ি যশোদলে থাকা প্রধান উদ্দেশ্য হলেও নাফিসা ইসলাম তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোনো একটি জায়গায় নিশ্চিন্তে অবস্থান করতে পারেননি। আজ যশোদল তো কাল নিজ পিতার বাড়ি কটিয়াদীর বোয়ালিয়া গ্রামে, পরশু নিকটাত্মীয়দের বাড়ি হাওর এলাকার নিকলী, ধারিশ্বর কিংবা দিঘিরপাড় এভাবে রাত-দিন পার করতে হলো। তত দিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পৌঁছে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সরকার আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। এপ্রিলের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী ঘোষণা করে সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে বিরাট অঙ্কের টাকা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে। টাকার লোভে পড়ে এ সময় কিছু লোক তাদের পেছনে লেগে যায়। সংগত কারণেই তারা কোথাও অবস্থান নিলে অল্প সময়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। চরম নিরাপত্তাহীনতায় রাতের আঁধারে তখন তারা আবার ওই স্থান ত্যাগ করে। এভাবে পাঁচটি মাস ভীষণ আতঙ্কে পার করতে হয়েছে। এ সময় সৈয়দা নাফিসা ইসলামের মা তাহেরা নূর ও তার বড় ভাই আসাদুজ্জামান তাদের নিরাপত্তায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।
নদীপথে যাত্রা
সৈয়দা নাফিসা ইসলামের ভাই আসাদুজ্জামানের তৎপরতায় জানা যায়, কটিয়াদী বাজারের কিছু হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবার ব্রহ্মপুত্র-আড়িয়াল খাঁ-মেঘনা-তিতাস নদীপথে নৌকা করে ভারতে পাড়ি দেবে। তখন তিনি তাদের প্রস্তাব করেন, তার বোন-ভাগনে-ভাগনিদের তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে। দলের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও তাদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। তারা ভাবছে, এতগুলো হিন্দুর সঙ্গে একটি মুসলমান পরিবার কীভাবে যাবে! ধর্মে-কর্মে কোনো কিছুতেই যে তাদের মধ্যে মিল নেই। তখন তাদের শর্ত ছিল পরিচয় গোপন করে তাদের সঙ্গে যেতে হবে। যাত্রাপথে, নৌকায় কোনোরূপ মুসলমান ধর্মীয় আচার-আচরণ, রীতি-নীতির প্রকাশ ঘটানো যাবে না। তাদের সেই শর্তের কথা নাফিসা ইসলামকে জানানো হলে তিনি সব শর্ত মেনেই রাজি হন। এ ছাড়া আর কোনো বিকল্পও তার সামনে ছিল না, ছেলেমেয়েদের জীবন বাঁচাতে হলে এটাই ছিল শেষ সুযোগ। যদিও অসম্ভব নামাজি ও আল্লাহভীরু একজন নারী হয়ে এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া নিঃসন্দেহে অনেক কঠিন ব্যাপার। সব শর্ত মেনেই আগস্ট মাসের এক গভীর রাতে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে মা তাহেরা নূরকে সালাম করে নাফিসা ইসলাম তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অনিশ্চিত এক নদীযাত্রায়। যেভাবেই হোক তাকে ভারতে অবস্থানরত স্বামী, মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে পৌঁছাতেই হবে।
পিপাসা মেটাতে নদীর পানি
