অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার আবদুল কাদের ইস্যুতে ধনকুবেরখ্যাত মুসা বিন শমসেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তবে জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেছেন, তিনি নিজেই কাদেরের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কাদেরের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলেও জানিয়েছেন।
এছাড়াও তিনি বলেছেন, তার ৮২ মিলিয়ন ডলার সুইস ব্যাংকে আটকা আছে। ওই টাকা পেলে পুলিশকে ৫০০ কোটি টাকা, দুদককে ২০০ কোটি, মানসিক হাসপাতালে ৫০০ কোটি ও মহিলা সমিতিকে ৫০০ কোটি টাকা দেবেন। এছাড়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করে দেবেন।
তবে ডিবি কর্মকর্তাদের দাবি, মুসা রহস্যময় মানুষ। তার সবকিছু অন্তঃসারশূন্য। প্রতারক কাদেরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। মুসাকে ব্যবহার করে কাদের কোটি কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুসা দায় এড়াতে পারেন না।
ডিবির তলবে সাড়া দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে স্ত্রী ও ছেলে জুবি মুসাকে নিয়ে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে যান মুসা বিন শমসের। মেরুন রঙের প্রিমিও প্রাইভেট কার নিয়ে যান তিনি। ডিবির যুগ্ম কমিশনারের কক্ষে সাড়ে তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মুসাকে। সেখানে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার, যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ও গুলশান বিভাগের ডিসি মশিউর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মুসাকে গ্রেপ্তার আবদুল কাদেরের মুখোমুখি করেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। এর আগে গত রবিবার দুপুরে ডিবি কার্যালয়ে মুখোমুখি করা হয় মুসা বিন শমসেরের ছেলে জুবি মুসা ও কাদেরকে।
গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর কারওয়ানবাজার, মিরপুর এবং গুলশান এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও প্রতারণার বিপুল আলামতসহ গ্রেপ্তার করা হয় কাদেরকে। এ সময় তার তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন কাদেরের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী ছোঁয়া এবং অফিস ম্যানেজার শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান। কাদেরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও প্রতারণার ১২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি গ্রেপ্তারের পর করা ছয়টি ও আগের ছয়টি মামলা। অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার চার দিনের রিমান্ড গতকাল শেষ হয়েছে। আজ বুধবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে।
গ্রেপ্তার কাদের নিজেকে মুসা বিন শমসেরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিতেন। কাদেরের সঙ্গে মুসার অর্থ লেনদেন ও কথোপকথনের সূত্র ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৫৬ মিনিটে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মুসা।
তিনি বলেন, ‘আমাকে ডিবির জয়েন কমিশনার হারুন সাহেব ডেকেছিলেন। একটা ফ্রড (প্রতারক) লোক আবদুল কাদের। সে অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি বলে কার্ড ছাপিয়ে আমার অফিসে গিয়েছে। আমার সঙ্গে বিভিন্ন সময় ছবি তুলেছে এবং সে মাঝেমধ্যে আমার সামনে বসে বড় বড় লোকের সঙ্গে কথা বলত। যেমন আইজিপি, আর্মির জেনারেল আরও মানুষজনের সঙ্গে কথা বলত। আমায় বিশ্বাস করাল যে সে অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি। পরে প্রমাণিত হলো সে অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি না। সে একটি ফ্রড। পরে তাকে বের করে দিলাম আমি।’