নৌকায় সবচেয়ে বেশি সংকট ছিল পানির। সুপেয় পানি তখন সহজলভ্য ছিল না। একুশ দিনের এই যাত্রাপথে নদীর পানিই ছিল পিপাসা মেটানোর একমাত্র উপায়। না, ফুটানো পানি নয়, সরাসরি নদী থেকে সংগ্রহ করা পানিই সবাই ব্যবহার করত। নৌকায় রান্না করার সময়েও এই পানি ব্যবহার করা হতো। সঙ্গে থাকা অল্প পরিমাণ চিড়া, গুড় শেষ হয়ে গেলে নদী থেকে সংগ্রহ করা কচুরিপানা, শাপলা, পদ্ম ছিল প্রধান খাবার। এর বাইরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝে কোথাও কোথাও নৌকা থামিয়ে, খিচুড়ি, সাদা ভাত রান্না করা হতো। ভাতের সঙ্গে মিলত আলুভর্তা কিংবা শুকনো মরিচ। যে খাবার হয়তো তারা কখনোই খাননি, তা খেয়েই জীবন বাঁচাতে হয়েছে। এমনও হয়েছে পাঁচ-ছয় দিন হয়ে গেলেও পেটে ভাত পড়েনি। পথে গ্রামের মানুষের রান্না করা খাবারই ছিল একমাত্র ভরসা।
বোয়াল মাছের পেটে মানুষের আঙুল
যাত্রাপথে শরণার্থী দলের খাবারের জোগান দিতে প্রায়ই নদী থেকে মাছ ধরা হতো। কিন্তু পাকিস্তানিদের হাতে নিহতদের লাশ পানিতে ভেসে যাওয়ায় সব সময় সেটা সম্ভব হতো না। একবার নদীর পরিষ্কার পানি দেখে নৌকা থামিয়ে মাছ ধরা হলো। রান্নার জন্য কাটার সময় বোয়াল মাছটির পেট থেকে বেরিয়ে এলো মরা মানুষের তাজা আঙুল। এরপর থেকে নৌকার অনেকেই মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেয়।
সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি
সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের (সদর-হোসেনপুর) সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি শ্বাসরুদ্ধকর সেদিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘কটিয়াদী থেকে নৌকায় করে ইন্ডিয়া যেতে আমাদের সময় লেগেছিল তিন সপ্তাহ। বড় অনিশ্চিত ছিল সে যাত্রা। কটিয়াদী বাজারের পাশের নদীতে একটা বিশাল বড় পালতোলা নৌকায় করে গভীর রাতে আমরা রওনা করেছিলাম। আমাদের সঙ্গে খাবারের তেমন আয়োজন ছিল না। আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল সঙ্গে বেশি খাবার নেওয়া যাবে না। শুধু অল্প পরিমাণে শুকনো চিড়া আর গুড় নিয়েছিলাম আমরা। আমরা যে কোথায় যাচ্ছি, তখনো এর গুরুত্বটা বুঝে উঠিনি। আমাদের দুই বোনের কাছে বিষয়টা বেড়াতে যাওয়ার মতো ছিল। এমনও হয়েছে যে, চরম অতিষ্ঠ হয়ে আমার ছোট বোন রূপা আম্মাকে বলত ‘আম্মা আর বেড়াব না, এবার বাড়ি চলো’। এই যাত্রা যে সুখকর বা আনন্দদায়ক হচ্ছে না, তা সে বুঝতে পেরেছিল, খাওয়া-দাওয়ায় কষ্ট হচ্ছে, পানি নেই।
এদিকে নৌকায় থাকা হিন্দু নারীরা আমাদের সন্দেহ করা শুরু করল। আম্মা শব্দটি নিয়েও নৌকাতে সমস্যা তৈরি হলো। আগেই আমাদের বলা হয়েছিল যে, আম্মাকে আমাদের মা বলতে হবে। আমাদের অভ্যাস ছিল আম্মা বলা, আমরা ভাই-বোনরা আম্মাকে আম্মা বলে ফেলতাম। তখন নৌকায় থাকা নারীরা আম্মাকে প্রশ্ন করত এই তোমার বাচ্চারা তোমাকে মুসলমানের মতো আম্মা বলে কেন? তখন আম্মা বলতেন- আমি তো মুসলমানের বাসায় অনেক দিন কাজ করেছি, আমার বাচ্চারা ওখান থেকেই আম্মা ডাক শিখেছে। আম্মা সব দোয়া-দরুদ মনে মনে পড়তেন। তবু হঠাৎ আল্লাহ বলে ফেললে ওরা আবারও প্রশ্ন করত এই তুমি হিন্দু হয়ে আল্লাহ, আল্লাহ করছো কেন? আম্মা আবারও তাদের বলতেন, সারা জীবন মুসলমানের বাসায় থেকেছি তো, শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গেছে।