মুসা আরও বলেন, ‘এই কাদেরের ব্যাপারেই আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমি যা বলার ছিল স্পষ্ট বলে দিয়েছি। তারা সন্তুষ্ট। সে জন্মগতভাবেই একটা মিথ্যাবাদী। আমিও প্রতারণার শিকার হয়েছি। আমি ভিকটিম (ভুক্তভোগী) হিসেবে কাদেরের বিরুদ্ধে মামলা করব।’
কাদেরের সঙ্গে ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কাছে কেউ গেলে ধরো তোমাদের অনেক সিনিয়ররা, অনেক এডিটর বা নিউজ এডিটর এরা আমার সঙ্গে গিয়ে ছবি তোলে। এখন ছবি তুলতে চাইলে তো আমি না করতে পারি না। এখন আমার ছবি নিয়ে যদি কেউ প্রতারণা করে সেটার দায়-দায়িত্ব তো আমি নিতে পারি না।’
কাদেরের কাছে কী পরিমাণ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানতে চাইলে মুসা বলেন, ‘আমি সব স্টেটমেন্ট ডিবির জয়েন কমিশনার হারুন সাহেবের কাছে দিয়েছি। ওনারা ধৈর্য নিয়ে আমার সব কথা শুনেছেন। আমরা বিস্তারিত আলাপ করেছি। পরে এই ডিসিশন (সিদ্ধান্ত) হয়েছে ওর বিরুদ্ধে ডিবি তো করবেই, আমরাও একটা মামলা করব।’ কাদেরের সঙ্গে ২০ কোটি টাকা লেনদেনের চেক পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফেরত দিয়ে দিছি।’
মুসার কথা বলা শেষ হলে একই জায়গায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। মুসা বিন শমসের প্রতারণার শিকার এমন দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েক ঘণ্টা কথা বলেছি। ওনাকে আমার কাছে রহস্যময় মানুষ মনে হয়েছে। উনাকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি আবদুল কাদের একটি নাইন পাস লোক। তাকে আপনি এত বড় কোম্পানির অ্যাডভাইজার বানালেন, সে আপনাকে ১০ কোটি টাকার চেক দিল, আপনি তাকে ২০ কোটি টাকার চেক দিলেন। তিনি বলেন, লাভসহ দিয়েছি। এক মাসে কেউ কি ১০ কোটি টাকায় ১০ কোটি টাকা লাভ দেয়? অর্থাৎ উদ্দেশ্য কী ছিল আমরা জানি না। তার সঙ্গে কাদেরের অজস্র কথোপকথন আছে। উনি তাকে (কাদের) বাবা সোনা ডাকেন এবং তার ছেলের চেয়েও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।’
ডিবি কর্মকর্তা হারুন বলেন, ‘মুসা বিন শমসের ৮২ বিলিয়ন ডলারের মালিক এমন ছবি কাদেরের অফিসে টানানো, এ বিষয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেন, ঘটনা সত্য। আমার সুইস ব্যাংকে টাকাটা আছে। আমি বললাম, আপনার সুইস ব্যাংকে ৮২ বিলিয়ন ডলার, এর কাগজ কাদেরের ওখানে থাকে কেন? উনি (মুসা) বলেন, আমার ৮২ বিলিয়ন ডলার আছে। আমার একটি কলমের দাম ১০ কোটি টাকা। ঘড়ির দাম ৮ কোটি টাকা। আমার জুতার দাম ১০ কোটি। তিনি টাঙ্গাইলে তিন লাখ একর জমির মালিক। গাজীপুরে এক হাজার একর জমির মালিক। উনি আমাদের সামনে বললেন, উনি সৃষ্টিসুলভভাবে এ কথাগুলো বললেও এ কথাগুলো কাদের বিভিন্ন জায়গাতে বিক্রি করে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা কামাই করেছে। উনি (মুসা বিন শমসের) বলেছেন, হ্যাঁ আমি এ কথাগুলো বলেছি।’
হারুন অর রশিদ বলেন, ‘উনি আমাদের বলেছেন, আমি যদি এই ৮২ বিলিয়ন ডলার সুইস ব্যাংক থেকে পাই, উনি আমাদের পুলিশে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা, দুদকের বিল্ডিং করে দেবেন ২০০ কোটি টাকার। পাবনার মেন্টাল হাসপাতালে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা। মহিলা সমিতিকে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করে দেবেন উনি। আমাদের সামনে এগুলো বলেছেন। আসলে উনি কী টাইপের মানুষ, কী রহস্যের মানুষ আমরা বুঝিনি। তবে উনি ওনার দায় এড়াতে পারেন না। উনার সঙ্গে ভুয়া অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি কাদের মাঝির যে সম্পর্ক, এ সম্পর্কের দায় উনি এড়াতে পারবেন না। কারণ উনার সঙ্গে কাদেরের একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। যে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে কাদের মাঝি বিভিন্ন মানুষকে ঠকিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাদের মাঝি যে বলেছেন তার সঙ্গে আইজির সম্পর্ক আছে, অনেক বড় বড় মানুষের সম্পর্ক আছে। উনার তো (মুসা) উচিত ছিল আমাদের ইন্সপেক্টর জেনারেল পুলিশকে জিজ্ঞাসা করা বা অন্যান্য যে ভিআইপির নাম বলেছে তাদের জিজ্ঞাসা করা। উনি এটি জিজ্ঞাসা করেননি। অতএব আমি মনে করি কাদের মাঝির সঙ্গে তার একটি যোগসূত্র রয়েছে এবং উনি নিজে বলেছেন উনি প্রতারিত হয়েছেন। উনি একটি মামলা করবেন। আমরা সবকিছু তদন্ত করছি। তদন্ত করে যেটা করা দরকার সেটাই আমরা করব। আর উনি যদি মামলা করেন সেটিও আমরা ইনভেস্টিগেশন (তদন্ত) করব।’
মুসা বিন শমসেরের দাবি অনুযায়ী উনি প্রকৃতপক্ষেই বহু সম্পদের মালিক কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে উনি অন্তঃসারশূন্য। উনাকে একটি ভুয়া লোক মনে হয়েছে। তার কিচ্ছু নাই। গুলশানে ৮৪ নম্বর রোডে তার স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি রয়েছে। বাংলাদেশে তার নামে আমরা কোনো কিছু পাইনি। উনি বলেছেন, এ দেশে যা উন্নয়ন হয়েছে সবটাই উনি করেছেন। উনি খামখেয়ালির বশে যে কথা বলেছেন সেটি কাদের মাঝি সবখানে বিক্রি করেছেন।’
এর আগে মুসা বডিগার্ড নিয়ে দুদকে গেলেও ডিবি কার্যালয়ে কেন আনেননি এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি কর্মকর্তা হারুন বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে বলে দিয়েছি এটার মধ্যে কোনো বডিগার্ড নিয়ে আসা যাবে না। আর উনার যে বাস্তব অবস্থা দেখলাম প্রথমত উনি অসুস্থ আর দ্বিতীয়ত উনি অন্তঃসারশূন্য। উনার কোনো কিছুই নাই। এর জন্য টাকা লাগে, সে টাকাও নাই। উনি মুখরোচক গল্প বলেন।’
কাদেরের আদি বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তার বাবা জীবিকার সন্ধানে সন্দ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। মাছ ধরে ও মাঝির কাজ করে সংসার চালাতেন। এমন ভূমিহীন ভাসমান আবদুল কাদেরের ঢাকা ও ঢাকার বাইরে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এর মধ্যে গুলশান-১ নম্বরের জব্বার টাওয়ারের প্রায় ৬ হাজার স্কয়ার ফুট আয়তনের অফিস রয়েছে। এছাড়া কারওয়ানবাজারেও রয়েছে আরও একটি অফিস।
মিরপুর-৬ নম্বরে বসবাস করলেও একাধিক ফ্ল্যাট, গাজীপুরে বাগানবাড়ী, বহুতল ভবন রয়েছে কাদেরের। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে রয়েছে তার একাধিক অ্যাকাউন্ট।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাদেরের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সহায়তাকারী বেশ কিছু দালালের তথ্য পেয়েছে ডিবি। এসব দালালই ব্যাংক ঋণ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ পেতে স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংক গ্যারান্টি, সাব-কন্ট্রাক দেওয়া, চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ক্লায়েন্ট জোগাড় করত। ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে কাদের বিভিন্নভাবে যে টাকা বাগিয়ে নিতেন তার ভাগ পেত দালালরা। এছাড়া ক্লায়েন্ট জোগাড়ে মার্কেটিং অফিসারও নিয়োগ করেছিলেন কাদের।