আমাদের পুরো যাত্রা আবার নৌকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নদীপথে অনেকটা পথ চলার পর নৌকা ছাড়তে হয়েছে, মাইলের পর মাইল হাঁটার পর আবার নৌকায় উঠতে হয়েছে। যে নৌকাটা নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেটি শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে ছিল না। আমরা দুই বোন ছোট থাকায় হাঁটতে পারতাম না। আমাদের সঙ্গে নানাবাড়ির দুজন লোক ছিলেন। তারা আমাদের কোলে-কাঁধে করে হেঁটেছেন। মনে আছে, হাঁটতে হাঁটতে একবার আম্মার পা ফুলে-ফেটে গিয়েছিল। তিনি হেঁটে দলটির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না। তখন আমাদের সঙ্গে থাকা এক ফুপাতো (আনার) ভাই, আম্মাকে কোলে করে অনেকটা পথ নিয়ে নৌকায় উঠিয়ে দেন। আনার ভাইয়ের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করগাঁতে।
যাত্রাপথে পানির সংকটেই বেশি ভুগতে হয়েছে আমাদের। একবার আমরা একটা এলাকায় গিয়ে পৌঁছালাম। তারপর খাওয়ার জন্য নদী থেকে পানি উত্তোলনের সময় নৌকার অন্য মাঝিরা আমাদের বললেন, এই পানি খাওয়া যাবে না, এখানে দুদিন আগে পাকিস্তানি আর্মিরা হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করেছে। আমরা দেখলাম নদীতে লাশ ভেসে যাচ্ছে। একসময় আমাদের কাছে থাকা খাবার শেষ হয়ে যায়, তখন থেকে আমরা নদী থেকে শাপলা তুলে খাওয়া শুরু করলাম। নদীর পানি, নদীর শাপলা আমাদের অনেক দিন খেতে হয়েছে।
চলতে চলতে একবার ঠিক হলো, সামনের একটি জায়গায় গিয়ে নৌকাটা থামবে। নৌকা থামার পর লোকজন দৌড়ে এসে বলছে নৌকা ছাড়তে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানাল এই গ্রামে আর্মি ঢুকে পড়েছে। তোমাদের যদি দেখে তো তোমরা আর প্রাণে বাঁচবে না। আমরা তখন দ্রুতই নৌকা ঘুরিয়ে অন্যপথে যাই। আমরা যেখানেই থেমেছি, প্রতিটি জায়গা ও সময় অচেনা-অনিশ্চিত ছিল। এমন হয়েছে যে, কোথাও স্থানীয় মানুষ আমাদের ভীষণ ভালোভাবে আপ্যায়ন করেছে, আবার কোথাও দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। একাধিকবার এমন হয়েছে, আমাদের নৌকাটা যে গ্রামে থেমেছে, সে গ্রামের প্রধান হলো রাজাকার বা আলবদর। স্থানীয় লোকজন এসে আমাদের পালাতে বলেছে। কারণ গ্রামপ্রধান জানতে পারলে আমাদের জানে মেরে ফেলবে। আমাদের নৌকাটি ছিল পালতোলা বড় নৌকা। অনেক সময় নৌকাটি চরে বা অন্য কোথাও আটকে যেত। তখন নৌকা থেকে নেমে পেছন থেকে ঠেলতে হতো। এভাবে একুশ দিন যাত্রার পর আমরা আগরতলা গিয়ে পৌঁছালাম। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে অনেকগুলো নদী পার হতে হয়েছে আমাদের, কিন্তু সেই নদীগুলোর নাম এখন আর সুনির্দিষ্ট করে মনে নেই।’